আমি বললুম, আমার দরকার নেই। আমি হাফিজের চেলা। তিনি বলেছেন,
“শর্করা মিঠা, আমারে বল না, হিমি। আমি তাহা জানি”—সঙ্গে সঙ্গে শব্নম গেয়ে উঠল,
“তবু সবচেয়ে ভালবাসি ওই মধুর অধরখানি?”
আমি বললুম তুমি যে এত আলো জ্বালিয়েছ তারও দরকার নেইঃ-
“বলে দাও, বাতি না জ্বালিয়ে আজি, আমাদের নাহি সীমা?”—
সেই আঁকশির উলটো দিক দিয়ে আলো নেবাতে নেবাতে গুনগুন করে শব্নম বার বার গাইলে,
“আজ প্রেয়সীর মুখচন্দ্রের আনন্দ পূর্ণিমা?”
তারপর ঘরের কোণ থেকে সেতার এনে আমার কোলের উপর বসে তার খেলা চুল আমার বুকের উপর ছোয়ে দিয়ে সমস্ত গজলটি বারবার অনেকবার গাইলে। তন্ময় হয়ে শেষের দুটি ছত্র অনেকক্ষণ ধরে, কখনও গুনগুন করে, কখনও বেশ একটু গলা চড়িয়ে গাইলে,
“প্রিয়ারে ছাড়িয়া থেক না হাফিজ! ছেড় না অধর লাল
এ যে গোলাপের চামেলির দিন—এ যে উৎসব-কাল?”
আমি একটি ক্ষুদ্র দীর্ঘনিবাস ফেলে বললুম, তোমার এত গুণ! তোমাকে আমি কোথায় রাখি। সুন্দর ইউসুফ শুধু যে সে যুগের সব চেয়ে সুপুরুষ ছিলেন তাই নয়, তাঁর মত দূরদৃষ্টি নিয়ে জন্মেছিল অল্প লোকই, এবং সব চেয়ে বড় ছিল তাঁর চরিত্রবল। তাই তাঁর মার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে তাঁকে বসিয়ে দিলে, সেই সুদূর মিশরের রাজসিংহাসনে।
শব্নম বললে, হ্যাঁ। আর তাই মাতৃভূমি কিনানের স্মরণে,
“মিশর দেশের সিংহাসনেতে বসিয়া ইসুফ রাজা
কহিত, ‘হায়রে! এর চেয়ে ভাল কিনানে ভিখারী সাজা?”
দাঁড়িয়ে উঠে আমাকে হাতে ধরে নিয়ে গেল দক্ষিণের দেয়ালের দিকে। থিয়েটারের পরদার মত একখানা মখমলের পরদা ছিল ঘরের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অবধি ঝোলানো। একটানে সেটা সরাতেই সামনের খোলা পৃথিবী তার অসীম সৌন্দর্য নিয়ে আমাকে একেবারে বাক্যহারা করে দিল।
দুখানা চেয়ার পাশাপাশি রেখে আমায় শুধালে, শীত করছে?
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই পুস্তিনের একখানা ফারকোট দু’জনার জানু থেকে পা অবধি জড়িয়ে দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে।
এ সৌন্দর্য শুধু শীতের দেশেই সম্ভব।
সমুদ্রের জল আর বেলাভূমির বালুর উপর পূর্ণিমার আলো প্রতিফলিত হয়ে যে জ্যোৎস্না চোখ ধাঁধিয়ে দেয় এখানে যেন তারই পৌনঃপুনিক দশমিক এখানে শত শত যোজন-জোড়া নিরন্ধ্র সর্বব্যাপী ধবলতম ধবল বরফের উপর প্রতিফলিত হয়ে এক পক্ষের পূর্ণচন্দ্র যেন শত পক্ষের জ্যোতিঃ আহরণ করেছেন, হিমানী-যোগিনী উমারাণীর এক বদন-ইন্দু যেন চৌষট্টি যোগিনীর মুখেন্দীবর দীপান্দিতায় রূপান্তরিত হচ্ছেন।
দূরে পাগমান পর্বতের সানুদেশ, চূড়া—তারও দূর দিগন্তে হিন্দুকুশের অর্ধগগনচুম্বী শিখর, কাছে শিশির ঋতুর নিদ্ৰবিজড়িত বিসর্পিল কাবুল নদী, আরও কাছের সুপ্তিমগ্ন নিষ্প্রদীপ গৃহ-গবাক্ষ চন্দ্রশাল-হৰ্মামালা, পল্লবহীন নগ্ন বৃক্ষ, হৃতপত্র শাখা প্রশাখা, উদ্বাহু মিনার-মিনারিকা, বিপরীতার্থ ডিম্ব গম্বুজ, গোরস্তানের শায়িত সারি সারি কবরের নামলাঞ্চন-প্রস্তর-ফলক—সর্ব সৌন্দর্য সর্ব বিভীষিকা, সর্ব সৰ্বাধিকারীর অলঙ্কার সর্ব সর্বহারার দৈন্য, ভদ্রাভদ্র সকলের উপর নির্বিচারে প্রসারিত হয়েছে তুষারের আস্তরণ। আকাশের মা-জননী যেন এক বিরাট শুভ্র কম্বল দিয়ে তাঁর একান্ন পরিবারের ধনী-দরিদ্র রাজা-প্রজা তার সর্বসন্তান-সন্ততিকে আবরিত করে তাদের পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছেন।
কী নৈঃশব্দ্য, নৈস্তব্ধ! রাজপথের দ্বিতীয়য়ামের মদ্যানুরাগী, সখা, কদ্রুপ সঙ্গীতস্তনিত গণিকাবল্লভ সকলেই একই প্রিয়ার গভীর আলিঙ্গন সোহাগে সুষুপ্ত—সে প্রিয়া গৃহকোণের তপ্ত শয্যা। রাজপ্রাসাদের দুর্গ প্রকারের প্রহর ডিন্ডিম নিস্তব্ধ। কল্য ঊষার মধুর-কণ্ঠ মুআজ্জিন অদ্য নিশার নিদ্রাস্তরণে আকষ্ঠ বিলীন।
গম্ভীর প্রহেলিকাময় এ দৃশ্য। কে বলে একা, একটিমাত্র রঙ দিয়ে ছবি আঁকা যায় না? কে বলে একা একমাত্র সা স্বর দিয়ে গান গাওয়া যায় না? কে বলে একা একটি ফুল ভুবন পুলকিত করতে পারে না? এই সর্বব্যাপী শুভ্রতা-সৌরভে যে সঙ্গীত মধুরিমা আছে সে তো মানুষের সবচৈতন্যে প্রবেশ করে তাকেও বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে একাত্মদেহ করে দেয়। সৃষ্টিরহস্য তখন তার কাছে আর প্রহেলিকা থাকে না সে তখন তারই অংশাবতার। আমার হৃদয় তখন সে সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে হিন্দুকুশ পেরিয়ে আমু দরিয়া তাশকন্দ ছাড়িয়ে বৈকালী হ্রদের কূলে কূলে সন্তরণ করছে।
আমাদের মাথার উপর পূর্ণচন্দ্র। এতক্ষণে আমার চোখ থেকে টেবিল ল্যাম্পের শেষ জ্যোতিঃকণার রেশ কেটে গিয়েছে। দেখি, প্রখর চন্দ্রালোক বিচ্ছুরিত হচ্ছে শব্নমের সিত ভালে, স্ফুরিত নাসিকারন্ধ্রে, ইষতার্দ্র ওষ্ঠাধরে, সমুন্নত কঞ্চুলিকা শিখরাগ্রে। বেলাতটের নীলাভ কৃষ্ণাম্বুর মত তার চোখের তারায় গভীর নৈস্তব্ধ্য। গিরিকুমারীর মরালগ্রীবা, হিন্দুকু গিরির মতই ধবল শুভ্র। এতদিনে বুঝতে পারলুম অক্ষতযোনী গৌরীকে কেন গিরিরাজতনয়া বলে কল্পনা করা হয়েছে।
পূর্ণচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললুম, হে কমরুল কওকাব। এই কমরুন্নিসাকে আশীর্বাদ কর। হে ইন্দুবর-না, না, হে ইন্দুমৌলি, তুমি একদা গিরিকুমারীর শুভ্রশুচিতার চরম মূল্য দিয়েছিলে। আজ এই কাবুলগিরিকন্যাকে তুমি আমার প্রসন্ন দক্ষিণ মুখ দেখাও। আমাদের বাতায়নপ্রান্তে এসে তোমার ইন্দীবর নয়ন উন্মীলন করে দেখ, এ কুমারীর কটিতট তোমারই মত, হে নটরাজ, তোমারই ডমরুকটির মত ক্ষীণচক্র-
