দরজা খুলে আমাকে ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
সে ছবি আমি জীবনে কখনও ভুলব না।
যবে থেকে আমাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে তখন থেকে এ-ছবিটি কি রকম হতে পারে তার নানা স্বপ্ন আমি সমস্তদিন ধরে দেখেছি। বরযাত্রায় আসার সময়, বিয়ে বাড়ীর চাপা কলরব মৃদু গুঞ্জরণ, শাদী মজলিসের গম্ভীর নৈস্তব্ধ্যে এমন কি চাচা-জান যখন তাঁর স্নেহপ্লাবন দিয়ে আমার হৃদয়ের একূল ওকূল দুকূল ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন তখনও-তখনও আমি একটার পর একটা ছবি মনে এঁকেছি আর মুছেছি, মুছেছি আর এঁকেছি।
কখনও দেখেছি সখীজন পরিবতা শব্নম বাসর ঘরের কলগুঞ্জরণ মুখরিত উজ্জ্বলালোকে নববধূর অতিভূষণে জর্জরিতা, আভূমি বিনতা। আর কখনও দেখেছি সূচীভেদ্য অন্ধকার ঘরের একপ্রান্তে আমি জাত-মূর্খের মত দাঁড়িয়ে ভাবছি কিংবা বলব, ভাবতেই পারছি নে, কি করা উচিত। হয় তো অনেক কষ্টে এদিক-ওদিক হাতড়ে হাতড়ে আসবাবপত্রের ধারাল খোঁচা ধাক্কা খেয়ে খেয়ে কোনও গতিকে শব্নমের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, এমন সময়, এমন সময় হঠাৎ ঘরের চারিদিকে জ্বলে উঠল পঞ্চাশটা জোরাল টর্চ! সঙ্গে সঙ্গে অট্টরোল অট্টহাস্য। শব্নমের সখীরা চতুর্দিকের দেয়ালের সঙ্গে গা মিশিয়ে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়েছিলেন এই শুভ মুহূর্তের জন্য। আলো জ্বালিয়ে সঙ্গে সঙ্গে গাঁইয়া গান ধরলে,
‘রুটি খায় নি, দাল খায় নি, খায়নি কভু দই,
হাড়-হাভাতে ওই এল রে—বাবে তোরে সই!
মরি, হায় হায় রে!’
কাবুলের বজ্র-বিগলন শীতে আমার মন ঘেমে ঢোল-না, না, ঢোল নয়, জগঝম্প।
সব ছবি ভুল, কুল্লে তসবীর তালগোল পাকিয়ে প্রথমটায় পিকাস্সোতে পরিবর্তিত হয়ে অন্তর্ধান করল।
বিরাট ঘর। কাবুলের গৃহস্থ বাড়ির চারখানা বৈঠকখানা নিয়ে এই একটা ঘর।
তার সুদূরতম কোণে একটি গোল টেবিল। টেবিলক্লথ ভারী মখমলের-জমে যাওয়া রক্তের কাল্চে লাল রঙের। তার উপরে সেই প্রাচীন যুগের গ্লোবওলা এক বিরাট রীডিং-ল্যাম্প। সমস্ত ঘর প্রায়ান্ধকার রেখে তার গোল আলো পড়েছে শব্নমের মাথার উপর, হাঁটুর উপর, পাদপীঠে রাখা তার ছোট্ট দুটি পায়ের উপর। ঠাণ্ডা, মোলায়েম আলো-আর সেই আলোতে শব্নম বাঁ হাতে তুলে ধরে একখানা চটি বই পড়ছে।
শান্ত, নিস্তব্ধ, নির্দ্বন্দ্ব, গ্রন্থিমুক্ত বিশ্রান্তি।
ত্রিভুবনে আর যেন কোনও জনপ্রাণী কীটপতঙ্গ নেই। শুধু একা শব্নম। সে প্রশান্ত চিত্তে অপেক্ষা করছে তার দয়িতের জন্য। সে আসছে দূর-দূরান্ত থেকে-যেখানে তৃতীয়ার ক্ষীণচন্দ্র গোধূলী লগনের তারাকে পাণ্ডু চুম্বন দিয়ে বাঁশবনের সবুজনীড়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
আশ্চর্য! সে আমি! কে বিশ্বাস করবে সে আমি!
পা টিপে টিপে কিছুটা এগুতে না এগুতেই শব্নম মাথা তুলে আমার দিকে তাকালে। যত নিঃশব্দেই আমি এগুই না কেন, তার কান শুনতে পাক আর নই পাক, তার সদাজাগ্রত কোটিকর্ণ-হৃদয় তো শুনতে পাবেই পাবে।
আমি দ্রুততর গতিতে এগুলুম। আমার হিয়ার বেগের সঙ্গে আমি পেরে উঠি কি করে?
শব্নম সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সিংহাসনই বটে। সেই কালচে লালের মখমলে মোড়া, সোনালী কাঁধ হাতলওলা, তার মাঝে মাঝে রয়েল ব্লুর মীনা দিয়ে আঙুর গুচ্ছ আঙুর পাতার নকশা কাটা সুউচ্চ সিংহাসন। বসবার সীট মাটি থেকে আট দশ ইঞ্চি উঁচু। হয় কি না হয়, কিন্তু পিছনের হেলান মানুষের মাথা ছাড়িয়ে আরও দু’মাথা উঁচু।
এই প্রথম শব্নম অমার সঙ্গে লৌকিকতা করে উঠে দাঁড়ালে।
আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ ঠোঁট গাল চিবুক নাসারন্ধ্র কানায় কানায় ভরে তুলে আমার দিকে তৃপ্তি দাক্ষিণ্য আর নর্ম-সম্ভাষণের মৃদু হাসি হাসলে।
গালের টোল কোন অল গভীরে লীন হয়ে গিয়েছে। সেখানে অন্ধকার। আলো ঢুকতে পারে নি বলে? না, সেখানে কেউ এক ফোঁটা কাজল ঢেলে দিয়েছে বলে?
আজ শব্নম সেজেছে।
নববধূকে জবরজ করে সাজানোতে একটা গভীর ত্ত্ব’ রয়েছে। রূপহীনার দৈন্য তখন এমনই চাপা পড়ে যায় যে, সহৃদয় লোক ভাবে, ‘আহা, একে যদি সরল সহজ ভাবে সাজানো হত তবে মিষ্টি দেখাতো; আর সুরূপার বেলাও ভাবে ওই একই কথা না সাজালে তাকে আরও অনেক বেশী সুন্দর দেখাতে!
শব্নমকে সেভাবে সাজানো হয় নি, কিংবা সেভাবে সে নিজেকে সাজাতে দেয় নি।
এ যেন পূর্ণচন্দ্রের দূরে দূরে কয়েকটি তারা ফোঁটানো হয়েছে-চন্দ্রের গরিমা বাড়ানোর জন্য। এ যেন উৎসব-গৃহের সৌন্দর্যের মাঝখানে ধূপকাঠি জ্বালানো হয়েছে। শব্নমের ভাষায় বলি, বাতাসে বাতাসে পাতা গোলাপ-সৌগন্ধের মাঝখানে বুলবুলের বীথি-বৈতালিক!
তার চুলের বিচ্ছুরিত আলোর মাঝখানে থাকে থাকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বচ্ছ রূপালি শামা-প্রজাপতি। মাথায় অভ্র-আবীর ছড়ানো হয়েছে অশেষ সযত্নে, এক একটি কণা করে তিন সখী বাসর গোধূলিতে আরম্ভ করে এইমাত্র বোধ হয় কুল প্রসাধন সমান করেছেন।
চোখের কোল, আঁখিপল্লব, ধনু-ভূরু এত উজ্জ্বল নীল কেন? এ তো কাজল কিংবা সুর্মার রঙ নয়। এ যে এক নবীন জৌলুস। তবে কি নীলকান্তমণি চূর্ণ করে কাজলের কাজ করা হয়েছে? তারই শেষ কয়টি কণা টোলের অতলে ছেড়ে দিয়েছে।
এঁকে বেঁকে নেমে-আসা দুই জুলফের ডগায় আবার সেই নীলমণি-চূর্ণ। একদিকে তুষার শুভ্র কর্ণশঙ্খ, অন্যদিকে রক্ত কপোল।
সে কপোল এতই লাল যে আজ যেন কোনও প্রসাধন প্রক্রিয়া দ্বারা সেটাকে ফিকে করা হয়েছে। বদখ্শানের রুবি চুর্ণ দিয়ে? তা হলে ঠোঁট দুটিকে টসটসে রসাল ফেটে যায়-যায় আঙুরের মত নধর মধুর করে লালের আভা আনা হল কিসের চূর্ণ দিয়ে? এ রঙ তো আমি আমার দেশের বিম্ববিপীর উচ্চতম শাখাতে পল্লববিতানের অন্তরালে দেখেছি-যেখানে মানুষের কলুষদৃষ্টি, দুষ্ট বালকের স্কুল হস্ত পৌঁছায় না।
