‘আমিও নিভৃতে অনকে চিন্তা করেছি, কে সে বীর যে শব্নমের চিত্তজয় করতে সক্ষম হয়েছে। তার সঙ্গে যাদের বিয়ে হতে পারে তাদের সবাইকে তো আমি চিনি। এদের কেউই নয়, সে কথা নিশ্চয়।’
‘বুঝলুম, কোন জায়গায় কোন বিপত্তি বাধা আছে তাই সে তোমাকে পুরোপুরি পাচ্ছে না। আমার বেদনার অন্ত রইল না। ওই একবার আমার নিজের প্রতি ধিক্কার জন্মাল, কেন আমি জ্যোতিহীন হলুম। না হলে আমি তোমাদের বাধাবিঘ্ন সরিয়ে দিতুম না, যার সামনে দু’জন দুদিক থেকে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে?’
সে বেদনা আজ কেটে গিয়েছে বলে তার স্মরণে জানেমনের মুখ পরিতৃপ্তির স্মিতহাস্যে কানায় কানায় ভরে উঠল।
আমি বললুম, ‘আমি বিদেশী। আপনারা আমাকে হিমি-শব্নমের উপযুক্ত মনে করেন কি না সেই ভয়ে আমিও অসহায়ের মত মার খেয়েছি। আমি বুঝি।’
‘তোমার গলাটি আমার ভারী পছন্দ হয়েছে। এখন তো ওই দিয়েই আমি মানুষকে চিনি। আরও কাছে এস বাচ্চা। আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দাও। শব্নম যে রকম দেয়। এ কি, তোমার হাত অত নরম কেন? প্রায় শব্নমের মত।’
আমি হেসে বললাম, বাংলা দেশের লোক আপনাদের মত শক্তিশালী হয় না।
‘বাঙলাদেশ? তাই বল। তাই শব্নমের এত প্রশ্ন, হাফিজ বাঙলাদেশে গেলেন না কেন, হাফিজের অর্থকষ্ট বাঙলার রাজা তো দূর করে দিতে পারতেন, আরও কত কি। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল, একদিন সে যখন এক অজানা কবির কবিতা পড়ে আমায় শোনাতে গেল। ভারী মধুর আর করুণ। ঠিক ফার্সী নয়, আবার ইয়োরোপীয় কবির ফার্সী অনুবাদও নয়। কেমন যেন চেনা চেনা অথচ অচেনা। আবার কেমন যেন এটা-ওটায় মেশান। যেন গন্ধ গোলাপের, চেহারা কিন্তু নরগিসের, এ আবার বসন্তে না ফুটে ফুটছে যেন শীতকালে। একটি কবিতা আমার বিশেষ করে মনে পড়ছে “খুদ-কুশী-ই- সিতারা।” বৃদ্ধ থামলেন। যেন মনে মনে কবিতাটির চোখে মুখে হাত বুলিয়ে নিলেন। বুঝলুম, এটা ‘তারকার আত্মহত্যা’।
আমি বললুম, এ কবির পিতা সূফী সাধক ছিলেন এবং অতি উত্তম ফার্সী জানতেন। কবি ব্যাল্যবয়সে পিতার কোলে বসে বিস্তর ফার্সী গজল-কসীদা শুনেছেন। আসছে গ্রীষ্মে এখানে তাঁর আসবার কথা ছিল; বোধ হয় আপনাদের কবি হাফিজ বাঙলাদেশে যেতে পারেন নি বলে বাঙলার কবি তার প্রতিশোধ নিতে আসছিলেন। এখন তো সব-কিছু উলোট-পালট হয়ে গেল।
জানেমন্ বললেন, হাফিজের পাঁচশ বছর পরে যোগাযোগ এসেছিল তোমাদের কবির মাধ্যমে। আরও ক’শ বছর লাগবে ফের এই যোগাযোগ হতে কে জানে? কে যেন এক বিদেশী জ্ঞানী দুঃখ করে বলেছেন মানুষ একে অন্যকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করে বেশী—দু’জনের মাঝখানে সেতু বাঁধার চেষ্টা করে তার চেয়ে ঢের ঢের কম;-
‘হায় রে মানুষ,
বাতুলতা তব
পাতাল চুমি;-
প্রাচীর যত না
গড়েছ, সেতু তো
গড়ো নি তুমি।’
তাই প্রার্থনা করি, শব্নমে তোমাতে আজ যে সেতু গড়লে সেটি অক্ষয় হোক।
আমি বললুম, ‘আমিন—তাই হোক।’
এমন সময় খবর এল, ভোজে বরকে ডাকা হচ্ছে।
উঠবার সময় জানেমন্ আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমার যদি একটি কথা বিশ্বাস কর, তবে বলি, শব্নমের মধ্যে এতটুকু খাদ নেই। ওকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করলে তোমার কখনো কোনও ক্ষতি হবে না। মিথ্যা কখনও তাকে স্পর্শ করতে পারে নি। শিশির বিন্দুর মত সত্যই সে পবিত্র, স্বর্গ হতে সে এসেছে সম্পূর্ণ কলুষ-কালিমা মুক্ত হয়ে। আমি বুঝেছি, তুমিও বড় সরল প্রকৃতি ধর। তোমাদের মিলনে স্বর্গের আশীর্বাদ থাকবে।
আমাকে উপহার দিলেন এক বিরাট বদ্খশানী রুবী। তার উপরে খোদাই সম্পূর্ণ কাবা শরীফের ছবি। এত বড় রুবি। আর এ রকম সুক্ষ্ণ খোদাই আমি কাবুল যাদুঘরেও দেখি নি অথচ আমি জানতুম, বদখ্শনে আফগানিস্থানের প্রদেশ বলে কাবুলের জাদুঘরে রুবির যে সঞ্চয় আছে সেটি পৃথিবীতে অতুলনীয়।
বললেন, মনে যদি কখনও অশান্তি আসে তবে এটি আতশী কাচ দিয়ে দেখ। শুনেছি, জমজমের কুয়ো পর্যন্ত দেখা যায়। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে নাকি জল ওঠাবার সাজসরঞ্জাম পর্যন্ত পরিষ্কার ফুটে ওঠে। এটি আমাদের পরিবারের ছ’শ বছর ধরে আছে। প্রার্থনা করি, ‘কাবা যতদিন থাকবে, তোমাদের ভালবাসা ততদিন অক্ষয় থাকবে।’
আমেন!
তারপর আবার সব ঝাপসা। আবছায়া আবছায়া মনে পড়ছে, ভোজে পাশে বসেছিল আমার ছাত্রটি। সে আমাকে এটা ওটা খাওয়াবার চেষ্টা করেছিল আর তার উচ্ছ্বসিত উদ্বেলিত আনন্দ সে কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখতে পারছিল না। আমি নিজের অপ্রতিভভাব ঢাকবার জন্য তাকে সংস্কৃতের ‘হাঁহাং দদ্যাৎ, হুঁহুং দদ্যাৎ’ এবং ‘পরান্নং প্রাপ্য দুর্বুদ্ধে-’ ফার্সীতে অনুবাদ করে মৃদু কণ্ঠে শুনিয়েছিলুম।
রাত প্রায় বারোটার সময় এক অপরিচিত নওজোয়ান আমাকে হাতে ধরে সিড়ি ভাঙতে ভাঙতে তেতলার মুখে এক দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে বললে, বড়ই অফসোস, কি করে হৃদয়-দুয়ার ভেঙে নববরের-নওশাহের-নবীন বাদশার সিংহাসন লাভ করে অভিষিক্ত হতে হয় তার খবর আমি জনি নে। আমার সে সৌভাগ্য এখনও হয় নি। আপনাকে তাই কোন সদুপদেশ দিতে পারলুম না। তবে এটুকু জানি, শব্নম বানুর প্রসন্ন, অতিশয় সুপ্রসন্ন সম্মতি নিয়েই এই শুভ মুহুর্ত এসেছে। আজ পর্যন্ত কাবুলকান্দাহার, জালালাবাদ-গজনীর কোন তরুণই সাহস করে শব্নম বানুর পাণি কামনা করতে পারে নি। আপনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই আপনি তরুণ সমাজের সুস্মিত অভিনন্দনসহ তাদের গর্বের ধনের সঙ্গে চারিচক্ষু মিলনে যাচ্ছেন। সুদিন এলে আমরা আপনাদের নিয়ে যে নয়া পরব করব তখন দেখতে পাবেন আপনি কারও দিলে এতখানি চোট না দিয়ে শব্নম বানুর দিল জয় করেছেন। এ রকম সচরাচর হয় না। শব্নম বানু অসাধারণ বলেই এই অসম্ভবটা সম্ভব হল। আবার অভিনন্দনই জানাই।
