কিংখাপের জামা-জোব্বা পরে মাথা নিচু করে বসে আছি শাদীর মজলিসের মাঝখানে। একবার মাথাটা উঁচু করে চার দিকে তাকালুম। মাত্র একটি পরিচিত মুখ দেখতে পেলুম। আমার কলেজের আমারই ছাত্র। তারই কচি মুখটি শুধু হাস্যোজ্জ্বল। আর সকলের মুখে আনন্দ আতঙ্কে মেশানো কেমন যেন এক আবছায়া অবছায়া ভাব। আবার মাথা নিচু করলুম।
এবারের বিয়েতে শব্নম সভাতে এসে আমার মুখোমুখি হয়ে বসল না। আমার মুখপাত্র হয়ে একজন ‘উকিল’ দুজন সাক্ষীসহ অন্দরমহলে গিয়ে বিবাহে শব্নমের সম্মতি নিয়ে এসে মজলিসে আমার সামনে মুখোমুখি হয়ে বসে বললেন, অমুকের কন্যা অমুক, আপনি, অমুকের পুত্র অমুককে এত স্ত্রীধনে মুহম্মদী চার শর্তে বিবাহ করতে রাজী আছেন—আপনি কবুল আছেন? বাকিটা প্রথম বারের মত।
হ্যাঁ, মনে পড়ল। এর আগে দ্বন্দ্ব হয়ে গিয়েছে স্ত্রীধন কত হবে তাই নিয়ে। সাধারণত বর পক্ষ সেটা কমাতে চায়, কন্যা পক্ষ সেটা বাড়াতে চায়। এখানে হল উল্টো। পরিবারের ঐতিহ্য ও সম্মান বজায় রেখে আওরঙ্গজেব খান কমিয়ে কমিয়ে যে অঙ্ক বললেন, আমি তার গুরুর মারফতে ঢের বেশী অঙ্ক জানিয়ে দিলুম। গুরুই শেষটায় রফারকি করে দিলেন।
বড় দুঃখে তোপল্ খানের কথা মনে পড়ল।
বর-বধুর মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করেছিলেন গুরু। সমস্তটা কবিতা কবিতায়। এবং সব কবিতা মাত্র একজন কবি মৌলানা জালাল উদ্দীন রূমীর থেকে নিয়ে। আশ্চর্য, কি করে জানলেন উনিই আমার সব চেয়ে প্রিয় কবি।
তারপর ও ঝাপসা।
আমার অপরিচিত এক ভারতীয় বোধ হয় আমাকে মুরুব্বীদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি তাঁদের সম্মান জানাতে তাঁরা আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন। সক্কলের পয়লা কার কাছে গিয়েছিলুম মনে নেই। শ্বশুরমশাই কিংবা জ্যাঠ শ্বশুরমশাই—অর্থাৎ জানেমন্—আমি কারও মুখের দিকে তাকাই নি।
এসব কায়দা খাস আফগানী কি না আমি জানি নে। পরে শব্নমের কাছে শুনেছিলুম ওই অপরিচিত ভারতীয় মিত্রটি সবকিছু আধা-আফগান আধা-হিন্দুস্থানী কায়দায় করিয়েছিলেন।
জিরোবার জন্য আমাকে ছুটি দেওয়া হল। বেরুতেই দেখি আমার ছাত্রটি। সে আনন্দে, উৎসাহে সেখানে চেঁচামেচি লাগিয়েছে। আমার সম্বন্ধে তার গুণকীর্তনের যেটুকু কানে এসেছিল তার সিকি ভাগ সত্য হলে তুর্কীর খলীফার সিংহাসন ইস্তাম্বুল যাদুঘর থেকে বের করে এনে তার উপর আমাকে বসাতে হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে নোবেল প্রাইজের সবকটা পুরস্কার নাগাড়ে একশ বছর ধরে আমাকে নিয়ে যেতে হয়।
আমাকে দেখতে পেয়ে লাফ দিয়ে এসে আমার হাত দুখানার উপর তার দুচোখ চেপে ধরে বার বার বলে, “হুজুর, এ কী আনন্দ, আপনি আমাদের দেশে বিয়ে করলেন। হুজুর, ইত্যাদি।” শেষটায় বললে, কলেজের সবাই বড় পরিতৃপ্ত হবে, হুজুর, এ আমি বলে রাখছি।
হায় রে কলেজ! আমরা তখনও জানতুম না বাচ্চা তিন দিন পরে কাবুলের তাবৎ ইস্কুল কলেজ নস্যাৎ করে দেবে।
একটা ঘরে বসিয়ে তামাক সিগারেট আমার সামনে রাখা হল। শব্নমের সমবয়সী আত্মীয়-স্বজনরা প্রথমটায় কিন্তু-কিন্তু করে পরে বাঁধন-ছাড়া বাছুরের মত লাফালাফি দাপাদাপি ঠাট্টা-রসিকতা করলে। আমার কবিতায় শখ জেনে শেষটায় লেগে গেল বয়েৎবাজি, কবিতার লড়াই এবং মুশাইরা। শুধু ফার্সী না—দুনিয়ার যত সব ভাষায়। তবে মোলায়েম প্রেমের কবিতার অধিকাংশই ছিল ফার্সীতে।
খবর এল, জানেমন্ আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
আমাকে সামনে বসিয়ে আমার সর্বাঙ্গে হাত বুলালেন। এমন কি চোখে, নাকে, গালে, কপালে, ঠোটে পর্যন্ত। তখন দেখলুম, তিনি অন্ধ।
অতি মৃদু কণ্ঠে বলতে আরম্ভ করলেন, “শোন বাচ্চা, তোমাকে সব কথা বলার মত লোক বাড়িতে আর কেউ নেই আমি ছাড়া। জন্মের প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত শব্নম একদিনের তরেও আমার চোখের আড়াল হয় নি। আমি জন্মান্ধ নই, যৌবনে চোখের জ্যোতি হারাই। শব্নম সে জ্যোতি ফিরিয়ে এনেছে। আজ যদি কেউ বলে শব্নমের ভালবাসার পথে আমি একটিমাত্র কাঁটা পুঁতলে আমার চোখের জ্যোতি ফিরে পাব তা হলে আমি সে প্রস্তাব হেসে উড়িয়ে দেব।
‘প্রথম দিনই আমি বুঝতে পেরেছিলুম, সে ভালবেসে ফিরেছে। যখন ফিরে এল, তখনই শুনি তার গলা বদলে গিয়েছে, তার হাসি বদলে গিয়েছে, আমাকে আদর করার ধরন বদলে গিয়েছে। যেন এতদিন ছিল পাতার আড়ালে লুকানো ফুল-এখন তার উপর পড়েছে প্রভাত বেলার স্নিগ্ধ আলো। ঘরের কোণের প্রদীপ হঠাৎ যেন আকাশের বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। তার নিশ্বাস-প্রশ্বাসে যেন এক নবীন মাধুরী এসে ধরা দিয়েছে। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নূতন ছন্দে নূতন তালে নেচে উঠেছে।
‘আমার থেকে দূরে চলে গেল? না, বাচ্চা, না। সেই তো প্রেমের রহস্য।’
‘এতদিনে বুঝতে পারল, আমি তাকে কতখানি ভালবেসেছি তোমাকে ভালবাসার পর। আগে আমার কাছে আসত ঝড়ের মত, বেরিয়ে যেত তীরের মত। এখন আমার সঙ্গে কাটায় ঘন্টার পর ঘণ্টা। তোমার বিরহ থেকে বুঝেছে, সে আড়ালে গেলে আমার কী দুশ্চিন্তা হয়। যে-বেদনা সে পেয়েছে, সেটা সে আমাকে দিতে চায়। অথচ দুই ভালবাসায় কত তফাৎ। আমার ভালবাসা স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নালোকের মত, তোমার ভালবাসা মরুভূমিতে মরণাপন্ন তৃষ্ণার্তকে সঞ্জীবনী অমৃতবারি দেওয়ার মত।’
আমাকে কিছু বলে নি। আমিও জিজ্ঞেস করি নি। প্রেম গোপন রাখতে যে গভীর আনন্দ আছে তার থেকে আমি তাকে বঞ্চিত করতে যাব কেন? শুনেছি প্রথম গর্ভধারণ করে বহু মাতা সেটা যত দিন পারে গোপন রাখে। নিভৃতে আপন মনে সেই ক্ষুদ্র শিশুটির কথা ধ্যান করতে করতে সে চলে যায় সেই স্বর্গলোকপানে যেখান থেকে মুখে হাসি নিয়ে নেমে আসবে এই শিশুটি।
