আমি বললুম, আপনি শতায়ু হন।
বৃদ্ধের রসবোধ আছে। বললেন, আমার বয়স আশী হয়েছে আরও কুড়ি বছর বাঁচতে চাই নে। বরঞ্চ ওই কুড়িটি বছর আপনি আপনার আয়ুতে জুড়ে দিন কিংবা শব্নম বানু আর আপনাতে ভাগ করে। কোন জিনিস বরবাদ করাটা আমি আদপেই পছন্দ করি নে। এখন, প্রথম কথাঃ আওরঙ্গজেব খান আপনাকে জানাতে বলেছেন, আজ সন্ধ্যায় আপনাদের বিবাহ। আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাব।
‘দ্বিতীয় কথা! আপনার বন্ধু-বান্ধব কে কে এখানে আছেন তাদের নাম-ঠিকানা বলুন। আমি কিংবা আমাদের বাড়ির লোক তাদের নিমন্ত্রণ জানিয়ে আসবে উভয় পক্ষ থেকে। দুজন করে লোক যাবে।
আমি বললুম, এই দুর্দিনে নিমন্ত্রণ করে কাকে আমি বিপদে ফেলি। তাদের কারোর যদি ভালমন্দ কিছু একটা হয় তবে তাদের বাল-বাচ্চার সামনে আমি আমার মুখ দেখাতে পারব না। আর আমার সেরকম মিত্র বা সখাও কেউ নেই। এদের সকলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে এখানে—তাও সহকর্মীরূপে। কিন্তু তার পূর্বে আমার উচিত আপনার বাড়িতে গিয়ে আপনাদের সকলকে নিমন্ত্রণ করা।
বৃদ্ধ ব্যাকুল হয়ে বললেন, না, না, না। আপনি বিদেশী এদেশের অবস্থা জানেন না। এখন শুধুমাত্র লৌকিকতা করার জন্য রাস্তায় বেরনো উচিত নয়। আমি আপনার হয়ে তাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ জানাব। তারা সবাই বরপক্ষের হয়ে যাবে।
‘এবারে আপনার খিদমৎগার আবদুর রহমানকে দাওয়াৎ করতে হবে।’
আমি বললুম, তাকে ডাকি।
আবার ব্যাকুল হয়ে বললেন, না, না, না। আমি তাকে হিন্দুস্থানী কায়দায় কনে পক্ষ থেকে নিমন্ত্রণ জানাব তার কাছে গিয়ে।
‘তৃতীয় কথা : আপনার জামা-কাপড়ের ব্যবস্থা আমি করব। আমার মেয়ে আপনার মোটামুটি উচ্চতা আওরঙ্গজেব খানের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে এবং সেলাইয়ের কলে বসে গিয়েছে। এতো জোব্বার ব্যাপার, হাঙ্গামা কম। এবার আপনি আমায় বুকে বুক লাগিয়ে দাঁড়ান। আমি ঠিক ঠাহর করি নি।’
মোকা পেয়ে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা আলিঙ্গনও দিলেন।
আমি তাঁর হস্তচুম্বন করে বললুম, ‘আমার বলতে সাহস হচ্ছে না, কিন্তু কাপড় চোপড়ের খরচটা?’
বৃদ্ধা সপ্রতিভ। বললেন, নিশ্চয়! খয়রাতি বা ধারের জামাজোড়ায় বিয়ে করাটা মনহুসী—অপয়া।
আমি বললুম, এদেশে ভারতীয় কারেনসির কদর আছে বলে শুনেছি।
তাঁকে আমার মানিব্যাগটা দিলুম।
তিনি দুএকখানা নোট তুলে নিয়ে বললেন, বিয়ের পর শব্নম আর আমার মেয়েতে বোঝাপড়া করে নেবে।
বৃদ্ধ উঠলেন।
এঁর কথা বলার ধরন শোনবার মত। শব্নম বয়েৎ ছাড়ে মাঝে-মধ্যে, ইনি প্রায় প্রত্যেকটি কথা বললেন, বয়েতের মারফতে। ঠিক বলতে পারব না, বোধ হয় তাঁর মেয়ে যে সেলাইয়ের কলে বসে গেছেন সেটাও বয়েতেই বলেছিলেন। কিন্তু শব্নমের বেলা যে রকম তাকে থামিয়ে টুকে নিতে পারি, এর বেলা সেটা পারলুম না বলে দুঃখ রয়ে গেল।
আবদুর রহমানকে দাওয়াৎ জানিয়ে বিদায় নেবার সময় আমাকে বললেন, আপনাকে কয়েকটি বয়েৎ শোনালুম, আপনি তো আমাকে একটিও শোনালেন না। আপনার বুঝি এতে মহব্বৎ নেই।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, আপনাকে শোনাব আ-মি? আপনার তো সব বয়েৎ জানা।
তিনি বললেন, সে কি কথা? চেনা গান লোকে শোনে না? নূতন লাইব্রেরিতে গেলে আমরা সর্বপ্রথম চেনা বইয়ের সন্ধান করি নে? জলসা-ঘরে গিয়েও প্রথম খুঁজি চেনা মুখ এবং বলতে নেই, গোরস্তানে গিয়েও প্রস্তরফলকে চেনা জনেরই নাম খুঁজি।
বাপ্স! চার-চারটে তুলনা—এক নিঃস্বাসে।
আমি সায় দিয়ে বললুম, ‘আমার এক বন্ধু একটি কবিতা লিখেছেন। শুনবেন?’ বলে নরগিসের
তোমার আমার মাঝখানে বঁধূ অশ্রুর পারাবার
কেমনে হই পার-?
কবিতাটি শোনালুম। বুড়ো এঘোরে থ’মরে গেলেন। কাবুলের লোক এরকম লিখেছে? অসম্ভব! ওর সঙ্গে আমার আলাপ করতেই হবে। বয়সে নিশ্চয়ই কাঁচা। চিন্তাশীল এবং স্পর্শকাতর। ছন্দে মিলে সবুজ রঙের কাঁচা ভাব একটু রয়েছে। যদি লেগে থাকে তবে ইরান হিন্দুস্থানে একদিন নাম করবে। ইন্শা আল্লা, ইন্শা আল্ল—আল্লা যদি দেন, আল্লা যদি করান।
দেউড়িতে বললুম, আমাকে দয়া করে আপনি বলবেন না।
হেসে বললেন, ‘নওশাহ, নূতন রাজা, নববর, তাই বলেছি। কাল থেকে তুমি বলব। আওরঙ্গজেবও বলেছিলেন, ‘বাচ্চা খিজালৎ মী কশদ’—ছেলেটির আব্রু—শরম বোধ আছে।’ আমি বড় খুশী হয়েছি, আগাজান। আর কানে কানে বলি, ‘শব্নমের মত মেয়ে আমি আমার এই দীর্ঘ জীবনে দুটি দেখি নি। নাম সার্থক করে শব্নমের মত পবিত্র।’
অতি সত্য কথা। তবু আমার অভিমান হল। সবই শব্নম, শব্নম —আমি যেন কিচ্ছুই না।
২.৭ আমার প্রিয়া, আমার বউ
আমার প্রিয়া, আমার বউ, আমার বিবাহিত স্ত্রীকে আবার বিয়ে করতে চলেছি!
এ যেন একই দিনে দু’বার সূর্যোদয়। কিন্তু তাও হয়। সূর্যোদয়ের একটু পরে ঘন মেঘে সূর্য পড়ল সম্পূর্ণ ঢাকা। সব কিছু ভাস-ভাসা অন্ধকার-সূর্যোদয়ের পূর্বে যে রকম। মেঘ কেটে পরিষ্কার আকাশে আবার পূর্ণ সূর্যোদয় হল।
কিংবা বলব, ভারতবর্ষে মানুষ যেমন একই দেহ নিয়ে দুইজন্ম লাভ করে ‘দ্বিজ’ হয়। প্রথম জন্ম তার ব্যক্তিগত, দ্বিতীয় বারে লাভ করে গুরুর আশীর্বাদ, সমাজের সম্মতি। আমাদের এই দ্বিতীয় বিয়েতে আমরা পব পিতার আশীর্বাদ সমাজের মঙ্গল কামনা।
সুস্থ বর স্বাভাবিক অবস্থায়ও পরের দিন ঠিক ঠিক বলতে পারে না কি কি হয়েছিল, কোনটার পর কি ঘটেছিল। আমার অবস্থা আরও খারাপ।
