‘আমার মেয়ে সম্বন্ধে বাপ হয়ে আমি কি বলব। আমি প্রশংসা করতে চাই নে। সে আমার একমাত্র মেয়ে, ছেলেও নেই, তার গর্ভধারিণী-’
এই প্রথম তার সরল দৃঢ় কথাতেও যেন একটু অতি ক্ষীণ কাঁপন শুনতে পেলুম।
‘-অল্প বয়সে মা মারা যান। বাপ হয়ে তাই ইংরেজের মত ম্যাটার অব ফ্যাক্ট বা সাদামাটা ভাবে বলি, তার চারটে ‘বি’-ই আছে। বিউটি, ব্রেন, বার্থ, ব্যাঙ্ক—অবশ্য চতুর্থটা বলার কোন প্রয়োজন ছিল না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘সর্বশেষে আমি আপনাকে সাবধান করে দিতে চাই, আপনি রাজী হলে ফলস্বরূপ বাচ্চার সেনাপতির বিরাগভাজন হবেন।’
এতক্ষণ তিনি আমার দিকে ঝুঁকে, উরুতে দুই কনুই রেখে, চিবুক দুই হাতের উপর রেখে কথা বলছিলেন। এবারে শিরদাঁড়া খাড়া করে ফৌজী কায়দায় সোজা হয়ে বললেন, এবারে আপনি চিন্তা করে বলুন।
তিনি যে ভাবে শান্ত হয়ে আসনে বসলেন তার থেকে বোঝা গেল, প্রিয়-অপ্রিয় নানা রকম সংবাদ শুনতে তিনি অভ্যস্ত। আমার না তাকে বিচলিত করবে না আমার হাঁ তাকে প্রসন্ন করবে।
আমার ‘হাঁ’, ‘না’ ভা বার কি আছে। তবু আমি এতই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলুম যে প্রথমটায় আমি কিছুই বলেত পারি নি। তারপর মাথা নিচু রেখেই নববরের কষ্টে বলেছিলুম, ‘আপনার কন্যাকে আমি আল্লাহতালার মেহেরবানীর মত পেতে চাই।’ আমি ইচ্ছে করেই আমার সম্মতি প্রস্তাবের রূপ দিয়ে প্রকাশ করেছিলুম-কিন্তু আপন অজানতে। আমি বিশ্বাস করি, করুণাময় তাঁর অসীম দয়ায় মূককে যে শুধু ভাষাই দেন তা নয়, সৌজন্যের ভাষাও বলতে শেখান।
আওরঙ্গজেব খান দাঁড়িয়ে উঠে আমায় আলিঙ্গন করলেন।
আসন গ্রহণ করে বললেন, আমার কন্যার কিম্মৎ যদি ভাল থাকে তবে আপনি অসুখী হবেন না। আর আপনি আমার উপকার করলেন। জামাতার কাছে উপকৃত হওয়া বড় আনন্দের বিষয়।
আমি বললুম, আপনি গুরুজন। যদি অনুমতি করেন তবে একটি নিবেদন আছে। আমি আমার গলা ফিরে পেয়েছি।
প্রসন্ন কণ্ঠে বললেন, আপনাকে অদেয় আমার কিছুই নেই।
আমি হাত জোর করে বললাম, আপনি দয়া করে উপকারের কথা তুলবেন না। আমি আপনার কন্যার পাণি প্রার্থনা করছি, শিষ্য যে রকম মুর্শীদের কাছে গুরু-কন্যা কামনা করে।
এবারে তিনি বিচলিত হলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘন ঘন আমার মস্তক চুম্বন করতে করতে বললেন, বাচ্চা-বৎস—তুমি ভদ্র ঘরের ছেলে, তুমি ভদ্র ঘরের ছেলে। তোমার পিতা-মাতার আশীর্বাদ তোমার উপর আছে।
আমি তাঁর হস্ত চুম্বন করলুম।
নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘পাপাচার শুভদ্ধির চেয়ে দ্রুত গতিতে চলে। তাই শুভকর্ম শীঘ্র করতে হয়। বাচ্চার সেনাপতি জাফর খানের পাপবুদ্ধিকে হারবার জন্য তেমাদের বিবাহ যতশীঘ্র সম্ভব সম্পন্ন করা উচিত। তুমি কি বল?’
আমি বললুম, আপনার কাছ থেকে আমার পরিচিত ‘শুভস্য শীঘ্রম’ বাক্যের প্রকৃত নিগূঢ় অর্থ বুঝলুম। এখন থেকে আমার আর কোন মতামত নেই।
‘আজ সন্ধ্যায়?’
‘আজ সন্ধ্যায়!’
উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘সময় কম। ব্যবস্থা করতে হবে। কীই বা ব্যবস্থা করব? এই দুর্দিনে?
আমি জানি শব্নম রাজী, কিন্তু ইনি কোন সাহসে সব ব্যবস্থা করার চিন্তাতে লেগে গেলনে। বোধ হয় কন্যার জনকানুরাগে অখণ্ড বিশ্বাস ধরেন।
আমাকে কোনও কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে এক মুহূর্তেই অন্তর্ধান করলেন।
মুক্তি, মুক্তি, মুক্তি। আমি মুক্তি পেয়েছি।
আর আমাকে হাত-পা বাঁধা অসহায়ের মত মার খেতে হবে না। ওই আমলেই বাঙলা দেশে আমাদের মধ্যে রটেছিল যে টেগার্টের পুলিশ বিপ্লবীদের হাত পা বেঁধে সর্বাঙ্গে মধু মাখিয়ে ডাঁশ পিপড়ের মাঝখানে ফেলে রাখে। আমাকে আর সে যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে না।
আমি এখন শব্নমের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারব।
তার মিলনের জন্য এখন আমাকে আর প্রহরের পর প্রহর গুণতে হবে না। আমি যে কোন মুহূর্তে তার সম্মুখে উপস্থিত হতে পারি। আমার দশদিক এখন সত্যই নিরদ্বন্দ্বা হয়ে গেল।
পরিপূর্ণ আনন্দের সময় মানুষের মন ভিন্ন ভিন্ন দিকে ধায় না। একটা আনন্দ নিয়ে সে পড়ে থাকতে ভালবাসে। শিশুর মত একটি পুতুলই বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমুতে যায়। আমি আমার মুক্তির আনন্দ নিয়ে তন্ময় হয়ে পড়ে রইলুম। আমার অন্য সৌভাগ্যের কথা ভাববারই প্রয়োজন হল না, ফুরসৎ হল না।
এক ঘন্টা হয় কি না হয়, এমন সময় আবদুর রহমান সৌম্যদর্শন এক অতি বৃদ্ধকে আমার ঘরে নিয়ে এল। ধবধবে সাদা চাপ দাঁড়ি, সাদা গোঁপ-মোল্লাদের মত ছোট করে ছাটা নয়, সাদা বাবরী চুল, তার উপর সাদা পাগড়ী, চোখের পাতা এমন কি ভুরু পর্যন্ত বরফের মত সাদা। এবং সে সাদা বেয়ে যেন তেল ঝরে পড়ছে। এর বয়স কম হলে আমি বলতুম, এটা সাদা নয়, সত্যিকারের প্ল্যাটিনাম ব্লণ্ড।
আমি তাঁকে যত্ন করে বসালাম।
অতি সুন্দর ফার্সী উচ্চারণে বললেন, আমি আওরঙ্গজেব খানের গুরু। তার মেয়েরও গুরু। দুজনাকেই ফার্সী পড়িয়েছি। এখনও আমাদের তিন জনাতে মুশাইরা হয়।
‘এই খানিকক্ষণ আগে আওরঙ্গজেব খান এসে আমায় সুখবর শোনালে, আপনার সঙ্গে শব্নমের সাদী আজ সন্ধ্যাবেলাই হবে। আমি বড় খুশী হয়েছি। আমি বড়ই খুশী হয়েছি।’
এইটুকু বলে তিনি দু’খানা হাত তুলে আল্লার কাছে তার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রার্থনা করলেন। আমিও হাত তুলে আস্তে আস্তে ‘আমিন আমিন’ বললুম।
বললেন, ‘যেই শুনতে পেলুম, আপনার মুরুব্বি এখানে কেউ নেই, অমনি আমি বললুম, আমার উপর এর ভার রইল। আওরঙ্গজেব চায় নি যে এই খুন-রাহাজানির মাঝখানে আমি রাস্তায় বেরই। আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিলুম, এ সংসারে আমি এমনিতেই আর বেশীদিন থাকব না—না হয় দু’দিন আগেই গেলুম।’
