তিনি গম্ভীরে—এবং সেই অর্ধসম্বিতেও আমার মনে হল প্রসন্ন অভিবাদন জানালেন? মৃদুকণ্ঠে বললেন, ‘আপনার পরে’—অর্থাৎ আপনি পথ দেখিয়ে নিয়ে চলুন। তিনি কেন এসেছেন, এই ভাবনার ভিতরও আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলমু, শব্নমের গলা মধুর এঁর গলা গম্ভীর, অথচ দু’গলারই আদল এক, ঝংকার সমধ্বনি। যেন শিশু শব্নম বাপের পাগড়ী জোব্বা গোঁফদাড়ি পরে এসেছে।
আমি আপত্তি না জানিয়ে ‘খানা-ই শুমা অস্ত—’ এটা আপনার বাড়ি, বলে আগে আগে পথ দেখিয়ে বসবারর ঘরে নিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ইরানী কায়দায় এবার ‘এটা আপনার বাড়ি’ বলার পর অভ্যাগতজন আদেশ করবেন, গৃহস্থ তাঁর কথা মত চলবে।
আমাকে আসন দেখিয়ে নিজে সোফায় বসলেন।
আমি কার্পেটের দিকে তাকিয়ে রইলুম। ইরান আফগানের মুরুব্বীরা এতে খুশী হয়ে বলেন, বাচ্চা খিজালং মী কশদ—ছেলেটার আব্রু-শরম-বোধ আছে।
শুধালেন, আপনি আমার পরিচয় জানেন?
আমি মৃদু কণ্ঠে বললুম, কিছু কিছু জানি।
বললেন, “তাই যথেষ্ট। আমিও আপনাকে কিছু কিছু চিনি। এদেশে এখন অল্প বিস্তর বিদেশী আসতে আরম্ভ করেছেন কিন্তু আমি সকলের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করবার সুযোগ এখনও পাই নি। তবে গেল বছর আপনাদের কলেজের বাৎসরিক পরবে আপনি এদেশে শিক্ষা বিস্তার সম্বন্ধে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেইটে শোনার সুযোগ আমার হয়েছিল। আপনি বড় একাগ্র মনে অত্যন্ত দরদ দিয়ে আপনার বক্তব্য পেশ করেছিলেন সেটা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। আমার মনে হয়েছিল, আপনি এই পরদেশকে অনেকখানি ভালবেসে ফেলেছেন। নয় কি?
আমি মাথা নিচু রেখেই বললুম, ‘এদেশ আমাকে অবহেলা করে নি। এদেশে আমি আশাতীত ভালবাসা পেয়েছি। প্রতিদানের চেয়েও বেশী দেবার চেষ্টা করেছি।’
‘এই তো ভদ্রজনের আচরণ।’
আমি তখন শুধু ভাবছি, তাঁর এখানে আসার রহস্য কি? তবে কি শব্নম তাকে কিছু বলেছে। তাই বা কি করে হয়?
নিজের থেকেই তিনি কাবুলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অতি সুন্দর প্রাঞ্জল ভাষায় আমাকে বোঝালেন। তাঁর যুক্তিধারা থেকে পদে পদে প্রমাণ তিনি সাধারণ সৈন্যদেরও কঠিন জিনিস বোঝাতে অভ্যস্ত।
সর্বশেষ বললেন, আমি সোজা কথা বলাটাই পছন্দ করি। আমার মনে হচ্ছে, আপনিও সরল লোক। তাই আপনার কাছে অন্য লোক না পাঠিয়ে আমি নিজেই এসেছি। যদিও এ অবস্থায় নিজে আসাটার রেওয়াজ দেশে নেই।
আমি আমার নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠি নি। আমি সিপাই। প্রাণের প্রতি যাদের অত্যধিক মায়া তারা ফৌজে বেশী দিন থাকে না—অন্তত দু’পয়সা কামাবার জন্য আমার ফৌজে থাকার কোন প্রয়োজন ছিল না।
এবার আপনাকে যা বলছি তা গোপনে।
‘আমার একটি কিশোরী কন্যা আছে। লোকে বলে অসাধারণ সুন্দরী। অন্তত তার সে খ্যাতি অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছে। আমি আজ বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়েছি বাচ্চা-ই সকাওয়ের দ্বিতীয় সেনাপতি-প্রথম সেনাপতির ছোট ভাই বছর দুই পূর্বে কাঠ বেচতে এসে তাকে কাবুলে দেখতে পেয়েছিল-আমার মেয়ে সচরাচর পর্দা মানতো না। যে জিনিস তখন তার বদ্ধ উন্মাদবস্থার ও উৎকট কল্পনার বাইরে ছিল আজ সৈন্যদল প্রয়োগে সেটা অসম্ভব নাও হতে পারে।’
‘আপনি হিন্দুস্থানী। আপনি যদি আমার মেয়েকে বিয়ে করেন তবে সে হিন্দুস্থানী ন্যাশনালিটি পেয়ে যাবে। আমি আপনাদের রাজ-দূতাবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি; ভারতীয় এক বড় রাজকর্মচারী বললেন, ‘আইনত আমার মেয়ের যে অধিকার জমাবে সেটা তিনি রক্ষা করার সর্ব চেষ্টা করবেন। যদিও প্রয়োজন ছিল না, তবুও কথা উঠেছিল, এখানে শিক্ষিত অবিবাহিত কে কে আছেন। সেই প্রসঙ্গে আপনার নাম যখন উঠল মাত্র তখনই তিনি সন্তর্পণে তার উৎসাহ দেখিয়েছেন।’
এই অভাবনীয় পরিস্থিতির সামনে পড়ে আমি বিস্ময়েই হোক, আনন্দেই হোক, কিছু বুঝতে পেরেই হোক হয়তো একটা অস্ফুট শব্দ করেছিলাম।
তিনি বললেন, আপনি একটু চিন্তা করুন এবং তার পূর্বে বাকী কথা শুনে নিন।
বাচ্চা-ই-সকাও এখন মোল্লাদের কথা মত চলে। অন্তত তারা বিবাহিতা স্ত্রীলোককে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়াটাতে সম্মতি দিতে পারবে না।
‘ব্রিটিশ এ্যারোপ্লেন ভারতীয় নারীদের আপন দেশে নিয়ে যাচ্ছে। আপনাদের ভারতীয় কর্মচারী আমাকে সদয় আশ্বাস দিয়েছেন, প্রথম সুযোগেই তিনি আমার মেয়েকে হিন্দুস্থান পাঠিয়ে দেবেন।
‘এদেশে ফরাসী জর্মন বিদেশী প্রায় স্বাই অবিবাহিত। কিন্তু আমার মেয়ে কিছুতেই ইউরোপীয় বিয়ে করবে না। প্রথমত তারা খৃষ্টান, দ্বিতীয় তাদের সাম্রাজ্যবাদ প্রবৃত্তি এবং তৃতীয়—বোধ হয় এইটেই সর্বপ্রথম বলা উচিত ছিল তাদের শারীরিক অশুচিতা সে অত্যন্ত ঘৃণা করে। যদিও তার তমদ্দুন-ফরহঙ্গের, তার বৈদগ্ধ্যের অর্ধেকেরও বেশী ফরাসী।’
‘এ কথাটা তুললুম, আপনি হয় তো শুধাবেন, আমার মেয়ের মত আছে কি না। আপনি মত দিলে তাকে আমি জিজ্ঞেস করব, কারণ ধর্মত আইনত সে প্রাপ্তবয়স্কা। যদি সে অমত করে, আশা করি আপনার অভিমানে লাগবে না। যে রকম আমি আপনাকে সরল মনে বলছি, আপনি অমত করলে আমি কণামাত্র অপমানিত বোধ করব না।’
‘কারণ, হয়তো আপনারা আপনাদের গোষ্ঠির বাইরে বিয়ে করেন না; আমরাও আমাদের গোষ্ঠির বাইরে বিয়ে করি নে—যদিও ইসলাম এরকম গোষ্ঠি পাকানো নিন্দার চোখে দেখে। আপনি রাজী না হলে আমি কখনও ভাববো না, আপনি আমার মেয়েকে কিংবা আমি এবং আমার গোষ্ঠিকে খাটো করে দেখলেন।
