‘বাঁচালে। তুমি তো জান, আমার মা নেই।’
যাবার সময় শব্নম বললে, ‘বিপদ ঘনিয়ে আসছে। শিগগিরই তার চরমে পৌঁছবে!’
আমি চিন্তিত হয়ে শুধালুষ, তুমি কিছু জান?
বললে, ‘না। আমি শুধু আমার হাড়ের ভিতর অনুভব করছি।’
আবার কবে দেখা হবে?
এরকম থাকলে রোজই আসতে পারব। তারপর দুজনাই অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলুম, মুখোমুখি হয়ে। বলার কথার অভাব আমাদের কারোরই হয় না, কিন্তু বিদায়ের সময় যতই ঘনিয়ে আসে ততই আমরা শুধু একে অন্যের দিকে তাকাই আর আপন মনে মনে অজুহাত খুঁজি কি করে বিচ্ছেদমুহূর্ত আরও পিছিয়ে দেওয়া যায়। শব্নম আমার মনের কথা আমার বেদনাতুর চোখ দেখেই বুঝতে পারে আর নিজের চোখ দুটি নিচের দিকে নামায়। হয়তো তার চোখে জল এসেছে। কখনও বা জরিয়ে যাওয়া গলায় কি একটা বলতে গিয়ে থেমে যায়।
এবারে বললে, তুমি প্রতিবারে আমাকে দাও আগের বারের চেয়েও বেশী। যত বেদনা নিয়েই বিদায়ের সময়টা আসুক না কেন, পথে যেতে যেতে ভাবি তুমি যে আনন্দ দিয়েছ এর বেশী আর আসছে বার কি দেবে? তবু তুমি দাও, প্রতিবারেই দাও, বেশী করে দাও, উজাড় করে দাও। কি দাও তুমি? আমি অনেকবার ভেবেছি। উত্তর পাই নি। এই যে তুমি আমার সামনে বসে আছ, আমার রাজার রাজা, গোলামের গোলাম এই তো আমার আনন্দের পরিপূর্ণতার চরম সীমা। এর বেশী আমি কীই বা চাইতে পারি, তুমি কীই বা চাইতে পার? তবু পাই, প্রতি বারেই অদ্ভুত অনির্বচনীয় রসঘন আনন্দ। আর যখন তুমি আমাকে বল, ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ তখন আমার দুচোখ ফেটে বেরয় অশ্রু। আমার কানায় কানায় ভরা হৃদয় পাত্র তখন যেন আর বেদনার কূল না মেনে উপছে পড়তে চায়। বল, তুমি আমায় কখনও ত্যাগ করবে না?
আমি থতমত খেয়ে গেলুম। এত কথা বলার পর এই অর্থহীন প্রশ্ন? যেখানে আমরা পৌঁছেছি সেখানে এ প্রশ্ন যে একেবারে অসম্ভব—পাগলেরও কল্পনার বাইরে।
বললে, তুমি আমাকে মার, সাজা দাও, ঘরে তালা বন্ধ করে রেখে দাও, কিন্তু আমাকে ত্যাগ করো না।
আমি কিচ্ছু বলি নি। শুধু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলুম।
বললে, বড় দুঃখে আজ সকালে একটি কবিতা লিখেছি। নিজে কখনও এ জিনিস লিখি নি বলে প্রথম দু’লাইন এক বিদেশী কবির কাছ থেকে নিয়েছি। কিন্তু আজ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে কবিতাটি অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হচ্ছে। তোমার কলমটা দাও। এটা কিন্তু গদ্যে লিখব। এখন পড়ো না,-আমি চলে যাওয়ার পরে পড়ো।
দেউড়িতে এসে অবাক হয়ে শুধোলে, তুমি আবার চললে কোথায়?
আমি বললুম, তোমাকে পৌঁছে দিতে।
দৃঢ়কণ্ঠে বললে, অসম্ভব।
আমি তর্ক করি নি।
ওই একটি দিন, একটি বার, আমি আমার জীবনে তার আদেশ লঙ্ঘন করেছি। তর্ক করে, আপত্তি না তুলে শেষটায় সে হার মানল। আমি বেশ কিছুটা পিছনে তার উপর নজর রেখে রেখে চললুম। বাড়ির দেউড়িতে পৌছে একবার ঘুরে দাঁড়াল।
সে একটি শব্দও উচ্চারণ করে নি, কিন্তু আমি শুনেছি সে বলেছিল, “তোমাকে খুদার হাতে সমর্পণ করলুম।”
বাড়ি ফিরে এসে কাগজখানা চোখের সামনে মেলে ধরলুম।
তোমার আমার মাঝখানে বঁধূ অশ্রুর পারবার।
কেমনে হইব পার?’
দুখ-রজনীর প্রেমের প্রদীপ ভাসায়ে দিলেম আমি
দীরঘ নিশ্বাস পালেতে দিলেম জানে অন্তরযামী।
শেষ দীপ-শিখা দিলেম তোমারে মোর কিছু নাহি আর
‘রা এসো বঁধু, বেগে এস প্রভু, নামাও বেদনাভার।’
এর পর গদ্যে লেখা : ‘এর আর প্রয়োজন নেই।’
তুমি যে অনির্বাণ দীপশিখা জ্বালিয়ে দিয়েছ-
বাকিটা শেষ করে নি।
পুরুষ মানুষ হয়েও সে রাত্রে আমি কেঁদেছিলুম। হে পরমেশ্বর চোখের জলে বলেছিলুম, হে দয়াময়, আমাকে কেন পুরুষ করে জন্ম দিলে? এই বলহীনা সব বিপদ তুলে নেবে আপন মাথায় আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখব? আমি কোনদিন তার কোনও কাজে লাগব না?
২.৬ পরদিন সকালবেলাই খবর পেলুম
পরদিন সকালবেলাই খবর পেলুম, আমানুল্লার সৈন্যদল রাত্রিবেলা হেরে যাওয়াতে তিনি তার বড় ভাইকে সিংহাসনে বসিয়ে কান্দাহার পালিয়ে গিয়েছেন।
রাস্তার অবস্থা আরও ভয়ঙ্কর। বোরকা তো অন্তর্ধান করেছেই, তাগড়া জোয়ানরাও একলা-একলি বেরয় না—এক একটা দলে অন্তত পাঁচ-সাত জন না থাকলে মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। বাচ্চার ডাকু সৈন্যদল রাস্তা ছেয়ে ফেলেছে।
তিন দিন পর আমানুল্লার দাদাও সিংহাসন ত্যাগ করে চলে গেলেন। বাচ্চা সাড়ম্বরে সিংহাসনে বসল।
এ খবর যে কোন প্রামাণিক আফগান ইতিহাসে সবিস্তার পাওয়া যায়-একথা পূর্বেই বলেছি। আমি ইতিহাস লিখতে বসি নি; বাচ্চার আপন হাতে জ্বালানো দাবানল শব্নম ও আমার মত নিরীহ শুষ্ক পত্রের দিকে কি ভাবে এগিয়ে এল সেইটে বোঝাবার জন্য হ্রস্বতম খেইগুলো ধরিয়ে দিচ্ছি মাত্র।
দুহাতে মাথা চেপে ধরে ভাবছি, কি করি, কি করি? কোন দিকে পথ, কোথায় আলো—আর কোনটাই বা আলেয়া?
সুখ চাই নে, আনন্দ চাই নে, এমন কি প্রিয়মিলনও চাই নে-কি করে এই দাবানল থেকে শব্নমকে রক্ষা করি?
আমি রক্ষা করবার কে?
এমন সময় হন্তদন্ত সিঁড়িতে বুটের ধপাধপ শব্দ করে আবদুর রহমান ঘরে ঢুকে প্রায় অস্ফুট স্বরে বললে, ‘সর্দার আওরঙ্গজেব খান এসেছেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে।’ আবদুর রহমানের গলা শুকিয়ে গিয়েছে।
আমি দুবার শুনেও প্রথমটায় ঠিক বুঝতে পারি নি।
তাড়াতাড়ি নিচে নেমে দেউড়ির দিকে এগিয়ে গেলুম।
মাথা নিচু করে কিচ্ছু না বলে নীরব অভ্যর্থনা জানালমু।
