এ-সব বাবদে সোজাসুজি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা ইংরেজের সর্বশাস্ত্রে বারণ। একমাত্র পাত্রীদের কিছু হক আছে। বুড়ো পাত্রী সন্তর্পণে প্রশ্ন শুধিয়ে নিরাস হলেন। বুড়ী মেম একবার ডেভিডের মফস্বলবাসের সময় মেবলের সঙ্গে রাত্তির কাটান। চর্তুদিকে কড়া নজর ফেলে, এমন কি শেষটায় জিজ্ঞেসবাদ করেও কোনো খবর যোগাড় করতে পারলেন না।
বুড়ী বেদনা পেয়েছিলেন। তৃতীয় রাত্রিতে ছিল পূর্ণিমা। জানলা দিয়ে চোখে চাঁদের আলো পড়তে তার ঘুম ভেঙে যায়। পাশের খাটের দিকে তাকিয়ে দেখেন মেব্ল্ নেই। পা টিপে টিপে বারান্দায় এসে দেখেন মেব্ল্ ডেকচেয়ারে সামনের দিকে ঝুঁকে দুহাত দিয়ে, মুখ ঢেকে বসে আছে তার দীর্ঘ বাদামী চুল হাত ছাপিয়ে ফেলেছে। বুড়ী মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, চুলে আঙুল চালাতে চালাতে হঠাৎ চুলের ডগাগুলো ভেজা ঠেকল।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি পাদ্রী-টিলার বহু তরুণী, বিস্তর যুবতীর অনেক বুকফাটা কান্না দেখেছেন, কোন কোন স্থলে সলা-পরামর্শ দিয়ে নানা দিকে নানা রকম কলকাঠি চালিয়ে এদের মুখে হাসি ফোঁটাতেও সক্ষম হয়েছেন, কিন্তু এ নারীর বেদনা কি হতে পারে, সে সমস্যার সন্ধানে কোনদিকে হাতড়াতে হবে তার সামান্যতম অনুমানও তিনি করতে পারলেন না।
বুড়ো পাদ্রী সব শুনে বললেন, এসো, দুজনাতে মিলে প্রার্থনা করি।
সোম একদিন ও-রেলিকে প্রশ্ন শুধাল মাত্র দুটি শব্দ দিয়ে, এনি ট্রাবল?
উত্তরের জন্য মাত্র এক সেকেণ্ড অপেক্ষ করে সোম গুড বাই বলে বারান্দা থেকে নেমে লিচুতলা দিয়ে গেট খুলে বড় রাস্তায় নেমে গেল।
ও-রেলি ভাবলে মাত্র দুটি কথা, এনি ট্রাবল!
স্মরণই করত পারল না, তার জীবনে কখনো কোনো শক্ত ট্রাবল এসেছিল কিনা, যেটাকে সে কাত করতে পারেনি। সে তাগড়া জোয়ান, লেখাপড়ায় ব্রিলিয়ান্ট না হলেও ভালো, গায়ের জোরে কমতি নেই, আর পাঁচটা ইংরেজের মত তিনটে কথা বলতে গেলে সাতবার হোঁচট খায় না-তার আবার ট্রাবল! হ্যাঁ, একটা সামান্য ট্রাবলের কথা মনে পড়ছে বটে। এমনিতে তার মুখে শুধু খই ফোটে না, টোস্ট পর্যন্ত সেঁকা যায়, তবে প্রেমের ব্যাপারে একটু মুখচোরা বলে মেবল্কে বিয়ের প্রস্তাব পাড়তে তার তিনটে রবির সন্ধ্যা লেগেছিল বটে, কিন্তু তারপরের অবস্থা দেখে সে থ-মেবল্ বাহান্ন রববারের আগের থেকেই নাকি তাকে বিয়ে করবে বলে মনস্থির করে ট্রলোর ডিজাইন বানাতে লেগে গিয়েছিল।
ইস্কুলের ব্লু, চাকরির জন্য পরীক্ষা, রাগবিতে একখানা পাজর গুঁড়িয়ে যাওয়া এসব ও-রেলির কাছে কখনো ট্রাবল বলে মনে হয়নি। তার একমাত্র ভয় ছিল মেব্ল্ যদি তাকে গ্রহণ না করে। সেই মেকে পেতে তার তিনটি রববার–অর্থাৎ একুশ দিনের দ্বিারাত্র দুশ্চিন্তা–লেগেছিল বটে, কিন্তু আজকের তুলনায় সে কত সহজ। সেদিন পথহারা ও-রেলির সামনে থেকে হঠাৎ যেন কুয়াশা কেটে যায়, আর সমুখে দেখে বসন্তের মধুরৌদ্রে, নীল আকাশের পটে আঁকা মেব্ল্। ‘উতলা পবন বেগে মেঘে মেঘে’ যেন তার খোলা চুল উড়ে উড়ে চলেছে। হাতে তার একটি ছোট ফুল। তারই এক-একটা পাপড়ি ছিঁড়ছে আর বলছে হি লাভ মী, পরেরটায় বলছে হি লাভ মী নট এই করে করে ভাগ্য গণনা করছে। সর্বশেষের পাপড়িতে হি লাভস মী না হি লাভ মী নট-এ এই জীবন-মরণ সমস্যার সমাধান মিলবে।
ও-রেলির মনে পড়ল, মে সেদিন তার কানের ডগায় চুমো খেয়ে বলছিল, আমি সব সময়ই জানতুম, শেষ পাপরি হি লাভ মী-তেই শেষ হবে। একদিন যখন হল না তখন রীতিমত হকচকিয়ে গেলুম। পরে দেখি একটা পাপড়ি আগের থেকেই ছিঁড়ে গিয়েছিল-টুকরোখানা তখনো বোঁটায় লেগে আছে।
সেসব দিন চলে যাওয়ার পর আজ সোম জিজ্ঞেস করলে, এনি ট্রাবল।
.
তারপর আরো তিন মাস কেটে গিয়েছে। এ তিন মাসের ভিতর আরো পরিবর্তন ঘটেছে। ও-রেলিরা ক্লাব দুরে থাক কারো বাড়িতে পর্যন্ত যায়নি। তার থেকে পরিষ্কার বোঝা গেল তারাও চায় না কেউ তাদের বাড়িতে আসুক। শেষ পর্যন্ত এক পাদ্রী মেম ছাড়া আর কেউ ও-রেলি টিলায় আসত না এবং তিনিও আসতেন যেন অতিশয় দায়ে পড়ে, অন্ধভাবে অন্ধকারে কোন এক ভবিষ্যৎ অমঙ্গল আবছা বুঝতে পেরে মানুষ যে-রকম আত্মজনের কাছে এসে দাঁড়ায়।
তারপর জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের খরদাহের পর নামল বর্ষা। কলকাতার বদখদ দালান কোঠার উপর বর্ষা যখন নামে তখন বড়বাজারের বেরসিক মারোয়াড়ী পর্যন্ত আকাশের দিকে একবার না তাকিয়ে থাকতে পারে না, আর কলেজের মেয়েরা নাকি ছাদের উপর বৃষ্টির জলে ভেজবার অছিলা করে মেঘের জলের সঙ্গে চোখের জল মেলায়। আর তাতে আশ্চর্য হবারই বা কী আছে! ছেলেরা তো কলেজ পাসের পর অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রেম, বিয়ে শাদি মন থেকে কুলোর বাতাস দিয়ে খেদিয়ে দেয়। মেয়েরা শুধু অজানা ভবিষ্যতকে অতখানি ডরায় না বলে বে-এক্তেয়ার প্রেমে পড়ে আর তারই প্রকাশ খুঁজতে গিয়ে রবিঠাকুরের গান আর কবিতা বাঁচিয়ে রাখে। তবে কি রবিঠাকুর এ তত্ত্বটা জানতেন, তাই ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের গান শিখিয়েছেন অনেক বেশী সযত্নে?
মধগঞ্জে এ-সব বালাই নেই–মারোয়াড়ী নেই বললেই চলে, কলেজ নেই তাই কলেজের মেয়েও নেই। মধুগঞ্জী বালিকাদের বিয়ে হয়ে যায় চোদ্দ পেরতে না পেরতেই। এ বিষয়ে ওয়েলশ পাত্রী সাহেবও নেটিভ বনে গিয়েছেন, রুথ-মেরীদের ষোলো পেরতে না পেরতেই বরের সন্ধানে লেগে যান, তাঁর যুক্তি–প্রাচ্যে মেয়েরা বিবাহযোগ্য হয়ে যায় অল্প বয়সেই, এদেশে বিলিতি কায়দা মেনে নিলে শুধু অনর্থেরই সৃষ্টি হয়।
