বিবাহ মাত্রই প্রেমের গোরস্তান, কিন্তু শান্তির, কিন্তু শান্তির আস্তানা।
তাই এখানে কোনো তরুণী অকারণ বেদনায় কাতর হয়ে রবিঠাকুরের কবিতা-গান নিয়ে নাড়াচারা করে না। রবিঠাকুর তাই সে যুগে মধুগঞ্জে অচল।
ঠিক সেই কারণেই প্রকৃতির সৌন্দর্যবোধ মধুগঞ্জে মদনভম্মের মত শহরের সবত্র ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এখানকার লোক নববরষশে ময়ূরের মত পেখম তুলে নাচে না, আবার উত্তরের পাহাড় পেরিয়ে দলে দলে নবীন মেঘ এসে যখন শহরের (জেনের উপর আহার খেয়ে পড়ে তখও মানুষ সেখানে বর্ষার মধুর) দিকটা সম্বন্ধে অচেতন হতে পারে না, আর হবেই বা কী করে? প্রথম যেদিন মধুগঞ্জে কদম ফুল ফোটে সেদিন তার গন্ধে সমস্ত শহর ম-ম করতে থাকে। সে গন্ধে নেশা আছে–রায়বাহাদুর চক্রবর্তীর মত রসকষহীন মানুষেকেও দেখা যায় বেড়িয়ে বাড়ি ফেরার সময় একড়াল কদম হাতে নিয়ে ফিরছেন।
কিন্তু পূর্ব-বাঙলা-আসামের সায়েবরা বর্ষাকালে প্রায় পাগল হয়ে যায়। বিশেষ করে যারা বাগানের ছোট ছোট টিলাতে নির্জন বাসে থাকতে বাধ্য হয়। পাঁচ মাইলের ভিতরে একটা ইংরেজ নেই যার সঙ্গে দুটি কথা বলতে পারে, দিনের পর দিন অনবরত বৃষ্টি, রাস্তা-ঘাট জলে-জোয়ারে ভেসে গিয়েছে, ক্লাবে যাবার কথাই ওঠে না। শেষ পর্যন্ত গ্রামোফোন বাজানো পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। হিসেব নিয়ে দেখা গিয়েছে বেশীর ভাগ সায়েবরাই এই সময় দেশী রমণী গ্রহণ করে। কেউ কেউ ম্যালেরিয়ায় তাদের শুষি লাভ করে সেরে উঠার পর, আর কেউ কেউ একটানা নির্জনবাসের ফলে হন্যে হয়ে গিয়ে।
ও-রেলির মাথার ইপগুলো জোর টাইট করে বাসানো। বর্ষা তাকে কাবু করতে পারে না। তার উপর মেবুও পাশের চেয়ারে বসে।
তবু বোঝা গেল, এ বর্ষা ও-রেলিকে পর্যন্ত অনেকখানি ঘায়েল করে দিয়েছে। ও-রেলি মুষড়ে পড়েছে।
.
০৭.
মাদামগুরের বড় সাহেব বললেন, এ কথাটা আমি কী করে বিশ্বাস করি বলো তো, পার্সি। মেব্ল্ মিশুকে হোক আর না-ই হোক, ওর মত ডিসেন্ট গার্ল আমি জীবনে অল্পই দেখেছি। কলেজ পর্যন্ত পড়েছে, উত্তম রুচি। সে কী করে অতখানি স্টুপ করবে? তুমি ছাড়া অন্য কেউ এ কথাটা বললে তার সঙ্গে আমার হাতাহাতি হয়ে যেত।
বিষ্ণুছড়ার সায়েবের বয়স যদিও কম তবু এ অঞ্চলে তার খ্যাতি-প্রতিপত্তি বিচক্ষণ লোক হিসাবে। আর পরচর্চা, গুজোব রটানো থেকে তিনি থাকেন সব সময়েই দূরে এবং আশ্চর্য, যারা এসব জিনিসে কান দেয় না পাকা খবর তারাই পায় বেশী এবং আর সকলের আগে। বললেন, আমার কাছে এখনো সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তোমাকে তো বললুম, কিছুটা বিশ্বাস না করলে তোমার কাছে আমি কথাটা পাড়তুম না। অবশ্য একথাও আমি বলব, এসব জিনিস আমি শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস করারই চেষ্টা করি।
তোমার মেম, মীরপুরের মেম, এরা সব জানতে পেরেছে?
নিশ্চয় এখন পর্যন্ত না। শার্লট জানতে পারলে আমাকে রাত তিনটেয় জাগিয়ে খবরটা দিত এবং সঙ্গে সঙ্গে মীরপুর ছুটত এমিলিকে টেক্কা মারবার জন্য–অ্যাণ্ড ভাইস ভার্সা। তবে খুব বেশী দিন গোপন থাকবে না। সত্যই হোক আর মিথ্যেই তোক যে-সব মেয়েরা মেলের রুচিশীল ব্যক্তিত্বের সামনে নিজেদের ছোট মনে করত তাদের জিভের ললকানি খুব শিগগিরই আরম্ভ হয়ে যাবে।
সন্ধ্যের পর টেনিস লনের এক কোণে বসে দুই সায়েব অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে ভাবলেন। মধুগঞ্জ অঞ্চলের ইংরেজ কলোনির আসল সর্দার এরাই। বিষয়টি তারা আলোচনা করেছিলেন সেই কর্তব্যবোধ থেকে–এ সম্বন্ধে তাঁরা কিছু করতে পারেন কি না।
শেষটায় মাদামপুর হুঙ্কার দিলেন, বয়, দো ব্রা পেগ।
খবর কিংবা গুজোব যাই হোক, ব্যাপারটা মারাত্মক–গড ড্যাম সিরিয়স–মেব্ল্ নাকি নেটিভ বাটলারটার প্রতি অনুরক্ত।
ঐ মিশকালো, অষ্টপ্রহর মদে-মাতাল-রাঙা-চোখওলা হোঁতকা লোকটার প্রতি মেব্ল্ অনুরক্ত একথা কে বিশ্বাস করবে? একমাত্র শ্রীচরিত্র দেবতারাও জানে না তত্ব মানলে সব কিছুই বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু এই সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য স্ত্রী-নিন্দার সামনে দাঁড়িয়ে বরঞ্চ জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে যায় দেবতারা না হয় দেবীদের চরিত্র চিনতে পারেননি, তাই বলে পুরুষকেও তার স্ত্রী-জাত সম্বন্ধে এই অজ্ঞতা মেনে নিতে হবে এবং মেনে নিয়ে স্ত্রী-জাতকে অপমান এবং নিজের বুদ্ধিবৃত্তিকে লাঞ্ছনা করতে হবে?
কিন্তু এসব তো পরের কথা। প্রথমেই যেটা মনে আসে সেইটেই মাদামপুরের বড় সায়েব বিষ্ণুছড়াকে বললেন- হাতাহাতি হয়ে যেত। তারপর হুড়হুড় করে মনে আসে একসঙ্গে দশটা প্রতিবাদ; ও-রেলির মত সুপুরুষকে ছেড়ে? এক বৎসর যেতে না যেতে? ও-রেলির এতখানি আদর-যত্ন পেয়েও? ও-রেলি কি তবে জানে না?
ঠাণ্ডা মাথা মাদামপুর বললেন, পার্সি, তবে কি তারা পাঁচজনের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে দিয়েছে?
বিষ্ণুছড়া একটুখানি ভেবে নিয়ে বললেন, কিন্তু মেলামেশাটা বজায় রাখলেই তো মানুষের সন্দেহ হ’ত কম।
মাদামপুর দুই ঢোকে ডবল হুইস্কি খতম করে বললেন, মাই গড, নেটিভরা জানতে পারলে লজ্জার সীমা থাকবে না। ওঃ!’
তা ঠিক, তবে কি না জিনিসটা যখন চাবাগিচার ভিতরে আগেও হয়েছে তখন–
মাদামপুর বাধা দিয়ে বললেন, সে হয় শহর থেকে দূরে, বনের ভিতর, টিলার উপরে।
