—আমি আগের দিন খুব মদ খেয়েছিলাম। হ্যাংওভারে ছিলাম।
—সত্যি কি না। হ্যাঁ, না, না?
–হ্যাঁ।
—তবে রে মাগী?
—হ্যাঁ। বিচারপতির প্রতি : প্লিজ নোট। ইওর অনার।
—আর একটু পিছিয়ে যাচ্ছি। আগের বছর। ৩ জুলাই। রবিবার। বেলা সওয়া ১২টা। আপনি তখন দোতলায় দক্ষিণের ঘরে। আপনার স্টুডিওয়। বিখ্যাত স্বপ্ন ও সাধনা ছবিটি শেষ করছিলেন যা বাইশ হাজার টাকায় সম্প্রতি বোম্বাইয়ের জাহাঙ্গির আর্ট গ্যালারি থেকে বিক্রি হয়েছে। আপনার স্ত্রী আপনাদের ড্রইংলবি থেকে ওগো শুনছ এই শুনছ বলে ডাকছিলেন। আপনি তৃতীয়বারে শুনতে পেয়ে উত্তর দেন, কী ব্যাপার? একবার এসো নাগো, উনি ডাকেন।
—হ্যাঁ, এমনটা তো হতেই পারে। কী ব্যাপার!
—আরও দু-একবার ডাকাডাকির পর আপনি চেঁচিয়ে উত্তর দেন, এখন কী করে যাব? এখন আমি ছবিটা শেষ করছি। হেগোপোঁদে যাব?তখন অবশ্য আপনাদের পরিচারিকা ছিলেন না। কিন্তু জাহাঙ্গির থেকে ওই ছবিটাই বুক করতে এসেছিলেন কোটিপতি কালেক্টর শ্রীশ্যাম ক্যাশপ ও, ওখানে আপনার তৃতীয় এগজিবিশনের ব্যাপারে কথাবার্তা বলতে। যদিও বাংলা তিনি একদম জানেন না। এবং, যেহেতু আপনি তখন ওই মূল্যবান ছবিটি তৈরি করছিলেন–তখন লেফট হ্যান্ডার বলে আপনার বাঁ হাতে ব্রাশ ও ডানহাতে প্যালেট–আমরা কি ধরে নিতে পারি যে, আপনার স্বপ্ন ও সাধনার মধ্যে স্ত্রীর প্রতি ওই উক্তি বিশেষত হেগোপোঁদ শব্দটি অননুমেয়ভাবে মিশ্রিত হয়ে আছে?
—প্লিজ স্টিক টু দ্য পয়েন্ট লার্নেড ফ্রেন্ড। আদালত শিল্প সমালোচনার স্থান নয় : বিচারপতি।
—এক্সকিউজ মি মিলর্ড। (নীহারের প্রতি) বলুন!
—তখন আমার মাথায় একটা জেনারেটর পুড়ে যাচ্ছিল।
—হ্যাঁ অথবা না বলুন।
—হ্যাঁ। (দুশ্চিন্তিতভাবে) তা তো কিছুটা থাকবেই।
(বিচারপতির প্রতি ইঙ্গিত)
—আপনি পায়েলকে চেনেন?
—হ্যাঁ। আমার মডেল হিসেবে ছিল কিছুদিন।
—আপনাদের মাল্টি-স্টোরিডের পার্কিং জোনে গাড়ির মধ্যে আপনি তার সঙ্গে উপগত হন।
—আমি ড্রাঙ্ক ছিলাম।
—কিন্তু ড্রাইভার তেওয়ারি ছিল না। সে গাড়ি থেকে নেমে সোজা আপনার বারো তলার ফ্ল্যাটে উঠে যায় এবং আপনার স্ত্রীকে যা বলার বলে সে-ই, মধ্যরাতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। সে রাতেই স্ত্রী ওই প্রসঙ্গ তুললে, আপনি ছি ছি ছি, ড্রাইভারকে তুমি স্পাই হিসেবে লাগিয়েছ—ছি ছি-ছিঃ ছিঃছিঃবলতে বলতে তার কপালে ডাইনিং টেবিল থেকে ডিশ ছুঁড়ে মারেন। তারপর প্রহার করেন।
কিন্তু, তারপর, সারারাত আমি তার শুশ্রুষা করি। তাছাড়া ওসব আগে হত। এখন আর হয় না।
—এখন আর পরনারী করেন না?
–করি। কিন্তু এখন আমার স্ত্রী ওসব মেনে নিয়েছেন।
—এখন আপনারা সুখী?
—আমরা চিরকাল সুখী ছিলাম।
দৃষ্টান্ত–২
—আপনার নাম?
–ডাঃ ব্যোমকেশ বর্মন।
—আপনার স্ত্রীর নাম?
—শুভলক্ষ্মী বর্মন।
—পেশা ডাক্তারি?
—হ্যাঁ।
—আপনি একজন বিশেষজ্ঞ?
—হ্যাঁ।
–কীসে আপনার বিশেষজ্ঞতা?
—ব্রেস্ট ক্যানসারে। আমি হাত দিয়ে টিপে ব্রেস্ট টিউমার বিনাইন না ম্যালিগন্যান্ট বলে দিতে পারি।
-আপনি রোগ নির্ণয়ের জন্য কত নমর্দন করেছেন?
—দেশে না বিদেশে?
—বিদেশের কথাই আগে বলুন।
—হ্যাঁ, বিশেষ করে সুইডেন আর জাপান আমাকে কয়েকবার ডিমনস্ট্রেশন দিতে নিয়ে গেছে। ওখানে তো পেসেন্টরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। ওদের কম্পিউটারে সমস্ত ডাটা আছে। তবে এদেশে
—এ-দেশে?
—এ-দেশে হিসেব রাখা হয় না।
—আপনি মারা যান কত সালে?
—১৯৮৬-র ২৯ সেপ্টেম্বর, ভোর পাঁচটা পাঁচ মিনিটে আই ব্রিড মাই ল্যাস্ট হ্যাফ।
—হোয়াইলাস্টহাফ?
—শেষ নিঃশ্বাসটা আমি আধখানার বেশি নিতে পারিনি।
—আই সি। আপনার কী হয়েছিল?
—মাল্টিপ হার্ট ব্লক।–আচ্ছা, অপারেশন করাবার আগে আপনি দশ লক্ষ টাকার একটা ইনসিওরেন্স করাবার চেষ্টা করেছিলেন। কেন?
—হ্যাঁ, অসুখটা কী আমি ৬ মাস আগেই বুঝতে পারি। তাই তাড়াতাড়ি যদি লক্ষ্মী কিছু পেয়ে যায়!
—অসুখটা ইনসিওরেন্স চেক-আপেই ধরা পড়ল?
–হ্যাঁ।
—ডাঃ জর্জ লুমিস আপনাকে স্টেটসে আসতে বলেছিলেন?
—হ্যাঁ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেলভিউতেই হল। বোম্বে থেকে এলেন ডাঃ ভরোসে। ভাবলাম, কলকাতায় হলে লক্ষ্মী পাশে থাকবে, ছেলেমেয়ে থাকবে—মনে জোর পাব। তাই এখানে করালাম। আমাদের একটা অভ্যাস ছিল। সেই শুভদৃষ্টির দিন থেকে। রোজ ঘুম থেকে উঠে আমরা বিছানায় দুজনে-দুজনকে জড়িয়ে, দুজনে-দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম এক মিনিট–চোখের পলক না ফেলে। পরে এটা তিন মিনিট পর্যন্ত বাড়ানো গিয়েছিল। এক ধরনের যোগা বলতে পারেন। ভাবলাম, মরে যাবার সম্ভাবনাই তো বেশি। ভেবেছিলাম, শেষবারের মতন ওর চোখে-চোখ রেখে……তাই বেলভিউ-এ।
—পেরেছিলেন?
–এন্-না। (হেসে) পারার কথাও নয়। তখন যা হয় আর কী। শেষ মুহূর্তে। সবাই যা করে। আরও আধখানা নিঃশ্বাস নিতে পারি কিনা সেই চেষ্টাই করেছিলাম।
-আচ্ছা, নার্সিংহোমে ভর্তির ডেট পিছিয়ে দিলেন কেন?
—শেষ কদিন তো উকিল, ইনকাম ট্যাক্স আর ব্যাঙ্কের লোকদের নিয়েই কাটল। তারা ছাড়বে, তবেনা যাব? যেখানে যা গোলমাল আছে সব ঠিকঠাক করাতে হল।সমস্ত অ্যাকাউন্ট লক্ষ্মীর নামে ও তার বেনামে ট্রান্সফার করাতে হল। কালো টাকা যা, যথাসম্ভব সাদা করতে হল। ট্রাস্ট, ডিড অফ গিফট এসব করাতে কটা দিন দেরি হয়ে গেল আর কী। আমি আর উইল-টুইলের ঝামেলায় যাইনি। প্রবেট করানো এক ঝামেলা। সে-সব লক্ষ্মী একা পেরে উঠবে না।
