আজ পূর্ণিমা। বিকেল এখনও ফুরায়নি। এর মধ্যেই চাঁদ উঠে এল এতটা! নিচে, নদীর বুকে, দিনের আলো আর জ্যোৎস্না মিশে স্বর্গরঙ। শেষ যাত্রী-নৌকা চলেছে ভুটানের দিকে।
বাংলোর বারান্দায় চা খেতে খেতে দীপ্তি নিশ্চয়ই এটা মিস করছেনা, ভেবে ভাল লাগল।
প্রথম রাতেই মথানগুড়িতে বাঘ ডাকল। খুব একটা দূর থেকেও নয়। কাঠের খুঁটির ওপর গোটা বাংলোটা কেঁপে উঠল। শার্সির ঝনঝন শোনা গেল। দীপ্তি ভয়ে জড়িয়ে ধরল আমাকে। অমন নিবিড়, সপ্রেম আলিঙ্গন সেই প্রথম। এবং একবারই।
পরদিন সকালে একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠে দেখি জিনিসপত্র গুছিয়ে স্নানটান করে দীপ্তি একদম রেডি। কী ব্যাপার!
এখানে আর থাকব না। শিলং যাব।
সে কী। গোল্ডেন লেঙ্গুর দেখবে না? নদীর ওপারে ভুটানে গেলেই সোনালি ল্যাজ ঝুলিয়ে সব… আর একদিন থাকা যাক না।
না।
ওই বিশ-তিরিশটা যা আছে এখানেই। জান? পৃথিবীতে এই স্পিসিসটা আর কোথাও নেই।
একটা জিপ বরপেটা যাচ্ছে। এখুনি। লেট আস মুভ।
এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর স্যাংচুয়ারি। আর একদিন থাকবে না?
এঃ। কী আমার ভূপর্যটক রে। জেলেপাড়ার ছেলে। নাও ওঠো তো। এরপর কবে ট্রান্সপোর্ট পাওয়া যাবে…
বলেছিলাম, আমি পড়েছি। মোস্ট বিউটিফুল স্যাংচুয়ারি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।
ছাপার অক্ষরে?
ছাপার অক্ষরে।
ইংরেজিতে?
ইংরেজিতে। গ্রন্থের নাম : ই পি গির ওয়াইল্ড লাইফ ইন ইন্ডিয়া। তাতে মানস নিয়ে একটা পুরো চ্যাপ্টার আছে। সেখানে রয়েছে। এত সুন্দর জায়গা! তোমার প্রকৃতি ভাল লাগে
দীপ্তি? (আজ আমারও যাচ্ছেতাই লাগে।)।
তুমি থাক তোমার ই পি–কী বললে যেন গি নিয়ে? আমি চললাম–এত বলে সে তার স্যুটকেস তুলে নেয়।
চটি গলাবার আগে খালি পায়ের চেটোর ওপর ভর দিয়ে সে একবার ঈষৎ লম্বা হয়ে আমার সামনে দাঁড়ায়। শিফনের সাদা প্রিন্ট শাড়ির মধ্যে দিয়ে দেখা যায় কালো ব্রেসিয়ার উদ্ধত স্তনের স্পর্ধা তার বোঁটাদুটি : রঙ করেছ। পারিশ্রমিক পেয়েছে। এখন এই স্তন, কটি, জঙ্খ, যোনিদেশ–এসব আমার।
বিয়ের মাত্র ৩ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই, সেই প্রথম দীপ্তির সঙ্গে চোখে-চোখ কুৎসিত ঝগড়া। সেই প্রথম তার আমিত্বের ঘোষণা। আমি তার ঔদ্ধত্য দেখে স্তব্ধ। প্রস্তরীভূত। তার মধ্যে পর-স্ত্রী দর্শন, আমার সেই প্রথম।
দেন, গো টু হেল।
আমি পিছন থেকে তার পাছার উদ্দেশে বলি : আগুন যাকে পোড়াতে পারে না, অস্ত্র যাকে বিদ্ধ করতে পারে না তুমি কি সেই জিনিস?
আজ এমন ঘটনা ঘটলে বলি (মনে মনে), দেন, ফাঁক ইওরসেলফ।
মানসের একা বাইসন, সে বড় ভয়ঙ্কর। ই পি গির বইতে বারবার সতর্কীকরণ আছে। যে, যে-প্রাণভয়ে ভীত হয়ে সে ওভাবে পালাতে পারে, যে ভয় দেখায়, সেই একই অমিত প্রাণভয়ে সে তাকে আক্রমণও করে থাকে। সে যে কী করবে, পালাবে না গুঁতোবে, সেটা তার সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। অরণ্যে তার চেয়ে ভীরু ও দুর্বল প্রাণী নেই। এবং তার চেয়ে সাহসী ও শক্তিশালী প্রাণীও আর নেই।
আক্রমণ করার আগে, ই পি গি জানিয়েছেন, সে দুবার পিছন-পায়ের খুর আছড়ায়। পালাবার আগেও তাই করে। তার পলায়ন ও আক্রমণের ভঙ্গিমা একই। সে দুবার পিছনের পা আছড়ালে, তাই বাঘেও রিস্ক নেয় না। বোঝে না, সে পালাবে, না শিং নামিয়ে তেড়ে আসবে। বাঘ উভয়ত পালায়।
দীপ্তিকে কিছুকাল আগেও আমি মাঝে-মাঝেই বোঝাতাম, আচ্ছা,দীপু,এই যে দিবারাত্র এত খোঁচাখুঁচি কর, আঁ, সে কোন ভরসায়। আমি তো খাঁচার মধ্যে নেই। কিংবা, যদিই থাকি, যাকে তুমি খাঁচা বলে দেখছ, সেটা তো পাকাটিরও হতে পারে?
এত বলে আমি মানসের সেই ভীত বাইসনটির কথা না-ভেবে পারি না যে পা আছড়েছিল ঠিকই। কিন্তু সেবার ভয়ে।
এ সব তোমার মালের টেবিলের বন্ধুদের বোলো। হাতোলি পাবে।
খুব একটা ভুল বলে না দীপ্তি। আজ আর।
তার ভাষা নেই। তাই তার হয়ে উত্তরটা আমি আজ নিজেই নিজেকে দিয়ে থাকি।
ষাঁড় বটে। কিন্তু তুমি ভাই দাগা। ধর্মের। ঘুরে বেড়াচ্ছ কাশীতে।
রাঁঢ় ষাঁড় ঔর সিঁড়ি-সন্ন্যাসী
যব তক বাঁচে
তব তক কাশী।
০৩. পরম পরমাণু বা সমুদ্রপাখির ডাক
প্রশ্ন : এই তাহলে ছিল তোমার বিবাহিত জীবন?
উত্তর : কোয়ার্ক!
প্রঃ : তবু তোমরা একসঙ্গে?
উঃ : কোয়ার্ক! কোয়ার্ক!
পৃথিবীর সব দম্পতিই এমন, আমি তা বলি না। আমাদের চেয়েও ঢের অমানুষিক সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত আছে।
এখন, আদালতের পরিভাষায়, আমি দু-একটি এক্সিবিট পেশ করব। দৃষ্টান্তগুলি কাল্পনিক নয়। নামটাম পাল্টে দিলেও ঘটনা অদলবদল করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমি লেখক নই এবং আমার কল্পনাশক্তি শূন্য (অবশ্য, লেখক না হলেও আমি এটা জানি যে, কল্পনাশক্তি যাদের থাকে তারা অতি হেঁদো লেখক)। অতএব, যে বা যাঁরা উদাহরণগুলির মধ্যে নিজেদের খুঁজে পাবেন, তারা ভুলেও যেন না ভাবেন, আমি তাদের কথা হয়ত বলছি না। আমি ঠিক তাদেরই সাক্ষ্য দিতে ডাকছি। আত্মপক্ষ সমর্থনের খাতিরেই আমাকে এ কাজ করতে হচ্ছে, যা খুনিরও আছে। আমি নাচার।
দৃষ্টান্ত–১
—আপনার নাম বলুন।
–নীহার মজুমদার।
—পেশা?
—শিল্পী।
—পেইন্টার না স্কাল্পটর?
—পেইন্টার।
—স্ত্রীর নাম?
–হিমানী।
—মজুমদার?
–মজুমদার।
—আপনারা সুখী দম্পতি?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
—আচ্ছা, গত ১৭ জানুয়ারি সকালবেলা। আপনি সদ্য ঘুম থেকে উঠে, রেডিওয় হারানো দিনের গান শুনছিলেন : গানের সুরে জ্বালব তারার দীপগুলি…। আপনার বিধবা, পরে মৃতা, ছোটবোন গাইতেন। তখন আপনার পরনে আন্ডারউইয়ার ছাড়া কিছু ছিল না, বিছানায় বসে চাদর মুড়ি দিয়ে আপনি গানটি শুনছিলেন। ওই সময় আপনার স্ত্রী ঠিকে-ঝি নন্দর মা আগের দিন আসেনি বলে তার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে গজগজ করছেন। আপনি আন্ডারউইয়ার পরে পরিচারিকার সামনে গিয়ে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে তাঁকে বলেন, এমন একটা সুন্দর গান হচ্ছে, বকুল গাইত… একটা পাখি উড়ে গেলে ভাগাড়েও ছায়া পড়ে তোমার ক্ষেত্রে কি সেটুকুও প্রযোজ্য হয় না!, প্রযোজ্যশব্দটি আপনি ইউজ করেছিলেন, যার আর্বান এফেক্টের দরুন, স্বীকার করি, এটাকে ঠিক খিস্তি বলা যায় না। কিন্তু, কনটেন্ট-ওয়াইজ, এ তো স্ত্রীকে তবে রে মাগী বলার প্রকারান্তর। নয় কি?
