আসলে, প্রজাপতি ঋষির নামে ওই মন্ত্রগুলো। কবিতা, ছবি আর গানগুলো। ওই ভালবাসার গল্পগুলো। রোমিও-জুলিয়েট না হয় মিঠুন চক্রর্তী আর মাধুরী দীক্ষিত, অমন যে ডাকসাইটে রাসকলনিকভ, সেও কিনা, সোনিয়ার (যদিও বেশ্যা, স্ত্রী নয়) প্রেমে হ্যাঁ বলল। বা, পুতুলনাচের ইতিকথার শশী! সেও কি একবারটি জ্বলে উঠল না সেই অলীক শিখা হয়ে যার বাইরেটা হলুদ এবং ভেতরটা নীল—অর্থাৎ কিনা, রাধা এবং কৃষ্ণে-যখন সে জানতে চাইল, শরীর, শরীর! তোমার মন নাই কুসুম? (যদিও পরস্ত্রী)।এ পৃথিবীতে একজন সন্তও আজও দেখা গেল না, হায়, যার ঈশ্বরে প্রয়োজন নেই। অথচ, ঈশ্বর বিনা সন্ত হওয়ার সম্ভাবনা যদি না থাকবে, তাহলে প্রেম বিনা এত লক্ষ কোটি দম্পতি এই গ্রহের পিঠে এমন ড্যাং ডেঙিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কী করে।
তাই বলছিলাম, দীপ্তি যখন বলে আমরা, ঘাসফুল ও লতা-পাতায় ঢাকা নিপুণ হাতে ফদা সেই গহ্বরের সামনে আমি থমকে দাঁড়াই ও পাথরে দুবার খুর ঠুকি।
আমার মনে পড়ে, মধ্যিখানে-চরে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কালোধূসর সেই বাইসনকে–যেবার, বিয়ের তৃতীয় বছরে ১৯৭২-এর ডিসেম্বরে, আমরা গিয়েছিলাম মানস স্যাংচুয়ারিতে।
তখন বিকেলবেলা। তার পিছনে তিন দিকে কোথাও নীল, কোথাও সবুজ, কোথাও অস্তরাগে রাঙা ভুটান হিলস। তার দুপাশ দিয়ে কাকচক্ষু মানস নদী দ্বিধারায় বহে চলেছে। তার সামনে, নদীর ওপার। যেখানে, যতদূর দেখা যায় দিগন্ত পর্যন্ত হাতি-ঘাসের অরণ্য। সূর্য সেখানেই অস্ত যাবে।
হাতির পিঠে সামনে মাহুত, মাঝখানে আমি, পিছনে দীপ্তি।হঠাৎবাঁ-হাতের তর্জনী ঠোঁটের ওপর রেখে দক্ষিণবাহু অঙ্কুশ সহ তুলে মাহুত তিন-চারশো গজ দূরে অনন্ত স্থিরচিত্রে অর্পিত সেই তাকে, বাইসনটিকে, আমাদের দেখায়।
আমরা দেখলাম, তিন-চারটি বৃত্তে পাকানো তার দুটি শিঙে। (যা দৈঘে সাত থেকে ন ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং শুরু হয় কমপক্ষে আট ইঞ্চি প্রস্থ দিয়ে) জড়িয়ে আছে অনেকদিনের লতাপাতা, ঘাস ও ফুল–যা বিশাল ও বর্ণময় মুকুটের মতোই দেখাচ্ছিল। সে একা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল স্থির অথচ বিপন্ন এক মুগ্ধতার দৃষ্টান্ত হয়ে। পশ্চিম দিগন্ত থেকে বিধাতার শ্রেষ্ঠ আলোকসম্পাত ক্রমে এগিয়ে এসে তার একাকীত্বকে ঘিরে ধরে।
এমন দৃশ্য জীবনে কটা, যা আমৃত্যু মনে থাকবে? এটা ছিল তেমনি এক নিঃসঙ্গ অভিজ্ঞতা।
আমাদের সে দেখতে পেয়েছিল অনেক আগেই। তবু হঠাৎ একটা হাওয়া উঠে মনুষ্যগন্ধ তার নাকে নিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সে নিশ্চিত হতে পারেনি। তারপর…
সেই প্রথম বোঝা গেল সে চলৎশক্তিহীন নয়।
সে দুবার পেছন পায়ের খুর ঠোকে। তারপর শুরু হল তার মৃত্যু-ভীতির সেই প্রবল ঝড়-দৌড়।
অমন ভয়াবহ ভয় পেল সে, কেন যে।
প্রথমে বালি, তারপর নুড়ি, তারপর ছোটবড় বোল্ডার–স্তরে স্তরে খুরধ্বনি বাড়িয়ে গোটা নদী-উপত্যকা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শোন ব্রিজের ওপর দিয়ে ডুন এক্সপ্রেসের আলো চলে যাওয়ার গতিদিব্যতায় সে নদী পেরিয়ে ছুটে চলল একটানা, ওপারের ওই ঘন ঘাসের জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে, বুঝি তার শিঙের নাড়া খেয়েই, দিগন্তে সূর্য উঠল ঈষৎ লাফিয়ে।
হাতির পিঠ থেকে মাহুত যেভাবে দেখিয়েছিল, সেভাবে, অশরীরী বিমুগ্ধ হাত তুলে আমি দীপ্তিকে দেখাই : লতাপাতা আর ঘাসফুলে তৈরি সেই বিশাল মুকুটটা নদী পেরোবার সময় কখন তার মাথা থেকে খসে পড়ে, আমি লক্ষ্যই করিনি। এখন স্বর্গস্রোতধারা ধরে ভেসে চলেছে। ওই যে।
দীপ্তি মাহুতকে বলল, বাংলোয় ফিরে চল।
বলবার দরকার ছিল না। মাহুত হাতির মুখ আগেই ঘুরিয়ে নিয়েছে। সূর্য ডুবে গেছে।
এখানে হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসে।
দীপ্তি বলল মাহুতকে, দাঁড়াও। হাতি বৈঠাও। আমার দিকে চেয়ে, আমি পেছনে বসব না।
মাচান থেকে যখন হাতির পিঠে সবার পিছনে চাপে, আমি তখনই বলেছিলাম, এটা মথানগুড়ির বাংলো। কোর এরিয়া। এখানে বাঘ থাকে। আর বাঘে হাতির পিঠে লাফায় পেছন থেকেই।
মাকড়সায় ঘৃণা, আরশোলায় আতঙ্ক। কিন্তু তখন ভাবখানা ছিল, আমার বাঘের ভয় নেই। তাছাড়া আমি যখন জানি, কথাটা ভুল। এখানে বাঘ থাকে না। তাহলে কি বাংলো থাকত। মানুষ আসত। থাকলেও বাঘ পেছন থেকে লাফায় না। হাতির পিঠে।
আমি বলেছিলাম : আমি ছাপার হরফে পড়েছি। তাও বাংলায় নয়। ইংরেজিতে।
দীপ্তি তখন শোনেনি। সেই পিছনেই বসেছিল।
ফেরার পথে হাতি বসলে, এবার আমি পিছনে চলে এলাম। ওর কথাই ঠিক। হাতির পিঠে বাঘ পেছন থেকে লাফায় না। বরং এবার আমার কথায় সামনে বসার দরুন, মাঝখান থেকে, একটা ডালের ঝাপ্টা লেগে ওর কপালটা বেশ ছড়ে গেছে। বাংলোয় হাতি থেকে নেমেই দীপ্তি আমাকে অভিযুক্ত করল।
এসব ব্যাপারে বলতে হয় না কিছুই। বাংলোয় না ফিরে পাহাড়ি বনের ভিতর দিয়ে আমি অ্যান্টিসেপটিকের খোঁজে বিট অফিসার দেবেন্দর ঠাকুরের কোয়ার্টারের দিকে চললাম।
ভুটান এবং আসাম, মানস স্যাংচুয়ারি দুদিকেই ছড়িয়ে। ২৮৪০ স্কোয়্যার কিলোমিটার। আমি জানি। এখানে ১৮০টা বাঘ আছে, আসার সময় টাইগার প্রোজেক্টের দেববর্মা আমাকে বলেছে। আমি জানি।১৮০ ব্যাঘ্ৰসঙ্কুল মানসের কোর এরিয়া ভেদ করে, ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, দীপ্তির জন্যে দু-চার ফেঁটা স্যাভলনের খোঁজে এই ভরা সন্ধেবেলায় আমি এগিয়ে যাই।
