মেয়ে চৈতি এসে জানায়, জলের জাগের ওপর একটি আরশোলা দেখা দিয়েছিল। চলে গেছে।
আমি : তা, একটা আরশোলা গেরস্ত বাড়িতে মাঝে-মধ্যে দেখা দেবে না? ও কি সাধ করে বসেছিল জলের জাগে? ওর যদি সেই জ্ঞান থাকত যে ওটা জলের জাগ, পায়খানার মগ নয়, তাহলে কি ও…
চৈতি : হ্যাঁ। কিন্তু মাকে সেটা বোঝাবে কে?
আমি (চেঁচিয়ে) : যেভাবে আর্তনাদ করে উঠলে, জলের জাগ জড়িয়ে একটা সাপ উঠতে দেখলে, সত্যিকারের সর্বনাশ এলে, সেদিন তাহলে কীভাবে চেঁচাবে?
দীপ্তি (মুখে ভাত-তরকারি) : চৈতি, বাবাকে ভ্যাড়র-ভ্যাড়র করতে বারণ কর। আমি এখন কলেজে যাচ্ছি। এক ঘণ্টার পথ।
তা সত্যি। আমি চুপ করে যাই। সাজগোজ শেষ করে, শুধু পায়ে চটি পরার কাজটুকু বাকি রেখে, শেষকৃত্য হিসেবে সে বাথরুমে যায়। সোম আর শুক্র এই দুদিন পরপর প্রথম দু পিরিয়ড তার অনার্স ক্লাস। বাস-জার্নি ধরে ঝাড়া তিনটি ঘণ্টার ব্যাপার। কলেজে পৌঁছেই সোজা ক্লাসে। ক্লাসে যদি বাথরুম পায়, সে ভারি বিশ্রী। চৈতির সঙ্গে তার আলাপচারীতে এ কথা জানা গেছে যে, সে আজকাল ইলাবোরেশান অফ থট প্রপারপড়াচ্ছে। সাইকোলজির একটি রীতিমত জটিল বিষয়।
আলোচ্য বিষয়ে ফিরে আসা যাক। যা বলছিলাম : আমরা। আমরা বলতে আমি আর দীপ্তি। স্বামী-স্ত্রী। আমাদের দুজনের যত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী সমাজ যাদের সংস্পর্শে আমরা এসেছি এবং আরও আসতে থাকব—সর্বত্র আমাদের পরিচয় তো একটাই। আমরা বিবাহিত। আমরা স্বামী-স্ত্রী। আইনের চোখে তো বটেই। অন্তত, ডিভোর্স না হওয়া পর্যন্ত।
অথচ, আমরা জানি, জন্তু-জানোয়ারদের ক্ষেত্রে যেমন হয় না, আমাদের বিবাহ হয়নি।
প্রশ্ন : আচ্ছা, এ পৃথিবীতে সংজ্ঞার্থে কোনও নরনারীর বিবাহ কি এ যাবত কোথাও হয়েছে?
এটা আমার একটা আন্তরিক জিজ্ঞাসামাত্র। এর উত্তর আমার জানা নেই। তাই। শুধু জানি, আমাদের সেই অর্থে হয়নি। অর্থাৎ, সংজ্ঞার্থে।
এসপ্ল্যানেড টু চেতলা-১৭,৩বি, ট্যাক্সি বা মিনি যাতেই আসি, প্যারিস হলের সামনে দিয়ে নিত্য আসা-যাওয়া। পৌষ মাস-ভাদ্র মাস নেই সেখানে রোজ বিয়ে। দিনে দিনে প্যারিসের র্যালা যেন বেড়েই চলেছে। মাড়োয়ারিদের বিয়ে হলে তো কথা নেই। আলোর রোশনাই তখন ভিক্টোরিয়া মৃত্যু-সৌধকেও টেক্কা দিতে চায়। তোরণ-দ্বারে ইংরেজি নিয়ন অক্ষরে অনেকটা ডানলপ ইজ ডানলপ—অলওয়েজ অ্যাহেড ধরনে জ্বলে-নেবে বর কনের নাম: সুরেশ ওয়েড্স পদমিনি। ডিস্কো মঞ্চ থেকে ভেসে আসে হাসান জাহাঙ্গিরের গান:
হাওয়া, হাওয়া, এ হাওয়া, খুসবু লুটা দে
ইয়ার মিলা দে, দিলদার মিলা দে…
কিন্তু যত ফুলে-ফুলেই ভরে উঠুক বিবাহের মণ্ডপ, আলোর রোশনাই কি সানাই, কনের গা ভরে যাক গয়নায় চূড-ব্রেসলেট-নেকলেশ বাউটি ও বালায় কি লাল বেনারসিতে, সিঁথিতে যতই ঢালা হোক সিঁদুর–আদি যৌনধ্বনি উলু আর শাঁখে বর আর কনের শরীর যতই ভরিয়ে দিক মিলনোন্মত্ত বাঘ-বাঘিনীর গানে—বিবাহের উল্কি যতই করে পড়ুক তাদের সর্বাঙ্গে আমি জানি বা জানাতে চাই যে, কিছুই, কিছুই বোধহয় মানব-মানবীর বিয়েকে সে মন্ত্রমুগ্ধতা শেষাবধি দিতে পারে না যেখানে যদিদং হৃদয়ং তব। প্রকৃতপ্রস্তাবে, বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করে প্রত্যেক মানব-মানবীর হয়ত একটাই সাধারণ অভিজ্ঞতা হয়। যে, এখানে। আর সব কিছুরই প্রয়োজন আছে, শুধু একটা জিনিসের নেই। আর সেটা হল, প্রেম।
আমার বিবাহিত বন্ধুবান্ধবদের কাছে, জোড়ায় পেলে, আমি জনে জনে জানতে চেয়েছি, আচ্ছা, তোমরা কি, তোমরা কি, পরস্পরকে ভালবাস?
প্রত্যেকে মুখ-চাওয়াচায়ি করেছে। কেউ বলেনি, হ্যাঁ। প্রশ্ন তো এ নয় যে কাল ভোররাতে দুজনে মিলে খুব তুলো উড়িয়েছিস–হ্যায় না?
তাহলে বলতে পারত, তুমি একবচন এবং তৃতীয় ব্যক্তি, তোমাকে বলব কেন হে?
কিন্তু, এ তো একটা সামাজিক প্রশ্ন।
ফ্রয়েড, হ্যাভলক, এলিস, কিনস্ থেকে অধুনাতন মাস্টার্স অ্যান্ড জনসন জোড়ায় জোড়ায়। শত শত দম্পতিকে কাছে ডেকে কত না প্রশ্নোত্তর করল। যৌন প্রসঙ্গে কত কী নতুন তথ্য জানা গেল। মাস্টার্স অ্যান্ড জনসন তো পূর্বাপর অনেক ধারণাই ভেঙে দিল। কারা এদের সাহায্য করল?
না, সারা পৃথিবী থেকে চয়ন করা বিভিন্ন বয়স, ধর্ম ও জাতির পাঁচ শত ইচ্ছুক দম্পতি। কিন্তু, এই একটা ব্যাপারে, স্যাম্পল বা র্যানডম, কোনও প্রকার সার্ভেই আজও হল না। কেউ সাহস করল না করতে। যে, ওহে, ভাল কি বাস?
স্বীকার করি, এমন একটা বিষয়ে অনুসন্ধান করতে যাওয়া টুটেনখামেনের রত্নময় অন্ধকার সমাধিগৃহে প্রবেশ করার চেয়েও ঢের সাহসের কাজ। কারণ, উত্তরে যদি না পাওয়া যায়—সে হবে এপ-প্রজাতিতে দুবর্লতম হলেও বৃহত্তম জননাঙ্গধারী,সমস্তরকম আবহাওয়ায় যত্রতত্র (এমনকি বরফ-ঘর ইগলুর মধ্যে এস্কিমোরাও) সঙ্গম করতে সক্ষম মানব সমাজের পক্ষে চূড়ান্ত লজ্জার ব্যাপার। কেন না, প্রেমময় মনোগ্যামি, সে তো আজকের কথা নয়। সেই উদ্দালকের কাল থেকে চলে আসছে। মানব সভ্যতার সে টেংরি খুলে নেবে, এমন বাপের ব্যাটা কে! কেন না, প্রেম যদি সমস্ত দাম্পত্য মূল্যবোধের পিতা না হয়, তাহলে মেনে নিতে হয়, পৃথিবীর সমস্ত দাম্পত্য জারজ।
বিশেষত, যে-কোনও আত্ম-জিজ্ঞাসুনারীর পক্ষে এ-প্রেমহীনতা মেনে নেওয়া বড় লজ্জার কথা, আমি মনে করি। যে, প্রেমই যদি না থাকবে, তাহলে, যৌনতার অবসানে, মাতৃত্বের অবসানে, আমি তোমার কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত পেলামটা কী। শুধু বাথরুম-বেডরুম, এই বাড়ি আর গাড়ি, ফ্রিজ-টিভি-টেলিফোন-লকারে গয়না? শুধু প্রজন্ম রক্ষা–এ কাজ তো স্বামীর স্ত্রী-ভূমিকাবর্জিত রক্ষিতার দ্বারাও দিব্যি সম্পন্ন হত। হত না কি!
