লাটুবাবুকে দেখে মাতুল নেচে উঠলেন। এতক্ষণ চিত্রাদেবী চারপাশ আলো করে রেখেছিলেন, এখন একেবারে চাঁদের হাটবাজার। কনক কলসের কলকাকলিতে টলমল। সারেঙ্গি মিঞার ডাক পড়ল। প্রবীরবাবু বললেন, বাবা, জয় দেখছি পুরো বাইজি পাড়াটাকে উঠিয়ে এনেছে। সামলাবে কী করে! গাদা গাদা টাকার ব্যাপার!
এদের বাইজি বলে প্রবীরমামা?
হ্যাঁ গো! কত বড়লোকের বাড়িতে এখন ঘুঘু চরছে। জানো কি?
বিশাল একটা ঘরে আমরা ঢুকে পড়লুম। মাঝখানে আলো, চারপাশে অন্ধকার। শয়ে শয়ে ইলেকট্রিক তার এপাশ থেকে ওপাশে, ওপাশ থেকে এপাশে ছুটোছুটি করছে। উটমুখো হয়ে চললেই হুমড়ি খেয়ে পড়তে হবে। লাটুবাবু, মাতুল, দলবল, আলোর বৃত্তে চলে গেছেন। বেশ ভারী চেহারার এক ভদ্রলোক হাত নেড়ে নেড়ে নানা কথা বলছেন। প্রবীরবাবু বললেন, মনে হচ্ছে ইনিই জয়ের ছবির ডিরেক্টর।
একপাশে মেকআপ নিয়ে এক ভদ্রলোক, ভুল বলা হল, অভিনেতা বসে আছেন। বসে আছেন রাজার মতো। প্রবীরবাবু বললেন, চিনতে পারছ?
এ দেখি ভাল পরীক্ষায় পড়া গেছে। চিনতে পারছ? চিনতে পারছ?
জহর গাঙ্গুলী। প্রবীরবাবু হাত তুলে নমস্কার করলেন। সাংঘাতিক তারকাভক্ত মানুষ।
অন্ধকার থেকে চাপা গলায় কে যেন ডাকল, পিন্টু। খুব পরিচিত নারীকণ্ঠ। চেয়ারে বসে আছে। অন্ধকারে আবছা।
১.২২ যে হও সে হও প্রভু
বুকে ছলাত করে একটা শব্দ হল। বুকের শব্দ কানে আসে না। ধরা পড়ে ডাক্তারের বুক-দেখা যন্ত্রে। বলতে হয় তাই বললুম। উপন্যাসে পড়েছি, এইরকম পরিস্থিতিতে বুক ছলাত করে ওঠে। কনক বসে আছে আবছা অন্ধকারে গালে হাত দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে। সে এক দৃশ্য। কেন জানি না, রঘুবংশের সেই স্বয়ংবর সভার কথা মনে পড়ে গেল। কোথা থেকে একচিলতে আলো এসে কনকের আঙুলে পড়েছে। আমি মাথা ঘোরালেই আঙুলের পাথর ঝিলিক মেরে উঠেছে। এ আংটি তো কনকের আঙুলে আগে দেখিনি। নিশ্চয় প্রতাপ রায় কোনও এক রাতে সোহাগ করে পরিয়ে দিয়েছে। পরাবেই। পরাবার মুরোদ রাখে রায়মহাশয়। আমার মতো ফেকলু নয়। আবার আমার কথা আসছে কেন? আমি কনকের আঙুলে আংটি পরাতে যাব কোন আনন্দে। আমার আবার অত মাতন কীসের! পাগলা দাশু। তবে কনককে অসাধারণ দেখাচ্ছে। রঘুবংশ ছাড়া অন্য কোথাও এর তুলনা নেই,
বজ্রাংশু-গর্ভাঙ্গুলি রন্ধ্রমেকং ব্যাপারায়মাস করং কিরীটে ॥
কালিদাস লিখেছেন, কোন রাজা আবার, যথাস্থানে স্থাপিত থাকা সত্ত্বেও যেন কিঞ্চিৎ স্থানচ্যুত হইয়াছে,–এমনই ভাব দেখাইয়া স্বহস্তে মস্তকের রত্নময় কিরীটটি তুলিয়া ঠিক করিয়া বসাইতে লাগিলেন। কিরীটখচিত উজ্জ্বল হীরকখণ্ডর প্রভায় তাহার অঙ্গুলির রসমূহ পরিপূর্ণ হইল।
প্রবীরবাবু বললেন, তোমাকে ডাকছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাব্বা বলো কী! ভদ্রমহিলা কে?
আমার মেসোমশাইয়ের মেয়ে।
উঃ। তোমাদের কত কী যে আছে। আমার শালা, আমি ছাড়া আর কেউ নেই। যাও যাও, শুনে এসো।
কনকের পাশে একটা চেয়ার খালি পড়ে আছে। বসা উচিত হবে কি না ভাবছি, কনক চাপাস্বরে বললে, বোসোনা।
তুমি কি সিনেমা করতে এসেছ, কনক?
আমার একটা হাত মুঠোয় ধরে কনক বললে, আমায় ভুলে গেছ?
ভুলে যাব কেন? ভোলা কি অত সহজ। মানুষ কোনও কিছুই ভুলতে পারে না। মনের অতলে স্মৃতি হয়ে তলিয়ে থাকে। সুযোগ পেলেই ঠেলেঠুলে ওঠে।
আমার হাতে কনকের মুঠোর চাপ কখনও জোর হচ্ছে, কখনও আলগা হচ্ছে। মেয়েছেলের ভালবাসায় আমার আর বিশ্বাস নেই, ঘেন্না ধরে গেছে। এবার আমি ঈশ্বরকে ভালবাসব। একতরফা ভালবাসা। দেনাপাওনার ব্যাপার নেই। প্রীত প্রীত সত্ কোই কহত, কঠিন তাসু কি রীত। আদি অন্ত নিব নাহি, বালকি সি ভীত ॥ প্রেম, প্রেম! প্রেম তো বালির বাঁধ। আজ আছ, কাল নেই। সাচ্চা প্রেম ঈশ্বরে। আমি ঈশ্বরকেই ভালবাসব। আমার হাত খামচালে কী হবে কনক। আমি যে জেগে উঠেছি। মোহনিদ্রা ভেঙে গেছে। দুনিয়ার হালচাল এই বোকাটা বুঝে ফেলেছে।
হম যাকো চিন্তন করে মোহি মানত নহি।
সো চাহভ জন অন্যকো সো নহি মানত তাহি ॥
হমকো চিন্তত হয় অরু নারী।
ধিক্ হৈ কাম ধিকধিক নর-নারী ॥
আমি যার জন্য অধীর, তার মনে বাসা বেঁধে বসে আছে অন্য পাখি। সে পাখি আবার এ ডালে। বসে, উড়ে যায় অন্য বাগিচায়। পরস্ত্রী আর পরপুরুষ, এ ওকে, ও তাকে, বিশ্বাসঘাতকের দল। ধিক কামনা, ধিক বাসনা, নারীকে ধিক, আমাকে ধিক।
কানের কাছে মুখ এনে কনক ফিসফিস করে বলল, কী, তোমার অভিমান হয়েছে?
কী জানি, কনকের কথা বলার ধরনে কী ছিল, গলা যেন বুজে এল আবেগে। উত্তর দেবার ক্ষমতাই নেই তো উত্তর দেব কী! আশেপাশে সাংঘাতিক সাংঘাতিক সব লোক ঘোরাফেরা করছে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলব নাকি, কেন, কেন তুমি চলে গেলে? হাতের তাস অত সহজে দেখাতে নেই।
কনক বললে, বুঝেছি, তোমার অভিমান হয়েছে।
আলোর বৃত্তে দাঁড়িয়ে বেঁটেমতো কে একজন হেঁকে বললেন, সাইলেন্স, সাইলেন্স। স্টার্ট ক্যামেরা, স্টার্ট সাউন্ড।
কনকের হাতের মুঠোয় আমার শির-বেরকরা শীর্ণ আঙুল ধরাই রইল। কথা বন্ধ হয়ে গেল। আলোর বৃত্তে তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে বসেছেন সেই বিখ্যাত অভিনেতা, ছবি বিশ্বাস। এরই মধ্যে কখন গেরুয়া পরে ফেলেছেন। মেকআপে চেহারা একেবারে বদলে গেছে। ঘাড়ে নেমেছে কাঁচাপাকা চুলের বাবরি। ঠোঁটের ওপর পাকানো গোঁফ। এই জিনিসকেই ইংরেজিতে বলে, হ্যান্ডল বার মুশট্যাশ। জমিদারবাবু বসেছেন ফরাশে। সামনে বোতল আর গ্লাস। পাশেই উঁচিয়ে আছে আলবোলা। নলটা সামনে পড়ে আছে বাঘের ন্যাজের মতো। সেই বেঁটে মানুষটি ঘুড়ি ওড়াবার কায়দায় একপাশে পঁড়িয়ে, দুটো হাত নীচে থেকে ওপর দিয়ে তুলে ছেড়ে দিলেন। সংকেত জানালেন, শুরু। ঝলঝলে প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক ছবিবাবুর মুখের সামনে দুটো কাঠের টুকরো ধরলেন। কালো রং করা। খড়ি দিয়ে কী সব লেখা। চিৎকার করে বললেন, শট থ্রি, টেক ওয়ান। কাঠদুটো দুহাতে ফাঁক করে ঠাস করে ঠুকে দিয়ে, গুঁড়ি মেরে সরে এলেন।
