শুরু হল ছবিবাবুর খেলা। নিমেষে তার চেহারা পালটে গেল। চোখমুখ দেখলেই মনে হবে, কতক্ষণ যেন বসে বসে মদ্যপান করে বেশ একটু নেশাগ্রস্ত হয়েছেন। একেই বলে বড় অভিনেতা। বাস্তব থেকে কল্পজগতে যেতে পারেন চোখের পলকে। শূন্য দৃষ্টিতে এধার-ওধার তাকালেন। বোতল থেকে গেলাসে লাল জল ঢাললেন। অদ্ভুত কায়দায় সুদৃশ্য গেলাসটি ঠোঁটের ফাঁকে তুলে ধরে ছোট্ট একটি চুমুক মারলেন। হাত সামান্য কাঁপছে। এইবার গেলাসটিকে চোখের সামনে তুলে ধরে বলতে লাগলেন,
জীবন, জীবন! মহাশূন্যে নক্ষত্রের হাহাকার! উল্কা, উল্কা! জ্বলে যাও, পুড়ে যাও। নীলাদ্রিশেখর, মৃত্যুর আর কত দেরি। সবাই তো চলে গেল, একী, আমি একা! এই জলসাঘরে আমি একা! ডান দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, কোই হ্যায়? বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁকলেন, কোই হ্যায়?
মহা উল্লাসে পাশ থেকে কে একজন চিৎকার করে উঠলেন, ওকে, ওকে, স্টপ। ছবিবাবু। গেলাসটি সহজ হাতে সামনে নামিয়ে রেখে তাকিয়ায় কাত হয়ে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন। সেই বেঁটে ভদ্রলোক নাচতে নাচতে এগিয়ে এসে বলতে লাগলেন, ছবিদা, ফাটিয়ে দিয়েছেন। লা জবাব। লা জবাব।
কনকের ওপাশের চেয়ারে অন্ধকারে কে যেন এসে বসলেন। কনকের মুঠো থেকে আমার আঙুল খুলে এল। বন্ধনের এই হল ধর্ম, কখন যে খুলে পড়ে! এই আকর্ষণ, এই বিকর্ষণ। কে এসে। বসলেন, দেখার চেষ্টা করতে গিয়ে চমকে উঠলুম। প্রতাপ রায়। একেবারে সাহেবি পোশাক। চোখে ছাইছাই রঙের গগলস। ও, প্রতাপ রায় আসায় কনক আমার হাত ছেড়ে দিলে! বেশ ভাই বেশ, শাবাশ! লা জবাব। মেয়েরা বুঝি এইভাবেই ক্ষমতাশালী পুরুষের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয়। যে হও সে হও প্রভু তুমি তো সোয়ামি/যত কাল দেহ তোমার তত কাল আমি।
প্রতাপ রায় কনকের কানে কানে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। তেমন বোঝা গেল না, শুধু কানে এল, ‘জয়টা হোপলেস, জয়টা হোপলেস।নক ফিসফিস করে বললে, পিন্টু, পিন্টু।
আড়চোখে দেখছি, প্রতাপ রায় কনকের পাশ থেকে আমাকে একবার উঁকি মেরে দেখে নিলেন। সোজা হয়ে বসে বললেন, কী ভাগনে, কেমন আছ?
ভাল আছি। আপনি? (দেখতেই পাচ্ছি বেশ মজায় আছেন, তবু আমড়াগাছি।)
চলছে একরকম, বড় ঝামেলায় আছি। (তাই নাকি? রসে হাবুডুবু রসগোল্লার একটাই ঝামেলা, রসিকে খেয়ে ফেলে।)
কী ঝামেলা?
সে তুমি বুঝবে না। তোমার বোঝার বয়স হয়নি। বিষয়সম্পত্তি। মামলা মোকর্দমা। তোমার বাবা কেমন আছেন?
ভাল।
ভাল থাকলেই ভাল।
কনকের দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, জয়ের সঙ্গে আজ আমার একচোট হয়ে যাবে।
কনক বললে, শুধু শুধু মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করবেন না। আপনার সব ভাল, একটাই খারাপ। বড় তাড়াতাড়ি রেগে যান। ওটা ঠিক নয়।
কী বলছ তুমি? পুরুষমানুষের রাগই হল ভূষণ। জড়োয়ার গয়না।
সাইলেন্স, সাইলেন্স।
আবার সেই নির্দেশ ভেসে এল। আড়চোখে দেখছি, কনকের হাতের মুঠোয় এখন প্রতাপ রায়ের হীরকভূষিত আঙুল। ধ্যাততেরিকা, মেয়েছেলের নিকুচি করেছে। আমার অবশ্য রাগ বা অভিমান করার কোনও মানে হয় না। কনক আমার কে। সম্পর্কে বোন। দূর সম্পর্কের বোন। এমন কিছু প্রেমের সম্পর্ক নয়। বাতাসে নিজেই অট্টালিকা তৈরি করছি, নিজেই ভেঙে ফেলছি। ওঃ মন কী জিনিস! চেয়ার ঠেলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতে গেলুম, পেছন থেকে কে একজন মাথায় গাঁট্টা মেরে বসিয়ে দিলে। ও মনে ছিল না, সামনে ছায়াছবি তৈরি হচ্ছে। কায়াকে ছায়া করে সেলুলয়েডে চ্যাপটা করে ধরা হচ্ছে। শব্দ করা চলবে না। গাঁট্টা খেয়ে গোটাকতক কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল, চলে মুসাফির গাহি/এ জীবনে তার ব্যথা আছে শুধু, ব্যথার দোসর নাহি!/নয়ন ভরিয়া আছে আঁখিজল কেহ নাই মুছাবার,/হৃদয় ভরিয়া কথার কাকলি, কেহ নাই শুনিবার।
শট ফোর, টেক ওয়ান। খটাস করে কাঠের শব্দ।
ছবিবাবু আবার অন্যরকম হয়ে গেছেন। সেই মাতাল জমিদার। কোই হ্যায়? কে আছে? শশী, শশী। ফতুয়া পরা একটা লোক, খাটো ধুতি পরে, কাঁপতে কাঁপতে সামনে এসে দাঁড়াল, হুজুর।
কাট, কাট। পরিচালক নৃত্য করতে করতে এগিয়ে এলেন।
এই আমার সুযোগ। চেয়ার ঠেলে উঠে, প্রবীরবাবু যেখানে ছিলেন সেই দিকে এগিয়ে গেলুম। ধনী ব্যক্তিদের পাশাপাশি বেশিক্ষণ থাকা উচিত নয়। বড় উত্তাপ, বড় অস্বস্তি। আমার প্রবীরবাবুই ভাল। মাতুলও কেমন যেন অস্বস্তিকর। বেশ একটু ধনগর্ব আছে।
আবছা অন্ধকারে প্রবীরবাবুকে প্রথমে খুঁজে পাচ্ছিলুম না। বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। মাতুল দলবল সহ কোথায় যে অদৃশ্য হয়েছেন। কার ভেতর ঢুকে বসে আছেন, কে জানে? প্রবীরবাবুই ফিসফিস করে ডেকে জানান দিলেন। ছোট একটা প্যাকিং বাক্সের ওপর চুপ করে বসে আছেন।
এত নিচু, মাটির প্রায় কাছাকাছি, তাই চোখে পড়েননি।
প্রবীরবাবু বললেন, চলো, বাইরে যাবে?
হ্যাঁ হ্যাঁ চলুন, এখানে হাপিয়ে উঠেছি।
দু’জনে সেই কল্পজগৎ থেকে বাইরের জগতে মুক্তি পেয়ে যেন প্রাণে বাঁচলুম। রোদের আলোয় চোখ ঝাঁঝিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলুম, মামা কোথায় বলুন তো?
প্রবীরবাবু বললেন, অদ্ভুত ছেলে, আমাদের ফেলে কোথায় যে চলে গেল। ভীষণ জলতেষ্টা পেয়েছে। চলো না, বাইরে গিয়ে দেখি, কোনও দোকানটোকান পাওয়া যায় নাকি!
উনি যদি হঠাৎ আবার খোঁজ করেন?
