গাছের আড়াল থেকে বেশ লম্বা চওড়া এক মহিলা ডাকলেন। রাখালবাবু বললেন, যাই অনুভা। প্রবীরবাবু খপ করে আমার একটা হাত চেপে ধরে বললেন, দেখেছ, অনুভা, আরে ব্বাপ। আজ রাতে আর ঘুমোতে পারব না। অনুভা আমার এত কাছে! ফ্যানটাস্টিক!
ঘুমের ঘোরে মানুষ যেভাবে হেঁটে যায়, চিত্রাদেবী রাখালবাবুর পথে সেইভাবে দু’কদম হেঁটে গেলেন। দাদু খপ করে হাত চেপে ধরে বললেন, অ্যায়, যাচ্ছিস কোথা! একে একেবারে হিপনোটাইজ করে ফেলেছে। ওরে, তুই গান গাইতে এসেছিস, নায়িকা হতে আসিসনি৷
মাতুলের মুখ বেশ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। দুপাশে দু’সার গাছের মধ্যে তিনি এগোতে লাগলেন। দলবল চলল পেছন পেছন। সারেঙ্গি মিঞা বাতাসে মাথা কুটে কুটে চলেছেন, কী হয়, কী হয়! চিত্রাদেবী এখন মাতুলের পাশাপাশি হাঁটছেন। প্রবীরবাবু আমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটছেন। ধীরে ধীরে আমাদের দুজনের বেশ একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়ে উঠছে। মানুষটি বেশ সহজ সরল। আমার কানে কানে আবার ফিসফিস করে বললেন, নায়িকা কীভাবে তৈরি হয় জানো?
আজ্ঞে না।
আমাকে এত আজ্ঞে আজ্ঞে কোরো না। ও তোমার না জানাই ভাল।
কেন?
সে অনেক ব্যাপার। অনেক ঝামেলা সহ্য করতে হয়। সেসব কথা তোমাকে আমি বলতে পারব না। তাকিয়ে দেখো, জয় আর চিত্রাকে কেমন মানিয়েছে! ওদের দু’জনকে নায়কনায়িকা করে দিলে হয়।
হ্যাঁ।
তোমার মামা বিয়ে করেছে?
হ্যাঁ।
কাকে?
মামিমাকে।
উঃ, তোমার মাথায় কি গোবর ভরা আছে! মামার বউ তো মামি হবেই। মামির নাম কী?
সীমা।
জয়া নয়, ঠিক জানো?
উনি তো সীমাই বলেন।
ইস! কাজটা খুব খারাপ করেছে।
কেন?
সে তুমি বুঝবে না। আমার খুব খারাপ লাগছে। কেমন যেন কান্নাকান্না পাচ্ছে।
কেন?
সে তুমি বুঝবে না। একজনের জন্যে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি। কী বলল তো?
এমন কিছু, যা দেখলে মানুষের কান্না পায়।
ঠিক বলেছ। আমি একটা নদী দেখতে পাচ্ছি। মনে করো ঘাটশিলার সুবর্ণরেখা। সেই নদীর ধারে চাঁদিনি রাতে, একটা কালো পাথরের ওপর পাশাপাশি বসে আছে একটি ছেলে আর মেয়ে।
সামনে ধোঁয়াধোঁয়া আকাশ। মেয়েটি ছেলেটির কাঁধে মাখা রেখেছে।
ছেলেটি হঠাৎ উঠে চলে গেল। মেয়েটি এখন একা বসে আছে। দূরে কোথায় কোকিল ডাকছে বিধবার কান্নার মতো।
স্টার্ট সাউন্ড। স্টার্ট সাউন্ড। টেক ওয়ান।
আমরা দুজনেই চমকে উঠেছি। একটা বিশাল গাড়ির ভেতর থেকে শব্দটা ভেসে এল। একগাদা যন্ত্রপাতির সামনে কানে হেডফোন লাগিয়ে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। মাতুল চিত্রাদেবীকে হাতপা নেড়ে কী যেন বলছেন। সব কথা শোনা যাচ্ছে না। কেবল তুমি তুমি শুনছি। দু’জনেই বেশ উত্তেজিত।
প্রবীরবাবু বললেন, মনে হচ্ছে, জয় খুব রেগে গেছে। স্বাভাবিক। নায়িকা হবার জন্যে একেবারে খেপে উঠেছে। তুমি এলে জয়ের সঙ্গে, চললে রাখালবাবুর সঙ্গে। কোনও মানে হয়!
আমরা একটু পিছিয়ে পড়েছি। বুঝতে পারছি না গুরু শিষ্যায় কী হচ্ছে। তবে গুরুতর একটা কিছু হচ্ছে। চিত্রাদেবী হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মাতুল এগিয়ে চললেন হনহন করে। পেছনে ফিরেও তাকালেন না। আমরা চিত্রাদেবীর প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছি। জিজ্ঞেস করতে যাব, হল কী?
হঠাৎ তিনি সামনে দু’হাত বাড়িয়ে হেরে রে রে করে মাতুলের দিকে ছুটে চললেন। সেই নদের নিমাইয়ে দেখেছিলুম, শচীদেবী এইভাবে ছুটছিলেন নিমাই নিমাই করে।
প্রবীরবাবু বললেন, যাঃ শালা, সিনেমা দেখছি এইখানেই শুরু হয়ে গেল। মেয়েছেলের কারবার!
এই অবসরে আমরা খুব কাছাকাছি এসে গেছি। মাতুল বললেন, যাও না যাও, আমার কাছে কেন? নায়িকা হও গে যাও।
দাদু সঙ্গে দোহার দিয়ে চলেছেন, সমানে এক সুরে, আত্মসংযম চাই, ভেসে যাবে, ভেসে যাবে।
সারেঙ্গি মিঞা মাথা নাড়ছেন আর বলছেন, শোভানাল্লা, শোভানাল্লা।
ব্যাপারটা কতদূর গড়াত কে জানে! চিত্রাদেবীকে বাঁচিয়ে দিলেন লাটু ওস্তাদ। দামুবাবু ঘোষণা করলেন, ওস্তাদ এসে গেছে উইথ ফুল টিম।
প্রকৃতই ওস্তাদের মতো ওস্তাদ। কাপড় পরেছেন ঠিক লাটুবাবুর মতে, মালকোঁচা মেরে, দু’পাশে পেখম উড়ছে। প্রবীরবাবুর সবেতেই একটা কিছু বলা চাই। নিজের মনেই বলছেন, বাবা, কী ভঁসা, ডাসা চেহারার নাচনেওয়ালি।
সত্যিই তাই, নাচিয়ে মেয়েদের চলার ধরনই আলাদা। ডান হাত শরীরের ডান পাশে ছেতরে আছে। নড়ছে যেন নৌকোর বইঠা বাওয়া হচ্ছে। আর কোমর থেকে শরীরের নিম্নাঙ্গে এমন কায়দায় দুলছে, তওবা তওবা। সে কী ছন্দ! যাব কি যাব না। লটাকে চলানা। মুকুতা ঝুলানা। এতদিনে বুঝলুম, মা দেখেছি, মাইমা দেখেছি, মাসিমা দেখেছি, দিদি দেখেছি, রমণী দেখিনি। আজ দেখলুম। রমণীয় রম্যতাং। মাতামহ একদিন সন্ধ্যাকালে নারকেল গাছের তলায় উবু হয়ে বসে বলেছিলেন, পাস্তুরানি, যখনই দেখবে মন বড় চঞ্চল হয়েছে, রিরংসার ইচ্ছে হচ্ছে, তখনই ভর্তৃহরির বৈরাগ্যশতকের সেই শ্লোকটি আবৃত্তি করবে,
স্তনৌ মাংসগ্রন্থী কনককলসাবিত্যুপমিতৌ
মুখং শ্লেষমাগারং তদপি চ শশাঙ্কেন তুলিতং।
স্রবনূত্রক্লিন্নং করিবরকরস্পর্ধি জঘনং
মুহুনিন্দং রূপং কবিবরবিশেষৈগুরুকৃতম্।
ফ্যালফেলে দৃষ্টিতে তাকাচ্ছি, আর আবৃত্তি করছি। করলে কী হবে! খোস একবার চুলকে উঠলে আর রক্ষে আছে। স্থানকালের বিচার থাকে না। খামোর খামোর চুলকোতে থাকে। তিন বাতসে লট হেয়, দাড়ি চামড়ি, পেট। একেই আমি সহজে কেতরে পড়ি, চোখের সামনে এই ডুবে যৌবনের র্যালায় মনের মাচা মচমচ করছে। অক্ষয় কাকাবাবু বলেছিলেন, এ ছেলে আপনার নাচিয়ে হতে পারত! মা আমি নাচিয়ে হব। কলসি গেল ছলকে ছলকে। ভোলে বোম্বা উঠল দুলে।
