হাঁক মারলেন। পাহাড়ী সান্যাল চমকে উঠলেন।
দামুবাবু লক্ষ করে বললেন, পাহাড়ীদা, একটু জোরে হয়ে গেছে দাদা, মার্জনা করবেন।
পাহাড়ীদা গ্রাহ্যই করলেন না। আর একটা গাড়ি ঢুকল। দু-চারজন হইহই করে এগিয়ে গেলেন। লম্বা চওড়া, ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ সামনের আসন থেকে নেমে এলেন। দু-চারজন কাটা কলাগাছের মতো তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লেন। প্রবীরদা চাপা গলায় বললেন, দেখে রাখো, ইনি হলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নট, ছবি বিশ্বাস। দেখেছ এঁর অভিনয়?
মনে পড়ছে না।
অ্যাঃ তোমার জীবনটাই অসম্পূর্ণ। ছায়াছবির কিছুই জানো না।
পুকুরপাড়ে আর একজন অভিনেত্রী এসে পঁড়িয়েছেন। সাজগোজ দেখলে মনে হবে এইমাত্র বাসর ছেড়ে উঠে এসেছেন। কী সব চেহারা! প্রবীরবাবু চাপা গলায় বললেন, কী দেখছ?
অনুভদেবী। অভিনয় দেখলে তিন রাত্তির ঘুমোতে পারবে না।
মাতুল এতক্ষণ গাছতলায় দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছিলেন, সেইখান থেকেই হেঁকে বললেন, তোমরা চলে এসো।
নীল জামা পরা এক ভদ্রলোককে মাতুল বেশ রাগরাগ গলায় বলছেন, যতক্ষণ না আমি স্লিপে সই করে দিচ্ছি ততক্ষণ কাউকে এক কাপ চা-ও দেবেন না। ক্যান ইউ ইমাজিন, একজন সারাদিনে চল্লিশটা হাফবয়েল ডিম খেয়েছে!
আজ্ঞে, হাফবয়েল নয়, অমলেট।
ওই হল।
আজ্ঞে বৃহত্যজ্ঞে ওরকম তো হবেই। ফিল্ম লাইনে আপনি নতুন, তাই অবাক হচ্ছেন, এ লাইনে সবকিছু ওড়ে, পাখির মতো ওড়ে, টাকা ওড়ে, যৌবন ওড়ে, ডিম ওড়ে, চপ ওড়ে, লাল জল ওড়ে। এর নাম স্যার ছায়াবাজি, ভোজবাজি। কত কন্ট্রোল করবেন! এ কি র্যাশনের চাল।
আমার টাকা তো ছেলের হাতের মোয়া নয় যে, সবাই খেয়ে যাবে ভোগা দিয়ে।
আজ্ঞে তা নয়, তবে দুশো এক টাকা আপনি এখন আমাকে দেবেন, কালকের পাওনা।
মাতুল হাঁকলেন, দামু।
ইয়েস গুরুজি।
টাকা উড়ছে।
সে তো কথাতেই আছে, কলকাতায় টাকা ওড়ে, ধরতে পারলেই হয়। মাড়োয়ারিরা ধরছে।
তা হলে ধরে এনে, ক্যান্টিন ম্যানেজারকে দাও। দুশো এক টাকা।
দামুবাবু একগাল হেসে বললেন, আপনি ওড়ান, আমি ধরি।
পকেট থেকে গোটাকতক একশো টাকার নোট বের করে দামুবাবুর হাতে দিলেন। দিয়ে বললেন, কাজের নামে অষ্টরম্ভা, রোজ দুশো টাকার খানা উড়ছে। চলে এসো।
শেষ নির্দেশ আমাদের জন্যে। আমরা গুটিগুটি এগিয়ে চললুম। প্যান্টশার্ট পরা খড়খড়ে এক ভদ্রলোক পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ থেমে পড়লেন। তীক্ষ্ণ নজরে চিত্রাদেবীকে দেখলেন। ভদ্রলোকের গলায় সুতোয় বাঁধা কী একটা গোলমতো ঝুলছে। রেফারির গলার বাঁশির মতো। হঠাৎ থেমে পড়ে মাতুলকে ডাকলেন, জয়!
মাতুল ফিরে তাকালেন। মনে হয় এ জগতের বেশ সম্মানিত মানুষ। তা না হলে এত সম্ভ্রমে মাতুল উত্তর দিতেন না, বলুন রাখালদা!
তোমার আর্টিস্ট?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
সাইড রোল, না হিরোইন।
আজ্ঞে না, মিউজিক্যাল।
ভেরি ফোটোজেনিক ফেস। আমি একটা চান্স দিতে পারি। একেবারে লিডিং রোলে। আমি হিরোইন খুঁজছি।
আপনি তো ফ্লোরে নেমে গেছেন। কাস্টিং তো ঠিক হয়ে গেছে।
না, আমার নেকস্ট বইটার জন্যে। আগুনের ফুলকি। বাজারে আমি নতুন একটা জুটি ছাড়তে চাই। স্ক্রিপ্টটা বড় ভাল হে।
মিউজিক কে করছে?
ঠিক করিনি। তুমি করবে?
প্রবীরবাবু দুম করে বললেন, গান আমি লিখব।
রাখালবাবু বললেন, কেন?
প্রবীরবাবু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, জয়ের বইয়ে আমি লিখছি তো!
আগুনের ফুলকি রোমান্টিক বই, বিরহের গান আপনি লিখতে পারবেন?
খুব পারব, আমি নিজে একজন ব্যর্থপ্রেমিক। আমার হিষ্ট্রি জয় জানে।
হিষ্ট্রি জিয়োগ্রাফির প্রয়োজন নেই, পরে দেখা করবেন।
রাখালবাবু সরাসরি চিত্রাদেবীকে জিজ্ঞেস করলেন, কী, অভিনয় করবেন?
চিত্রাদেবী হৃভঙ্গি করে বললেন, পারব? না বাবা, লজ্জা করে।
দাদু বললেন, অভিনয় করবে? কী বলছেন আপনি? ভদ্রঘরের মেয়ে অভিনয় করবে কী? নায়করা মদ খেয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরবে, আপনি লাইনের মেয়ে খোঁজ করুন।
আপনি বুঝি খুব কনজারভেটিভ! ফিল্ম লাইনে কত ভদ্রঘরের লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়ে। এসেছে জানেন?
জেনে কাজ নেই, জেনে কাজ নেই। দাদু সুর করে টেনে টেনে বললেন। আমাদের ভোলার মেয়ে আজ পাঁচ বছর হল নিরুদ্দেশ। নায়িকা হবে বলে গয়নাগাটি নিয়ে বোম্বে পালিয়েছিল। ব্যস, একেবারে বেপাত্তা। ভোলার বউ রোজ রাতে মেয়েকে স্বপ্নে দেখে, কেঁদে কেঁদে বলছে, মা, মাগো, ওরা আমাকে সেলুলয়েডে ধরে রেখেছে, এই দেখো আমার ছায়া পড়ছে, কায়া নেই।
গাছতলায় দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। চিত্রাদেবীর কান ঘেঁষে, কাধ বেয়ে একঝলক পক্ষীকৃত্য নেমে গেল। তিনি ধেইধেই করে নেচে বললেন, অ্যাম্মা, যতেঁরিকা, ভাল্লাগে না বাবা, কী হবে!
একসঙ্গে দু’জনে বললেন, যদি অনুমতি করেন!
দু’জনের একজন প্রবীরবাবু, অন্যজন দামুবাবু। যদি অনুমতি করেন!
দাদু বললেন, না, অনুমতি করবে না, আমি আছি কী করতে! অ্যায় এদিকে মাথা নিচু কর।
রাখালবাবু বললেন, খুব শুভ লক্ষণ। তুমি অভিনয়ে এলে, অনেক দুরে যাবে। টপ, টু দি টপ। তাড়া নেই। ভেবেচিন্তে জবাব দিয়ো। তোমার এই এক্সপ্রেশন এত ন্যাচারাল! দেখো, যদি বেরিয়ে আসতে পারো! কনজারভেটিভ ফ্যামিলি এইভাবে কত ট্যালেন্ট যে নষ্ট করছে। আই পিটি দেম, আই পিটি।
রাখালদা!
