টালিগঞ্জের স্টুডিয়োতে গাড়ি ঢুকল। আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম। চিত্রাদেবীর চাপে নিম্নাঙ্গে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে পা দুটো ঝিনঝিন করছে! নারীশরীর কোমল হলেও তার একটা চাপ আছে। ভার আছে। অবশ্যই মধুর এবং সুখকর। এত দীর্ঘ সময় সুন্দরী কোনও মহিলার গাত্ৰলগ্ন হয়ে বসে থাকার অভিজ্ঞতা, এই আমার প্রথম। মন বিড়বিড় করে তখন থেকেই বলছে, সাহস করে বাড়ির বাইরে বেরোতে পেরেছিস, তাই না তোর এই অভিজ্ঞতা। আর্টের জগতে কত রোমান্স আছে দেখেছিস? গার্ডল অফ ভেনাসের খেলা।
একে একে আমরা খালাস পেলুম। চিত্রাদেবী নেমেই টলবল বলবল হয়ে গেলেন। পায়ে ঝিনঝিনি ধরেছে। দাদু বলতে থাকলেন, অমন করে নাচিসনি, আমার ছড়িতে ভর দিয়ে দাঁড়া। বেশি নাচানাচি করলে গলার মুড়কি খারাপ হয়ে যাবে।
মুড়কি আবার কী বস্তু, কে জানে বাবা! ফুটকড়াই মুড়কি দোলের দিন খাওয়া হয়। গলার আবার মুড়কি কী! গানের লাইনে কত কী যে আছে! আমি আর প্রবীরবাবু মহাভারতের চরিত্রের মতো মুগুর হাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি।
বিশাল চেহারার এক ভদ্রলোক, জয়দা জয়দা বলতে বলতে এগিয়ে এলেন। পাঞ্জাবির খোলা বুকে বিশাল এক পদক ঝুলছে। ইনি যদি অভিনয়ের জগতের কেউ হন, তা হলে এঁর একমাত্র উপযুক্ত ভূমিকা হওয়া উচিত আবগারি দারোগার।
জয়দা জয়দা করছেন বটে, চোখদুটো খেলছে চিত্রাদেবীর শরীরে। মানুষের এই একটা বড় বদ অভ্যাস, মহিলারা যেন ময়রার দোকানের লাল ল্যাংচা। খাব খাব দৃষ্টিতে ওভাবে তাকানোটা কি ঠিক হচ্ছে! লোকে যে লোভী বলবে! দৃষ্টির ছ্যাকায় মহিলাদের অস্বস্তি হয় না!
প্রবীরবাবুও চোরা চাহুনি মারছেন, তবে বেশ কায়দা করে রেখেঢেকে। চারপাশে সবুজ গাছপালা, রোদ ঝলমল করছে, কড়া ছায়া লুটোপুটি করছে, তার মাঝে বেগুনি পোশাকে সুন্দরী এক মহিলা, পাশেই রুপোলি চুলের এক বৃদ্ধ, যৌবনের ব্যঙ্গ, পাঞ্জাবি পরা দারুশিল্প, সারেঙ্গি বাদক। একটা দার্শনিক দল।
লোলুপ দৈত্যকে কেন জানি না আমার কেবলই বলতে ইচ্ছে করছিল, মা যেমন শিশুকে বলে, ওই দেখ পাখি! শিশু পাখি উচ্চারণ করতে পারে না, বলে পাপী। আদো আদো বুলি, এত্তা পাপী।
ভাবতে ভাবতে মুখ ফসকে ওই শব্দটিই বেরিয়ে পড়ল। এত্তা পাপী।
প্রবীরবাবু বললেন, কী বলছ? কিছু বললে?
একটা পাখি।
হ্যাঁ, এখানে অনেক পাখি। গাছপালা বেশি তো! গাছ থাকলেই বেশি পাখি আসবে।
দৈত্য চিত্রাদেবীর সামনে গিয়ে সালাম আলেকুমের ভঙ্গিতে বললেন, চলুন ম্যাডাম। আমাদের অফিসে চলুন।
দাদু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, হু আর ইউ। অফিসে যাবে কেন?
দৈত্য একটু ঘাবড়ে গেলেন। বেশ হয়েছে ব্যাটা। মহিলা দেখলেই হল! যেন নাকের চুল! সুড়সুড় করলেই ফাঁচাত হাঁচি।
মাতুল খুব কড়া সুরে বললেন, দামু, তোমার কাজ কী?
কেন দাদা! ম্যানেজমেন্ট আর প্রোকিউরমেন্ট।
গাড়ির পেছনে যেসব মালপত্তর আছে, সাবধানে নামিয়ে নিয়ে যাও। তোমার অন্য আর কোনও কাজ নেই। ওদের হাত থেকে মুগুর দুটো নিয়ে যাও।
কোথায় সুন্দরী, আর কোথায় দুটো কেঠো মুগুর! আমাদের হাতের মুগুর দৈত্যের হাতে যেন ছাত পেটার দুটো কাঠ। সটাক সাক করে দু’বার ভেঁজে নিয়ে বললেন, কোনও ওয়েট নেই। মুগুর দুটো পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে জিভের তলায় দুটো আঙুল পুরে, সিক করে একটা সিটি বাজালেন।
বোঝাই গেছে, পুরনো কলকাতার পায়রা-ওড়ানো বাবুদের শেষ বংশধর। মাতুলের স্কন্ধে ভর করেছেন। মাতামহ যদি একবার জানতে পারেন পুত্র সিনেমা করতে এসে এই সঙ্গে মিশছেন, তারা তারা বলে, দুনয়নে পড়বে ধারা। আর মাতুলানী যদি জানতে পারেন, ডানাকাটা পরিরা গুরুজি গুরুজি বলে চারপাশে লাট খেয়ে বেড়াচ্ছেন, রেগে হাফবয়েল হয়ে বসে থাকবেন।
সিটি শুনে, দূরের একটা ঘর থেকে খাকি হাফপ্যান্ট আর সাদা জামা পরা লোক, যাই ওস্তাদ, বলে এগিয়ে আসতে থাকলেন। পা দুটো ধনুকের মতো। বড় বড় লোম। কামিয়ে কম্বল করা চলে। মাতুল সিনেমা করছেন, না সার্কাস করছেন? মাতুলই জানেন।
দৈত্য দামুবাবু হাত চোখ মুখের বিচিত্র ভঙ্গি করে বললেন, ওস্তাদ এ দুটোকে লিয়ে যাও। তুরন্ত লে যাও, তুরন্ত লৌটকে আ যাও শাগরেদ।
ওস্তাদের ওস্তাদ মুগুর দুটো দুকাঁধে ফেলে শিম্পাঞ্জির মতো এগিয়ে চললেন। প্রবীরবাবু চাপা গলায় বললেন, দেখেছ?
কী বলুন তো?
ওই যে পুকুরপাড়ে, শানবাঁধানো ঘাটে কারা বসে আছেন?
গেরুয়া রঙের কাপড় আর পাঞ্জাবি পরে সুঠাম চেহারার দু’জন ভদ্রলোক বসে আছেন। সুন্দরী এক মহিলা এলোচুলে হাত পা নেড়ে কী যেন বলছেন। গাজন তো হয়ে গেছে, বাবা তারকনাথের এইসব সন্ন্যাসীরা কোথা থেকে এলেন, কে জানে? প্রবীরবাবু হয়তো জানেন।
ওঁরা কি সন্ন্যাসী?
তোমার মাথা।
তা হলে?
ওঁরা হলেন এক নম্বর ফিল্ম স্টার। দেখে চক্ষু সার্থক করো। ডান দিকে অহীন্দ্র চৌধুরী, পাশে পাহাড়ী সান্যাল। হাঁটুর ওপর একটা পা তুলে কেমন বসে আছেন দেখেছ?
আর ওই এলোকেশী?
আরে বাপ রে, ওঁকে চেনো না? কী চেনো হে ছোকরা! উনি হলেন তোমার গিয়ে, তোমার গিয়ে, আহা, নামটা মনে আসছে না, পরে বলছি। তুমি দেখে রাখো, ও হ্যাঁ সুনন্দা দেবী।
ওঁরা সব গেরুয়া পরেছেন কেন?
মনে হয় আনন্দমঠ হচ্ছে।
দামুবাবু গাড়ির পেছন থেকে মালপত্র বের করছিলেন, শুনতে পেয়েছেন আমাদের কথা। বললেন, আরে না মশাই, সিনেমায় গেরুয়া সাদা হয়ে যায়। এ লাইনে গেরুয়া বলে কিছু নেই, অল হোয়াইট। ক্যামেরার ব্যাপার মশাই। ওস্তাদ।
