প্রবীরবাবুর উৎসাহ ফিরে এল। আমি অলরেডি তোমার আহির ভৈঁরোতে বাণী বসিয়ে ফেলেছি জয়।
তাই নাকি? চিত্রাকে দেখাও।
প্রবীরবাবু আমার বুক ফুঁড়ে এপাশ থেকে ওপাশে হাত বাড়িয়ে সেই নোট বইটা মহিলাকে দিলেন।
মাতুল বললেন, চিত্রা, প্রথম লাইনটা সুরে ভেড়াও তো।
প্রবীরবাবু তাকিয়ে আছেন যেন গাছ থেকে পাকা ফল পড়বে। নীচের ঠোঁটটা ঝুলে পড়েছে। চিত্রাদেবী সহসা শুরু করলেন, এ জীবনে আর কোনও প্রয়োজন নাই। শাবাশ, একেবারে সাধা গলা। মিছরির দানার মতো খেলছে। বরফে জমানো মধুর মতো মিঠে গলা। ঝাউয়ের পাতায় বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো শনশনে।
এঁর নাকি গান গাইতে ভয় করছিল।
মাতুল বললেন, আমি আর একটু চড়া পরদা থেকে ধরতে চাই। চড়ায় করুণ রস জমে ভাল। মাতুল ধরলেন,
এ জীবনে আর কোনও প্রয়োজন নাই
ব্যাকুল বাতাস হৃদয়ে আমার
মরিয়া মরিয়া কাঁদে।
চিত্রাদেবী আমার হাতে প্রচণ্ড একটা চিমটি কেটে, একটা চোখ ছোট করে, বললেন, আহা, এইরকম যেদিন গাইতে পারব, আমি সেইদিন হব শান্ত। বলেই, মাতুলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে দিলেন।
মাতুলের চোখ ছিল রাস্তার দিকে। ব্যাকুল বাতাসে মীড়ের কাজ করতে গিয়ে হইহই করে উঠলেন, বাঁয়ে বাঁয়ে।
চালক আবার দু’হাতে স্টিয়ারিং ধরে বাঁয়ে হেলে পড়ল। ভাগ্য ভাল কোনও দুর্ঘটনা হল না। গাড়ি গোঁত করে এক রাস্তা ছেড়ে আর এক রাস্তায় ঢুকে পড়ল। চিত্রাদেবীর দাদুর মাথা ঠুকে গেল। সোজা হয়ে বসতে বসতে বললেন, রোলসে এই ঝাঁকুনিটা একদম লাগে না। এমন কায়দায় তৈরি, যেন হাওয়ায় ভেসে চলেছি।
রোককে।
গাড়ি থামাতে হলে বাঙালিরা হিন্দি বলবেনই। বাংলায় গাড়ি থামিয়ে তেমন সুখ হয় না। হিন্দির মতো ব্রেক নেই। গাড়ি থেমে পড়ল। মাতুল নামতে নামতে বললেন, আপনারা একটু বসুন। আরও কয়েকজন হ্যান্ডস উঠবে। অন্ধকার-অন্ধকার একটা গলিতে ঢুকে পড়লেন।
মাতুল চলে যেতেই প্রবীরবাবু বললেন, তুমি আমার জায়গাটায় একটু সরে বসবে। আমি তা হলে ওঁর সঙ্গে আলোচনা করে বাণীটানিগুলো একটু ঠিকঠাক করে নিতে পারি।
উত্তর দিলেন দাদু, ন্যাঅ্যা। যে যেখানে আছ, সেইখানেই থাকো। নাতনি আমার বড় হয়েছে। লাইনটা তেমন ভাল নয়। চোখেচোখে রাখার হুকুম নিয়ে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়েছি।
চিত্রাদেবী খিলখিল করে হেসে উঠলেন, তোমরা সব পাগল। তুমি পাগল, মা পাগল, বাবা পাগল।
তুই-ই আমাদের পাগল করে ছেড়েছিস। জানিস না, শিল্পীদের একটু লুজ ক্যারেক্টার হয়।
প্রবীরবাবু করুণ মুখে, উদাস দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বেশ হয়েছে। যেমন কর্ম তেমন ফল, মশা মারতে গালে চড়। মাতুল আসছেন। সঙ্গে কুঁজোমতো এক ভদ্রলোক। চলার ধরনটা বকের মতো। প্রতি পদক্ষেপে মাথাটা সামনে এগিয়ে গিয়ে বাতাসে হোঁচট খেয়ে ফিরে আসছে। ছন্দটা অনেকটা এইরকম, কত ধানে কত চাল, কত ধানে কত চাল। সাজপোশাক দেখলেই মনে হয় মুসলমান। মাথায় লেস-তোলা সাদা টুপি, চোগা, গাঢ় রঙের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবিতেও লেসের কাজ। পায়ে নাগরা জুতো। সঙ্গে আসছে একজন কিশোর। তার হাতে একটা বাদ্যযন্ত্র। মনে হয় সারেঙ্গি।
মাতুল আর ক’জনকে তুলবেন! এটা তো রবারের গাড়ি নয়, যে চারপাশ ফুলে উঠে সকলকে জায়গা করে দেবে। মানদার মুখে পান জর্দার খিলির মতো। যখনই দেখো ডান গালটা ফুলে আছে।
মাতুল গাড়ির ভেতরটা একবার দেখে নিলেন। কীভাবে বসাবেন ভাবছেন। ঠিক হল, ছেলেটি চলে আসবে পেছনে পেছনে এখনও একটু জায়গা আছে। ওস্তাদজি বসবেন সামনে। তাই হল। চিত্রাদেবী আমার দিকে আরও কিছুটা সরে এলেন। আমি প্রবীরবাবুকে দরজার দিকে আরও কিছুটা চেপে দিলুম। দাদু বললেন, তোমাদের কোলের ওই দুটোকে গাড়ির পেছনে রেখে দাও না। আরাম করে বসতে পারবে।
গাড়িতে উঠতে উঠতে মাতুল বললেন, পেছনে,ন স্থানং তিল ধারণং। যেমন আছে, বেশ আছে, আর তো মাত্র একজন উঠবে।
দাদু বললেন, অ্যাঁ বলো কী। এখনও আর একজন উঠবে। কিন্ডারগার্টেন স্কুলের গাড়ির মতো অবস্থা হয়ে যাবে যে রে বাবা।
তা একটু হবে। কী আর করা যাবে বলুন।
ওস্তাদজি জানলার ধারে বসেছেন। সাজপোশাকে যত বাহার, চেহারায় তত বাহার নেই। দারুশিল্পের মতো আকৃতি। পকেট থেকে একটা রুপোর কাঠি বের করে সঁাত খোঁচাচ্ছেন, আর বাঁ দিকে মুখ ঘুরিয়ে ফুতুস ফুস করে জানলার বাইরে ভুক্তাবশেষ ছুড়ছেন।
যতবারই তিনি ফুতুস করেন ততবারই আমাদের দাদু আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে হাত তুলে ডায়ে হেলে পড়ে বলেন, মুশকিল করলে রে বাপু।
সামনে ফুতুস, পেছনে মুশকিল করলে রে বাপু। পর্যায়ক্রমে এই চলতে লাগল আর গাড়ি এগোতে লাগল টালিগঞ্জ স্টুডিয়োপাড়ার দিকে।
চিত্রাদেবী আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, বাপস।
কী বাপস? ছেলেটা মাথায় হেকিমি তেল মেখেছে। কী বিশ্রী গন্ধ।
আমার চোখের সামনে যেন পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। চাঁদের কপালে চাঁদ। চাঁদের নাকে হাকিমি তেলের গন্ধ। আমার নাকে গুলবাগিচার খুশবু।
চিত্রাদেবী ভেলভেটের হাতব্যাগ থেকে একটা রুপোর আয়না বের করে মুখ দেখতে লাগলেন। গরম, ধুলো উড়ছে। পাশাপাশি ঠাসাঠাসি বসা। গালের গুলাল গলে গলে পড়ছে। মহিলারা সুন্দরী হলে বড় জ্বালা। সামাল সামাল রব ওঠে। তরী করে টলমল পাশরাতে ওঠে জল। মাতুল হইহই করে উঠলেন, ডাঁয়ে, ডাঁয়ে।
১.২১ তিন বাতসে লট্পাট হেয়
মাতুলের গাড়ির অবস্থা গ্রামের ট্যাক্সির মতো। এমন ঠাসা ঠেসেছেন সেই জজসাহেবেও হেরে যাবেন। গ্রামের ট্যাক্সি ড্রাইভারকে চৌকিদার ধরে এনেছে কোর্টে। গাড়িতে বাইশ জন লোক পুরেছিল হুজুর। ড্রাইভার অমায়িক হেসে বলেছিল, ওই তো আমার ধড়ে গাড়ি কোর্টের বটতলায় পড়ে আছে, আপনি হুজুর বাইশ জন লোক পুরে দেখিয়ে দিন, কেমন করে তা সম্ভব!
