একটাকে তার কোলে তুলে দিলুম। যমজ নিয়ে বড় বিব্রত হয়ে পড়েছিলুম। নিন, মোহ-মুদগর কোলে নিয়ে অশান্ত হৃদয়কে শান্ত করুন।
রূপসি আমার পাশে ঘট স্থাপনে উদ্যোগী হয়ে ধনুক-ভাঙা ভুরুতে আড়ে আড়ে দেখতে লাগলেন। মাতুল বললেন, আমার ভাগনে, তুমি আরাম করে বসতে পারো। ওর পাশে আমার বন্ধু প্রবীরকুমার, গীতিকার, নাট্যকার, চিত্রকার।
সাহস পেয়ে তিনি এত আরামে বসলেন, পুচুত করে ক্ষীণ একটি আর্তনাদ কানে এল। বাঁপাশে জামার পকেটটা গেল। সিকি-আধুলির ভারে অভ্যস্ত পকেট, এমত রূপসির দেহভারের ভগ্নাংশ বহনের ক্ষমতা রাখবে কী করে। দু’বছরের পুরনো জামা। জায়গায় জায়গায় পিজে এসেছে।
রূপসি একটু আর্তনাদ করে উঠলেন। আমার জন্যে নয়। আসনের স্প্রিং খোঁচা মেরেছে। সাবধান করার সুযোগ পেলুম কই। সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ দেহভার ছেড়ে দিলেন। গাছ থেকে তাল পড়ে, গাইয়ে তালে ঝাঁপিয়ে পড়েন, জামার আধখানা নিয়ে রূপসি পড়েন বরাতে। দিন কয়েক আগে কনক ঘাড়ে পড়েছিল। কনকের কথা আর চিন্তায় আনব না। সেই মহীয়সী ভাল বন্দরে জাহাজ ভেড়াতে চলেছেন। অক্ষয়বাবু ঠিকই বলেছিলেন, হরিদা, এর রাশিফল বলছে, সারাজীবন শুধু চোট খেয়ে যাবে, এমনকী ঘোড়াতেও চাট মারতে পারে।
সেকী হে, ঘোড়া আসবে কোথা থেকে! অশ্বযুগ শেষ হয়ে, অশ্বশক্তির যুগ এসেছে।
বরাত হরিদা, বরাত। কোথা থেকে এসে, কাকে যে চাঁট মেরে যায়।
বৃদ্ধকে গাড়িতে তোলার জন্য সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দাদু আসুন, দাদু উঠুন, দাদু উঠুন। প্রথমে ভেতরে এল ছড়ি। আর একটু হলেই চোখটা যেত। মুগুর কোলে বসে আছি বলে রক্ষে পেয়ে গেল। তারপর ঢুকল বার্নিশ করা চটি সমেত একটা পা। নাতনি হাঁ হাঁ করে উঠল, আমার শাড়িটা গেল, শাড়িটা গেল।
হ্যাঁ, তোর অমনি শাড়িটা গেল। এইটুকু গাড়িতে এত বড় শরীরটা ঢোকে! কাস্টাম বিল্ট রোলস রয়েসে চেপে যৌবন কাটালুম, তোদের কালে এসে, এই বুড়ো বয়েসে ক্যানেস্তারা চাপতে হচ্ছে।
চুপ করে বোসো তো।
নাতনির ধমক খেয়ে দাদু কাছাকোঁচা, ছড়ি, সামলে বসলেন। কানের পাতায় খাড়া খাড়া লম্বা লম্বা চুল। কানে চুল থাকলে মানুষ পয়মন্ত হয়। পয়মন্ত না হলে রোলস রয়েস চাপতেন! গাড়ি চলতে শুরু করল। মাতুল সোনার ঘড়িতে সময় দেখে বললেন, চিত্রা, তুমি সাজতে গুজতে অনেক সময় নিয়েছ। দেরি হয়ে গেল।
নাতনির দাদু বললেন, কেন যে এত রং মাখিস! তোর নিজের রূপ নকলে চাপা পড়ে যায়। তোর মতো মেমের বাচ্চা…
আঃ চুপ করো তো।
রূপসি কটাক্ষ হানলেন। আমার কোলের মুগুরে আর প্রবীরবাবুর মুগুরে ঠোকাঠুকি হয়ে গেল। চকমকি হলে আগুন ছুটত। কার গর্ভে যেন মুষল জন্মেছিল! সেই মুষলে কৃষ্ণ মরেছিলেন। পাশাপাশি আমাদের দুজনের গর্ভে প্রমাণ মাপের দুটি মুগুর এসেছে যেন। সদ্যোজাত শাবকের মতো জাপটে বসে আছি। প্রবীরবাবু ফিসফিস করে বললেন, মায়ের কথা স্মরণ করো।
গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে নির্দেশটা ঠিকমতো বুঝতে পারলুম কি না সন্দেহ হওয়ায় প্রশ্ন করলুম, কী বললেন?
ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, কিছু না।
একই কথা দু’বার বলতে হলে অনেকেই ভীষণ রেগে যান। আমিও যাই। আমারই ভুল হয়েছে দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করা। ভীষণ আড়ষ্ট হয়ে বসে আছি! পাশেই মাতুলের ছাত্রী। স্বাস্থ্যবতী। পরনে আবার পিচ্ছিল সিল্কের শাড়ি। তার ওপর ছটফটে। মাঝপুকুরের মাছের মতো মাঝে মাঝে ঘাই মারছেন। আমি ভাবছি, বলে না বসেন তোমার হাঁটু আমার হাঁটুতে ঠেকছে। তোমার ওপর বাহু। আমার ওপর বাহুতে ঘষে যাচ্ছে।
মহিলা হঠাৎ আমার হাত মুঠোয় চেপে ধরে বললেন, আমার ভীষণ ভয় করছে।
কীসের ভয়। এদিকে ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। মহিলায় ধরলে ভূতে ধরার মতোই অবস্থা হয়। মাঝরাতে ঘরে চোর ঢুকলে গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না। গেরস্থ ক্ষীণ কণ্ঠে চোও চোও করতে থাকেন।
আমি কোনওক্রমে প্রশ্ন করলুম, ভয় করছে কেন?
মহিলা ডাইনে বাঁয়ে শরীর মুচড়ে বললেন, কী জানি বাবা! কী হয়! ভয়ে আমার বুক দুরদুর করছে।
ভীষণ সাহসে জিজ্ঞেস করলুম, কীসের ভয়?
অত হ্যান্ডস ফ্যান্ডস নিয়ে কোনওদিন তো গান রেকর্ড করিনি। তা ছাড়া গুরুজির গান গাওয়া খুব শক্ত। একটু এদিক-ওদিক হলেই সুর ফসকে যায়, তাল হড়কে যায়। আর তখন উনি যে দৃষ্টিতে তাকান। বাবা। না বাবা, আমি পারব না।
গরম জলে হাত লেগে গেলে মানুষ যেভাবে হাত ঝাড়ে, তিনি সেইভাবে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে চোখে চাপা দিলেন। তারপর দু’আঙুলের ফাঁক দিয়ে এক চোখে আমাকে দেখতে লাগলেন। মরেছে। মাথার গোলমাল নেই তো!
চোখ থেকে হাত সরিয়ে ফিক করে হাসলেন। হেসে বললেন, তোমাদের কোলে ও দুটো কী। যন্ত্র? একেই কি বলে গুপী যন্ত্র?
মাতুল সামনের আসন থেকে বললেন, না রে বাবা, ও দুটো হল মুগুর। আমাদের শুটিংয়ে লাগবে। যারা সিনেমার মাল সাপ্লাই করে, তারা একগাদা টাকা ভাড়া চাইত, তাই আমার ভাগনের বাড়ি থেকে নিয়ে যাচ্ছি। কিছু টাকা বাঁচবে।
দাদু বললেন, সিনেমায় রিয়েল জিনিস চলবে? ওখানে তো সবই নকল মাল চলে।
প্রবীরবাবু বললেন, আসলে নকলে মিলিয়ে একটা কিছু দাঁড়ায়।
দাদু খুব আর্টের ঢঙে প্রশ্ন করলেন, হু আর ইউ?
প্রবীরবাবু থতমত খেয়ে গেলেন। মাতুল বললেন, আমার বাল্যবন্ধু, আর্টিস্ট, গীতিকার। আমার ছবির কিছু কিছু গান ও লিখছে।
