সামনেই সাবেক কালের এক বাড়ি। বেশ বড়। গাড়িবারান্দা, থাম, লতানে গাছ, জানলায় লাল নীল কাঁচ। সব মিলিয়ে বেশ একটা বনেদি চেহারা।
এতক্ষণ লক্ষ করিনি, প্রবীরবাবুর পকেট থেকে একটা নোট খাতা বেরিয়েছে। পাতা ওলটাচ্ছেন আর আড়ে আড়ে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, তুমি কে?
আমার মামা।
দেখেই বুঝেছি। মুখটা একেবারে কেটে বসানো। মামার গুণ কিছু কিছু পেয়েছ?
কী করে বলব?
গান জানো?
ইচ্ছে করে।
ওইতেই হবে। দেখো তো এই গানটা। আচ্ছা এক দায়িত্ব দিয়ে গেল!
খাতাটা আমার হাতে দিলেন। তিন ছত্রের একটি গান,
এ জীবনে আর কোনও প্রয়োজন নাই
ব্যাকুল বাতাস হৃদয়ে আমার
মরিয়া মরিয়া কাঁদে।
প্রবীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কেমন লাগছে তোমার আস্থায়ীটা?
দারুণ।
সুরটা শুনবে?
হুঁ হুঁ করে দু’বার সুর ভেঁজে প্রথম দুটো লাইন গেয়ে ফেললেন। ভীষণ আতঙ্কে ছিলুম। গলা দিয়ে কী বেরোয়, কে জানে। না, খুব একটা খারাপ কিছু বেরোল না। ভালই বলা চলে। গাড়ির চালকও বললে, বাঃ বাঃ বেশ হচ্ছে।
প্রশংসায় প্রবীরবাবুর কাতর হয়ে পড়লেন, আমার গলায় ভাই একটা সপ্তকই খেলে। তোমার মামার মতো তিন সপ্তকে গলা খেলে না। চড়ায় উঠলেই ক্র্যাক করে। অন্তরাটা গাইব দেখবে?
করুন না।
প্রবীরবাবু প্রথম লাইন দুটো আর এক পক্কড় গেয়ে তারসপ্তকে ঠেলে উঠলেন,
তুমি যাবে চলে রজনী পোহালে
ঝরাপাতা ঝরে উতলা বাতাসে।
সাংঘাতিক শব্দ। মনে হল কে যেন গলা টিপে ধরেছে আর প্রাণবায়ু ঝারির জলের মতো বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। প্রবীরবাবু নিজেকে সংযত করে নিলেন। সময়টা সকাল। রাস্তায় লোক চলাচল করছে। করুণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কী বুঝলে? খুব খারাপ? আমি জানি চড়ার দিকে গলাটা আমার সেইরকম হয়ে যায়। না বাবা, বলব না। ভাগ্য একটু খুলব খুলব করছে। নাম করলেই সব কেঁচে যাবে।
বলতে হবে না, বুঝতে পেরেছি।
পারবেই তো, পারবেই তো। কার ভাগনে দেখতে হবে তো! স্কুলের ফার্স্ট বয়, কলেজের সেরা ছাত্র, গানে ভারত বিখ্যাত। নুনজলের গার্গল করে করে ঘামাচির ধাত হয়ে গেল, গরমকালে কী কষ্টই পাই, নুনের পাহাড় শেষ করে ফেললুম, গলার কিছুই উন্নতি হল না।
গার্গল করলে ঘামাচি হয়?
আরে আমার কথা আর বলো কেন। নুনজল মুখে নিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে যেই ঘড়ড় করতে যাই, ব্যস, ঢাকাস করে আদ্দেক চলে গেল পেটে, আদ্দেক বেরিয়ে এল নাক দিয়ে, চোখ দিয়ে। যার খারাপ হয়, তার সবই খারাপ। গলার দু’পাশে প্রহরীর মতো দুটো টনসিল থাকা উচিত, আমার মনে হয় সে মাল দুটো নেই। আলজিভটাও আছে কি না কে জানে? হাঁ করেছ কী সুয়েজ ক্যানেল খুলে গেল। অত নুন শরীরে সয়! চামড়া যেন ডায়মন্ডহারবারের নোনা মাটি। গ্রীষ্মের ফসল চাবড়া চাবড়া ঘামাচি।
আপনি আর একটা টোটকা করে দেখতে পারেন।
কী বলল তো? কী বলো তো?
গোটাদুয়েক গোলমরিচ দিয়ে এক চামচে গাওয়া ঘি। গলাটা বেশ ঝরঝরে হয়ে যাবে।
আর ভাগনে সে উপায় কি রেখেছি! লিভারের বারোটা বেজে গেছে। মুখ দিয়ে ঢুকবে পশ্চাদ্দেশ দিয়ে…না বাবা বলব না, তুমি আমাকে অসভ্য ভাববে।
আপনি কী বলতে চান বুঝে গেছি।
বুঝতেই হবে। কার ভাগনে দেখতে হবে তো?
ওরও একটা দাওয়াই আছে।
শুনি শুনি।
আগে একটা পিপুল খেয়ে নেবেন, তা হলে ঘি-মরিচ সহজেই সহ্য হবে।
পিপুল? সে আবার কী বস্তু। লোকের পিপুল পাকে শুনেছি।
ওটা অসভ্য পিপুল। আমি বলছি সভ্য পিপুলের কথা। গাছে হয়। কবিরাজরা ব্যবহার করেন।
মনে থাকবে না ভাগনে, দাঁড়াও লিখে নিই।
নোট খাতায় লিখতে লাগলেন। ওদিকে মাতুল আসছেন। সঙ্গে কে রে বাবা! রোদের কী চমক। ওঁর সাজসজ্জার রঙের চমকে প্রকৃতিরও পা পিছলে যাচ্ছে। সঙ্গে আবার এক বৃদ্ধ। তার সব সাদা, যেন শরতের মেঘ। মাথার দিকটা রুপোলি। সামনে সিথি। হাফ পাঞ্জাবি, হাতায় গিলে। দিশি ধুতি, একটু উঁচু করে পরা, পায়ে বার্নিশ করা চটি, হাতে আবার একটি ছড়ি, চোখে রিমলেস চশমা। পুরো নম্বর দেবার মতো মিহিবাবু। মহিলার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, মেজাজ খারাপ করে দেবার মতো ধরনধারণ। শাস্ত্রীয় সংগীতের মতো, শাস্ত্রীয় পরীক্ষা। দেখবে তবু টলবে না, হেলবে তবু টসকাবে না। হরি ও তৎসৎ। বাগিচার বুলবুলি। গণ্ডদ্বয় এত গোলাপি হল কী করে? ওষ্ঠদ্বয় এমন করমচার মতো লাল হল কী করে। চক্ষুদ্বয় কোণ ছেড়ে কর্ণ অবধি বিস্তৃত হল কোন মায়াবলে! ঘোর বেগুনি বর্ণের ফিনফিনে শাড়ি, ব্লাউজ বেগুনি। গাত্রবর্ণ এর চেয়ে ফরসা হলে আয়ারল্যান্ডে পাঠাতে হত।
আমার বিস্ময় প্রবীরবাবুর কণ্ঠে শব্দরূপ পেল। তিনি বললেন, বাপস, কী সেজেছে রে ভাই।
মাতুল এগিয়ে এসে পেছনের দরজা খুলে ধরে আমাদের বললেন, তোমরা একটু সরে বোসো। এঁদের বসতে দাও।
আমাদের প্রাণ আছে। আমরা না হয় সরে বসলুম। দুটো মুগুরের তো প্রাণ নেই। দুটোকে নিয়ে মহা জ্বালাতনে পড়া গেছে। নীচের দিকটা ভারী, মাথার দিকটা হালকা। সোজা হয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। একটু এদিক-ওদিক হলেই, সখি গো! বলে টাল খেয়ে উলটে পড়ছে। তেমনি ভারী। কোনওক্রমে কোলে তুলে নিয়ে সরে বসতে গেলুম। একটা ডান পাশে হেলে ছোট্ট একটু হাত ছুড়ল। তাইতেই প্রবীরবাবু কাত। সেই বাল্যে, ছাত্রজীবনে গাঁট্টা খেয়েছিলেন, আজ এইমাত্র আর একবার খেলেন। স্মৃতি, তুমি বেদনা। পাপের বেতন পেলেন। মাতুলের চড়া পরদায় বাঁধা রূপসি ছাত্রীকে দেখে মনে মনে বড় ছটফট করছিলেন। রগে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, তখন থেকে এই বেয়াড়া জিনিস দুটোকে নিয়ে কী যে তুমি করতে চাইছ। দাও দাও, একটা আমাকে দাও।
