মাতুল হাউমাউ করে পথনির্দেশ দিলেন। চালক বেচারা রাস্তা ছেড়ে যাবার ভয়ে বাঁ দিক হেলে অ্যায়সা স্টিয়ারিং ঘোরালেন দু’হাতে, কনুইয়ের কানকি লেগে মাতুলের সোনার চশমা নাক থেকে খুলে কোলে পড়ে গেল। এদিকে সাইকেলের পেছনে দুধের ক্যান চাপিয়ে এক হিন্দুস্থানি রাস্তায় বাঁক নিচ্ছিল, গাড়ির মাডগার্ডের ধাক্কায় বেসামাল হয়ে ছিটকে পড়ল। মোহনবাগানের গোলকিপার যেন বল বাঁচাতে বডি থ্রো করেছে। দুধের ক্যান রাস্তায় আপন মনে গড়গড়িয়ে চলেছে, ভলকে ভলকে দুধ বেরোচ্ছে, মায়ের করুণাধারার মতো। সাইকেল ঘাড়মুখ গুজড়ে একপাশে পড়ে আছে। শ্যামল মিত্রের সংগীতের মতো, আজ হৃদয়ের কামনা শান্ত, থাকে শুধু ব্যথাভার।
এইসব শৃঙ্খলিত ঘটনাপ্রবাহের দিকে মাতুলের চোখ ছিল। স্বভাববিরুদ্ধ গম্ভীর গলায় বললেন, স্টপ। গাড়ি থামব কি থামব না করছিল, থেমেই পড়ল। দরজা খুলে মাতুল ডান পা বাড়ালেন। চুনোট করা দিশি ধুতির কোঁচা, আসুন বাবু আসুনের ঢঙে ধবধবে সাদা, শৌখিন একটি পা-কে রাস্তায় পদপাতে আহ্বান জানাল।
দেশপ্রেমীর মতো চেহারার এক ভদ্রলোক ভূপাতিত মানুষটির ওকালতনামা নিয়ে তেরিয়া হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। মাতুলের চেহারা আর সাজপোশাক দেখে ঘাবড়ে গেলেন। চারপাশে জ্বলজ্বলে রোদ। সামনে ছ’ফুট লম্বা এক মানুষ। সারাগায়ে গোলাপি আভা। যেন কোনও কাশ্মীরি ললনা লিঙ্গ পরিবর্তন করে জাফরানের মাঠ থেকে উঠে এলেন। ঘাড়ের কাছে উদয়শঙ্করের মতো কোঁকড়ানো চুলে হাত বুলোবার জন্যে একবার আঙুল তুলেছিলেন, অনামিকার হিরের আংটি চড়াক। করে ঝিলিক মেরে উঠল। দুধঅলা গোল-খাওয়া গোলরক্ষকের মতো মুখ করে সামনে এসে দাঁড়াল, গরিব আদমি বড়াবাবু।
মাতুল বললেন, সমঝ গিয়া।
বুকপকেটে হাত দিয়ে চওড়া একটা একশো টাকার নোট বের করে হিন্দুস্থানির হাতে দিতে যাচ্ছেন–দেশপ্রেমী বাধা দিলেন, কে রে, তুই, আমাদের জয় না? দাঁড়া।
মাতুল ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, প্রবীর! তুই আমাদের প্রবীর না!
ব্যস, দুই বন্ধুর মিলন। প্রবীর বলছেন, কী চেহারা করেছিস? একেবারে লেডিকিলার!
মাতুল বলছেন, কী চেহারা করেছিস, কুস্তির পালোয়ান!
হিন্দুস্থানি বলছে, বাবুজি গরিব আমি।
মুগুর দুটো শুয়ে পড়েছিল। সিটের মাঝখানে তাড়াতাড়ি আটকে গেছে। কিছুতেই সোজা করতে পারছি না।
১.২০ যেমন কর্ম তেমন ফল, মশা মারতে গালে চড়
একশো নয়, শেষপর্যন্ত কুড়ি টাকায় হিন্দুস্থানি গোয়ালা সন্তুষ্ট হয়ে দুধের ক্যান আর সাইকেল তুলে নিয়ে সরে পড়ল। আহা কী দৃশ্য! যেন হরিহর ছত্রের মেলা। কুকুরে দুধ চেটে চেটে খাচ্ছে। একটা হোঁতকা ষাঁড়ও এসে জুটেছে। সেই কবে কোন শৈশবে, যখন এতবড় পেল্লায় ষাঁড় হয়নি, তখন কোনও এক গোমাতার দুধ খেয়েছিল। এখন আর কোন গাভী এই ভয়ংকর দামড়াকে দুধ খাওয়াবে। ষণ্ড তো আর চণ্ডী পাঠ করেনি যে গোরুতে মাতৃদর্শন হবে। বলবে স্ত্রীয়া সমস্তা সকলা জগৎসু। সে এক দৃশ্য! ষাঁড়ে দুধ চেটে চেটে খাচ্ছে। মাতুলের কুড়ি টাকার সদগতি হচ্ছে।
এদিকে মুগুর অ্যায়সা আড়াই দাঁচ মেরে বসে আছে। কুমিরের গলায় বঁড়শি আটকেছে। বেশি টানাটানি করতে ভয় লাগছে। যদি হাতল ভেঙে যায় আমিও আর আস্ত থাকব না। এদিকে মাতুল প্রবীরবাবুকে পেছনের আসনে তুলতে চান। কথায় কথায় জানা গেছে, তিনি চিত্রকর, আবার গান। লেখেন। আর রক্ষে আছে! সিনেমায় হরেকরকমের প্রচারের কাজ আছে। বাল্যবন্ধুকে হাতের কাছে পাওয়া গেছে। আর কি সহজে ছাড়া যায়।
প্রবীরবাবু উঠবেন কী করে? পায়ের কাছে মুগুরদ্বয়ের ষড়যন্ত্র। মুগুর মনে হয় স্ত্রীলিঙ্গ প্রাণী! দু’জনে পাশাপাশি সদ্ভাব বজায় রেখে শান্তিতে অবস্থান করতে পারে না। চুলোচুলি করে বসে আছে। অনেক অঙ্ক কষে প্রবীরবাবু মুগুরকে সুস্থ করে আমার পাশে উঠে বসলেন। বেশ ভালই জায়গা নিলেন। গাড়ি চলতে শুরু করল।
মাতুল সামনের আসনেই বসে আছেন। পকেট থেকে সিল্কের রুমাল বের করে, সাবধানে চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে চালককে বললেন, হিসেব রেখো।
আজ্ঞে হ্যাঁ, তিনশো কুড়ি হল।
তা হলে দু’মাসের জন্য নিশ্চিন্ত।
আমার সংসার কী করে চলবে স্যার?
যেভাবে গাড়ি চলছে, সেইভাবেই চলবে। তুমি একের পর এক অ্যাকসিডেন্ট করে যাবে, আর আমি টাকা গুনে যাব?
আপনি যে হঠাৎ হঠাৎ ডাইনে, বামে, পেছনে যেতে বলেন?
কাল তুমি রিকশাওয়ালাকে মারলে কেন?
আপনি এত সুন্দর সুর ভঁজছিলেন, আমার খেয়ালই ছিল না যে আমি এক গরিব ড্রাইভার। মনে হচ্ছিল হায়দ্রাবাদের নিজাম।
মনে তো হবেই। কী সুর জানো?
আজ্ঞে না, তবে ভারী সুন্দর।
আহির ভৈঁরো। প্রবীর, আহির ভৈঁরোর ওপর কথা বসা তো। সুরের চলনটা এইরকম হবে, হুঁ হুঁ, হুঁহুঁ, না না, তুম, হুঁ, হুঁউঁ।
প্রবীরবাবু যেন হাতে স্বর্গ পেলেন, দাঁড়া দাঁড়া, বড় ব্যথার সুর, বেদনার বাণী বসাতে হবে।
ধরেছিস ঠিক। প্রেমিকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। শীতের ভোর। ফিনফিনে আঁচলের মতো কুয়াশার কেশর উড়ছে। তেরছা হয়ে নেমে আসছে প্রথম সূর্যের কিরণ। ওদিকে বাঁধের ওপর দিয়ে রেলগাড়ি চলেছে। প্রেমিক গাইছে আর কাশছে।
আবার কাশি ঢোকাচ্ছিস কেন?
আহা অসুস্থ যে। এই রোককে রোককে।
চালক দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ব্রেক কষল। ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি থামতেই বললে, এইজন্যেই অ্যাকসিডেন্ট হয়। মাতুল গ্রাহ্যই করলেন না। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোরা বোস, আমার এক ছাত্রীকে তুলে আনি।
