এ আবার কী ল্যাঙ্গুয়েজ!
ভুল হয়ে গেছে। ককনি। দেশবিভাগের পর এইসব ল্যাঙ্গোয়েজ খুব চলছে। যেমন কারবারে গুনচট।
মাপ করো রাজা। মানে মানে এখন কেটে পড়তে পারলেই ভাল হয়। একে বলে বাস্টার্ড কালচার।
আপনিও ওই ফাঁদে পড়ে গেছেন। না জেনেই। এইমাত্র দুটো শব্দ ব্যবহার করে ফেললেন, মাপ করো রাজা, আর, কেটে পড়ো। আপনার পিতাঠাকুর এসব ভাষা ব্যবহার করতেন না।
করতেন না?
কখনওই না।
তা হলে আমি কোথা থেকে শিখলুম। আমি তো কারুর সঙ্গে তেমন মিশি না।
ওই যে জানলা। ওই জানলা দিয়ে আলো আসে, বাতাস আসে, শব্দ আসে, ধুলো আসে, ধোঁয়া আসে।
ঠিক বলেছ। গবাক্ষ পথেই স্ল্যাংয়ের আনাগোনা। The dogs did bark, the children screamed/up flew the windows all/And every soul bowled out. Po fra NTCST Taigi কীরকম মনে আছে দেখেছ?
আপনার মেমারি একেবারে ফোটোগ্রাফিক মেমারি।
তা, তোমার নায়ক না হয় মুগুর ভাঁজবে, তোমার ভাগনে কী করবে?
কোরাসে গান গাইবে। আজ গানের টেক আছে।
টেক মানে?
শট ফর টেকিং।
ও গানের কী জানে?
যা জানে তাইতেই মারকাটারি। একবার শুধু রিহার্স করিয়ে নোব।
কী লাভ?,
আহা, ওকে একটু মিশতে দিন, একেবারে ঘরকুনো করে রাখবেন না। এখন ডাকাবুকোর যুগ পড়েছে। যা-তা গান নয়, ডি এল রায়। একবার গালভরা মা ডাকে/মা বলে ডাক, মা বলে ডাক, মা বলে ডাক মাকে।
মাতুলের গলায় সুর এসে গেল। ভাবে বিভোর হয়ে গাইতে লাগলেন–
ডাক এমনি করে, আকাশ, ভুবন সেই ডাকে যাক ভরে,
আর ভয়ে ভয়ে এক হয়ে থাক যেখানে যে থাকে।
প্রফুল্লকাকা গুটিগুটি ওপরে উঠে এসেছেন। এবারে একেবারে আদুড় গা। ফরসা বুকে গুটিকতক লাজুক লোম। পিতার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বললেন, খুলে এসেছি। পুরোহাতা গেঞ্জি নেই। জামা কেচে দিয়েছে। মাতুল এদিকে উদাত্ত সুরে গাইছেন
দুটি বাহু তুলে নৃত্য করে
ডাক রে মা মা বলে,
আর নেচে নেচে আয় রে মায়ের
ঝাঁপিয়ে পড়ি কোলে
প্রফুল্লকাকা বললেন, আমাদের জয় এসেছে। একেবারে জমিয়ে দিয়েছে। তবলাটা নিয়ে আসি তা হলে, বউনি হয়ে যাক।
গান থেমে গেল। চোখ মুদে ছিলেন। চোখ খুলে বললেন, কে, প্রফুল্লদা। এখনও হাত ঠিক আছে?
তা, তোমার বাপ-মায়ের আশীর্বাদে হাত এখনও ভালই চলে।
আপনি এখন আছেন কোথায়?
হরি দয়া করে এই বাড়িতেই আশ্রয় দিয়েছে। খাবদাব আর দু’জনে বাজনা বাজাব।
না, আজ আমি উঠি। ওরে নে নে, চল মুগুর দুটো বের কর।
মাতুল উঠে পড়লেন। আমি এখন যাই কী করে? রান্না খাওয়ার কী হবে? আমার দ্বিধা দেখে পিতা বললেন, ভাবনা নেই। তুমি ঘুরে এসো। এক বেলা আমি চালিয়ে নিতে পারব।
মাতুল বললেন, যাচ্ছিস সিনেমাপাড়ায়, আমি তোকে সাজিয়ে নিয়ে যাব। দেখি তোর জামাকাপড় কী আছে। পাঞ্জাবি আছে?
আজ্ঞে না।
গোটা দুয়েক পাঞ্জাবি করা না! দাঁড়া, আমি তোকে করিয়ে দোব।
পিতা বললেন, উঁহু ভাইস ঢুকিয়ো না। অ্যাভারিস বিগেটস সিন, সিন বিগেটস ডেথ।
পাঞ্জাবিতে ভাইস?
না, তা নয়, তবে ফপিস টেনডেন্সি এসে গেলে ও আর কিছু করতে পারবে না। তুমি তো সব পেয়ে গেছ। তোমার যা সাজে, ওর তা সাজে না। ওকে যে এখনও অনেক দূর যেতে হবে, go thou forth weeping bearing precious seed, until the time comes.
কোন যাওয়ার কথা তিনি বললেন জানি না, তবে মাতুলের গাড়িতে প্রায় কেঁদে ফেলার মতোই পরিস্থিতি তৈরি হল। পেছনের আসনে বসে আছি। হাটুর দু’পাশে দারোয়ানের মতো খাড়া দুটো মুগুর। মাতুল বসেছেন, সামনে, চালকের পাশে।
গাড়িটা কিনে ফেললুম, বুঝলি? যদিও সেকেন্ড হ্যান্ড, তবু বাঘের বাচ্চা। খায় কম।
কী খায়?
তেল রে, তেল। কম তেলে বেশি রাস্তা খায়।
সিটটা এমন কেন? পেছনে খোঁচা মারছে।
গদিটা একটু তেবড়ে গেছে রে। ওসব পালটাতে হবে। দাঁড়া, ডিস্ট্রিবিউটরের টাকাটা হাতে এসে যাক, খোলনলচে সব বদলে রোলস রয়েস করে ফেলব। গাড়ি ছাড়া ফিল্ম হয়? কীরকম যাচ্ছি বল? রাজার মতো!
তা যাচ্ছি। তবে আপনার গাড়ি বড় শব্দ করে। এটা বোধহয় মিলিটারিতে ছিল।
না রে, গাড়িরও পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ আছে। এ হল পুরুষ গাড়ি। ক্ল্যাসিক্যাল আর্টিস্ট। গলা দিয়ে ধ্রুপদ বেরোচ্ছে, সঙ্গে পাখোয়াজের সংগত।
আপনার সেই বন্ধু প্রতাপবাবুর কী হল?
ও প্রতাপ! আর বলিসনি, প্রতাপ ফেঁসে গেছে।
ঘুড়ি ফেঁসে যায় শুনেছি, মানুষও ফেঁসে যায়!
ফাঁসে না। প্রতাপ প্রেমে ফেঁসেছে।
প্রেম?
হ্যাঁ রে ব্যাটা! সেই তোদের বাড়ির মেয়েটা, কী যেন নাম বড়টার।
কনক।
হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই কনক। কনকের সঙ্গে ওর বিয়ে লাগল বলে। তোর ওই মেসোমশাই। উঃ একটা ঘঘাডেল মাল।
আমি জানতুম।
জানবিই তো। ধোঁয়া দেখলেই বুঝবি আগুন আছে। প্রতাপ ছেলে ভাল, তবে কী জানিস, অঢেল পয়সা। পয়সাওলাদের চরিত্র বড় চঞ্চল হয়। আকাশে ভেসে থাকে, মাটিতে পা থাকে না।
আপনারও তো পয়সা আছে।
আমার পয়সা! গান ছাড়া আমার কিছু নেই। জানিস তো, ভাল একটা চাকরি করতুম, ইয়েস স্যার নো স্যারের ভয়ে ছেড়ে চলে এলুম। আমার দুটো গ আছে, গান আর গোঁ। দুটো র আছে, রাগ আর রসনা। আমি খেতে বড় ভালবাসি রে। বেশি না, অল্পঅল্প। কিন্তু বেশ তরিবাদি করে। দুটো ল আছে, লোভ আর লোভয়। দুটো ভ আছে, ভালবাসা আর ভাবনা। নিজেকে চিনতে শেখ ব্যাটা, জীবনে চলার রাস্তা খুঁজে পাবি। বাঁয়ে, বাঁয়ে।
