কী বলছ হরি, কী বলছ হরি, করতে করতে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলেন। হাতকাটা গেঞ্জিটা ছাড়লে পারতেন। স্যান্ডো গেঞ্জি পরলে পিতা বড় অসন্তুষ্ট হন। হাত তুললেই বাহুকেশ উঁকি মারে।
দাড়ি কামানো শেষ করে পিতা ক্ষুরের পরিচর্যায় ব্যস্ত। সামান্য ধোঁয়া তখনও ঘরে ইলিবিলি করছে। শোনো প্রফুল্ল, এ চলবে না।
প্রফুল্লকাকা কিছু না বুঝেই বললেন, ঠিক বলেছ এ আর চলে না।
তা হলে ব্যবস্থা করো।
দিয়ে দাও, আজই শান দিয়ে নিয়ে আসি।
শান? পিতা অবাক হলেন। কীসের শান?
ক্ষুর। ক্ষুরে ধার কমবেই। মাঝে মাঝে ধার দিতে হয়।
আমি ধোঁয়ার কথা বলছি। তোমার নীচের সমস্ত ধোঁয়া ওপরে আসছে। তার কী হবে?
আমাদের তো দুটি খেতে হবে, হরি।
তোমাকে আমি ধোঁয়ার কথা প্রথমেই বলেছি। তুমি বলেছিলে, আপনি আর কপনি, প্রাইমাস স্টোভেই মেরে দেবে। সে কথা তুমি রাখলে না।
বড্ড খরচ হরি। কয়লাতে একটু সাশ্রয় হবে। জানোই তো আমি কী কাজ করি। সামান্য মাইনে।
উটের নাক গলাবার গল্পটা তোমার মনে আছে? গিভ দেম অ্যান ইঞ্চ, দে উইল আস্ক ফর অ্যান এল। এমনি থাকো আমার আপত্তি নেই, ধূমায়িত অবস্থায় আমার আপত্তি আছে।
বেশ তাই হবে। প্রফুল্লকাকা করুণ মুখে উঠে দাঁড়ালেন। চলে যাচ্ছিলেন। পিতা গম্ভীর গলায় বললেন, যাও জিজ্ঞেস করে এসো।
কী জিজ্ঞেস করব হরি? কাকে করব?
তোমার স্ত্রীকে। আমাদের রান্নাঘরে রাঁধায় তার আপত্তি হবে কি না? ধোঁয়া বেরোবার চিমনি আছে। এক জাপটে সব হয়ে যাবে।
অ্যাঁ, বলো কী? তুমি তা হলে আমাদের রান্না খাবে?
না।
তা হলে?
তা হলে, ভেরি সিম্পল। পালা করে রান্না হবে। সকাল ন’টার মধ্যে আমাদের সব শেষ হয়ে যাবে। তোমাদের শুরু হবে। ইচ্ছে করলে বিকেল পর্যন্ত চালাও। রাত আটটায় আবার আমাদের পালা।
এখন আমরা কোন পালায় পড়ব? এখন তো প্রায় এগারোটা বাজে।
আজ তো তোমরা আগুন দিয়েই ফেলেছ! সকালটা সেরে নাও। বিকেলে যে-পালা বেঁধে দিলুম, সেই পালা অনুসারেই চলবে।
ভেরি গুড, ভেরি গুড। প্রফুল্লকাকা নীচের দিকে পা বাড়ালেন।
হ্যাঁ শোনো। আবার বাধা। পিতা আপাদমস্তক তবলচি বন্ধুকে দেখে নিলেন একবার।
এই ধরনের অঙ্গসজ্জা আমি অপছন্দ করি। ভবিষ্যতে আমার সামনে যখন আসবে, হয় আদুড় গায়ে, না হয় পুরোহাতা গেঞ্জি পরে। এই ধরনের গ্রহণ-লাগা গেঞ্জি চলবে না।
ও ইয়েস, ও ইয়েস। আই চেঞ্জ ক্লথ, নট চেঞ্জ গেঞ্জি। রিমেমবার। রিমেমবার।
এ কী ইংরিজি রে বাবা। পিতার বন্ধু, অথচ শীলন, পরিশীলন, শিক্ষা-দীক্ষা কিছুই তেমন নেই। এমন মানুষকে সহ্য করবেন কেমন করে! উনি আবার ফুসুর ফুসুর করে বিড়ি খান। গোদের ওপর বিষফোঁড়া।
ঊর্ধ্বশ্বাসে একটি গাড়ি আসার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলুম। আমাদেরই বাড়ির সামনে সশব্দে ব্রেক কষে থেমে গেল। দরজা বন্ধের শব্দ হল। মনে হয় প্রতাপ রায়। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। মাতুল এলেন। পিতা খাপে ক্ষুর ভরতে ভরতে বললেন, কী ব্যাপার হে, অমাবস্যায় চাঁদের উদয়।
অঙ্গে চাঁপাফুল রঙের পাঞ্জাবি। ফিনফিনে দিশি ধুতি। উঃ যা মানিয়েছে। একেবারে প্রিন্স অব ওয়েলস। মাতুলের হাসিটি ভারী চমৎকার। সোনার চশমার আড়ালে জ্বলজ্বলে টানা চোখ। চোখ হাসছে, মুখ হাসছে। সর্ব অঙ্গে হাসির হিল্লোল।
দুটো জিনিস চাইতে এলুম।
একটা নয়, একেবারে দুটো। বলো, কী বস্তু?
আপনার সেই মুগুর দুটো। আর আমার এই ভাগনেটিকে।
ফর গুড, না ফেরত দেবে।
না না, ফেরত দোব। ফাস্ট আইটেম, রিটার্নেবল হোয়েনেবল, সেকেন্ড আইটেম সন্ধের মুখেই ফিরিয়ে দেব।
হঠাৎ মুগুর নিয়ে কী করবে? ভাঁজবে?
চেয়ারে গুছিয়ে বসে মাতুল বললেন, আমার ছবি ফ্লোরে নেমে পড়েছে। তিন দিন কাজ হয়ে গেল। আজ চতুর্থ দিন। আজ যে-শটটা নেওয়া হবে, সেই শটে একটু মুগুরটুগুর ভাজার ব্যাপার আছে।
স্টোরি কার?
স্টোরি আমরা সবাই মিলে তৈরি করেছি।
সে আবার কী? বারোয়ারি দুর্গাপুজো!
ফিলমে ওইটাই চলে। একটু অ্যাকটিং, একটু গান, পারলে এক রাউন্ড নাচ, আবার একটু অ্যাকটিং। ফুটবলের মতো, পাস দিতে দিতে পাস দিতে দিতে এগিয়ে চলা।
তা তোমার এ কাহিনি কি লাভস্টোরি?
না, না, প্রেমফ্রেম খুব জোলো ব্যাপার। আমার হল দেশাত্মবোধ। ভারত জাগিল তবু কই? দেশ বিভাগ, দাঙ্গা, বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্নীতি, চক্রান্ত, কালোবাজারি…
সব মিলিয়ে একটা ক্যাডাভ্যারাস কাণ্ড।
ক্যাডাভ্যারাস বলছেন কেন?
দেশাত্মবোধে আবার নাচ আসে কোথা থেকে। তা ছাড়া এ দেশে দেশাত্মবোধ ছিল স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত। আদর্শ ছিল, আত্মত্যাগ ছিল, স্বাদেশিকতা ছিল। এখন তো আবার সেই নীচের দিকে স্রোত বইছে। মেরি করেলির ভারত, চিকেনারি, পারজারি, ফোরজারি, বাফুনারি।
অ্যা, ঠিক ধরেছেন। আমাদের গণেশ উদ্বাস্তুদের নামে করোগেটেড শিট বের করে ব্ল্যাকে ঝেড়ে ঝেড়ে আটচালা থেকে তিনতলা বাড়ি হাঁকালে। আমাদের মেধো হল ভারী নেতা। আগে বাড়ি বাড়ি মাঝরাতে সিঁদ দিয়ে বেড়াত, এখন ওয়াগন ভাঙে। নেতা আবার ডাক্তারদের মতো চেম্বার খুলে বসেছে। সকাল, বিকেল দরবার বসে। A film not only entertains but it also educates. এইসব মূঢ়, স্নান, মূক মুখে দিতে হবে ভাষা। কোরাসে একটা গান রেখেছি, মুখোশ খোলো, মুখোশ খুলে মানুষ চেনো, মুখোশ খোলো। মুখের কথায় ভুল বুঝো না, চিনতে শেখো, কোন কথাটা কথার, কোন কথাটা মনের। মুখোশ খোলো। বাউলের সুরে নেচে নেচে ধরেছি একেবারে তেড়ে চড়া পরদায়। ফাটাফাটি ব্যাপার। মারকাটারি বগল চাপ।
