পিতা বললেন, আমার পা-টা ঠিক থাকলে তোমাদের সঙ্গে লেগে যেতুম।
না না, ও একাই পারবে। আমাকে আবার এখুনি বেরোতে হবে। মুরগিহাটায় কাজ আছে।
সেকী, একা সব সামলাবে কী করে, যেখানে এক রেজিমেন্ট লোকের প্রয়োজন।
ওঃ, তুমি ওকে চেনো না। একাই একশো।
ভদ্রমহিলা দেয়ালের দিকে মুখ করে বললেন, ওঁকে জিজ্ঞাসা করো, শরীর যখন খারাপ, আমি কি বেঁধে দোব? আমার ছোঁয়া খেতে ওনার যদি আপত্তি না থাকে!
ঠিক বলেছ। ঠিক বলেছ। সত্যিই তো। শরীর যখন খারাপ তোমারই সেবা করা উচিত। হরি, তোমার কি জাতের বিচার আছে?
জাত! তা হলে তো আমাকে বড় বিপদে ফেললে। যদি বলি আছে, তা হলে দুঃখ পাবে, যদি বলি নেই, তা হলে রাঁধতে বসবে। আমি আমার জন্যে কাউকে খাটাতে চাই না।
শ্রীমতী প্রফুল্ল নিচু হয়ে প্রণাম করে, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন। প্রফুল্লবাবু বললেন, মারো গোলি।
» ১.১৯ মারকাটারি বগল চাপ কারবারে গুনচট
ডাকে একটা চিঠি এল। খামের বুকে পাতলা কাগজের জানলা বসান। সেখান থেকে উঁকি মারছে আমার নাম। ভেতরে টাইপ করা চিঠি। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান ইন্টারভিউতে ডেকেছেন। যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে সাত দিন পরে সকাল দশটার সময় উপস্থিত হবার সংক্ষিপ্ত আদেশ। যাক এতদিনে তবু একটা ডাক এল। জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ। খুবই আতঙ্কজনক ব্যাপার। কনে দেখার মতো। একটু হাঁচো তো মা। একটু কাশো তো মা। দু’লাইন কবিতা বলো তো মা। সামনে দিয়ে দু’পা হেঁটে যাও তো মা। সাধারণ চাকরি। কী আর এমন জিজ্ঞেস করবে। বি সি এস কি আই সি এস হলে চিন্তার ছিল। চাকরিটা যদি হয়ে যায়, তা হলে বেশ মজা হয়। গোঁফ বেরোলেই কি সাবালক হয়! বেড়াল তো গোঁফ নিয়েই জন্মায়। সাকার না হলে আকার আসে না।
টেবিলের ওপর গোল একটা আয়না বসিয়ে পিতা চিবুক উলটে দাড়ি কামাচ্ছেন। হাতে কায়দা করে ধরা সেই বাটলার ক্ষুর। বেঁটে ঝকঝকে ফলা। বাঁটটা ভারী সুন্দর। ওটা নাকি হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি। সোনালি পিন দিয়ে আঁটা। রূপসির নাকছাবির মতো ঝিলিক মারছে। সড়াক করে টান মারছেন। সাবানের ওপর দিয়ে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড তৈরি হচ্ছে। দাড়ি কামাতে বেশ সময় লাগে। সোজা টান, উলটো টান। মাঝে মাঝে হাত বুলোনো। কড়কড় করলেই উলটো টান।
প্রশ্ন করলেন, কার চিঠি? ইনশিয়োরেন্সের?
আজ্ঞে না, ইন্টারভিউ।
তাই নাকি? তা হলে জীবিকার জগতে ঢুকলে? কোন প্রতিষ্ঠান?
সি এইচ লরেন্স।
প্রাইভেট ফার্ম। একজন ডিরেক্টারের সঙ্গে আমার আলাপ আছে। সত্যিই যদি চাকরিটা চাও তা হলে একটা চিঠি লিখে দিতে পারি।
নিজের জোরে কী হয় দেখি না।
বাঃ, এই তো চাই। পুরুষকার তৈরি হচ্ছে।
উত্তর দিক থেকে একঝলক ধোঁয়া এসে ঘরে ঢুকল। নীচে প্রফুল্লকাকার স্ত্রী তোলা উনুনে আগুন দিয়েছেন। পিতা বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি যেন সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়েছি, সরাসরি তাঁর মুখে। আমতা আমতা করে বললুম, আজ্ঞে, ধোঁয়া।
হ্যাঁ, ধোঁয়া। স্মোক নুইসেন্স। সহ্য করা শক্ত।
রাঁধতে গেলে আগুন তো দিতেই হবে।
তুমি কি ও-তরফের অ্যাডভোকেট?
যা বাব্বা! নীচের তলায় থাকার জন্যে আমি ওঁদের ডেকে এনেছি নাকি! পিতা সুর পালটে বললেন, মহিলা রাঁধেন ভাল। সেদিন ধোঁকা কেমন খেলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, অসম্ভব ভাল বেঁধেছিলেন।
প্রায় বছর দশেক পরে আমি ধোঁকা খেলুম। তোমার মা রাঁধতেন ভাল। তবে জীবনটা তত বড় সংক্ষিপ্ত ছিল। খেলা না ফুরাতে, খেলাঘর ভেঙে সরে পড়ল। চলবে না।
আসা-যাওয়ায় তো মানুষের হাত নেই।
আরে দুর, উনুন না-ধরালেই ধোঁয়া আসবে না। এর চেয়ে সহজ সমাধান আর কী আছে।
না, আমি ভেবেছিলুম, আপনি মানুষের আসা-যাওয়ার কথা বলছেন।
আরে না না, মানুষ তো আসবে-যাবে। ইন্টারন্যাল প্রসেস।
একফালি চামড়ায় সটাসট বারকতক ক্ষুর শানিয়ে নিলেন। গালে আবার একবার সাবান চাপছে। হাত থামিয়ে বললেন, ডেকে আনো।
কাকে? কাকিমাকে?
গবেট। কোনও পুরুষ পরস্ত্রীকে ডাকতে পারে? প্রফুল্লকে ডেকে আনে।
প্রফুল্লকাকার স্ত্রীর নামে সাবেক কালের একটা গন্ধ আছে, আঙুরবালা। ভদ্রলোক আদুরে গলায় ডাকেন, আঙুর। ও আঙুর। মহিলার বরাতে স্বামীর আদরের চেয়ে অনাদরই বেশি জোটে। যেকদিন এসেছেন, তার মধ্যেই দু’-এক পক্কড় চড়চাপড়ও হয়ে গেছে। মহিলা সত্যিই অসম্ভব কাজের। নীচেটাকে কেমন তকতকে ঝকঝকে করে ফেলেছেন। পাতকোতলা থেকে যে নর্দমাটা সোজা সদর রাস্তার নর্দমার দিকে পড়েছে, সেটা এতকাল খোলাই থাকত। আঙুর কাকিমা লম্বা কাঠ পেতে নগ্নতা ঢেকেছেন। বিচিত্র বোদা গন্ধটা আর নেই।
হুট করে নীচে নেমে বড় অপ্রস্তুতে পড়ে গেলুম। সকালের দিকেই যে প্রফুল্লকাকার এমন সোহাগ পেয়ে বসে আছে, কী করে জানব। কিছু একটা করছিলেন, আমার ডাক শুনে চমকে ফিরে তাকালেন। একটু অপ্রস্তুত ভাব।
এই যে মাস্টার পিন্টু?
আঙুর কাকিমা তাড়াতাড়ি ঘরের অন্ধকার অংশে সরে গেলেন।
আপনাকে বাবা একবার ডাকছেন।
অ্যাঁ, ডাকছে! এ পোশাকে যাই কী করে। হাগা, এই ফুলফুল শাড়ি পরে যাওয়া যাবে।
স্ত্রী সমর্থন করলেন না। উনি রাগী মানুষ। শাড়ি পরে যাবে কী করে? ধুতি পরে যাও।
ভাঁজ করা শাড়ি ছেড়ে ধুতি পরতে হলেও যে বিড়ি ধরাতে হয় এই প্রথম দেখলুম। উনুন থেকে কাগজে করে আগুন তুলে নিলেন। মুখে এখনও দাঁত পরেননি। বিড়ির টানে চোপসানো গাল আরও চুপসে গেল। বাজপাখির ঠোঁটের মতো নাক আর ছিটেগুলির মতো দুটো চোখ ছাড়া মুখে আর কিছু আছে বলে মনে হল না। ঠোঁটের ফাঁকে বিড়ি, চামচের মতো দুটো চোখের রসগোল্লা তুলছে আর নামাচ্ছে। গায়ে হাতকাটা গেঞ্জি। সারাগায়ে গুলির বাহার। ঠেলে ঠেলে আছে। যারা উপযুক্ত আহার ছাড়া রিঙে ব্যায়াম করেন তাদের চেহারাই এইরকম পাকতেড়ে হয়।
