অ্যাকোনাইট থ্রি এক্স দোব কেন? মার্কসলও তো দিতে পারি।
পিতাঠাকুর বললেন, হোয়াই নট মার্ককর!
মাতামহ বললেন, হোয়াই নট
নাম! ডাক্তারবাবু খুটুস করে ওষুধের ব্যাগ বন্ধ করে বললেন, আমি উঠি। রোগের চেয়েও আপনারা মারাত্মক। চিকিৎসা আপনারাই করুন।
কুছ পরোয়া নেহি। মাতামহ উল্লাসে ফেটে পড়লেন। বেশ শুট জলে ফুটিয়ে, তোকমারি দিয়ে মেড়ে, চিনি সহযোগে প্রাতে সেবন করিয়ে দোব। মধ্যাহ্নে পেট সিলমোহরকরা লেফাফা।
তোকমারি? সে তো ফোঁড়া ফাটায়! আপনি ভুল করছেন। পিতার সংশয়।
ভুল করব কেন, ওই তো সাদা সাদা হড়হড়ে, ভু ভু… আটকে গেলেন। স্মৃতি কমছে। বয়েস হচ্ছে।
ইসবগুল, ইসবগুল। ডাক্তারবাবু ভীষণ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে আসল বস্তুটির নাম বলে দিলেন। তা দিতে পারেন, ভালই হবে। এমনিই লুজ আরও লুজ হয়ে যাবে।
তুমি ডাক্তারির কি জানো না। হতে পারে।
তবে আপনিও যে খুব বেশি জানেন, এমন প্রমাণ পাওয়া গেল না।
দাদুর মুখে অদ্ভুত এক ধরনের হাসি খেলে গেল। তিনি ডাক্তারি থেকে সরে আধ্যাত্মিক লাইনে চলে গেলেন। আচ্ছা ডাক্তার, তুমি তো সব তীর্থ ঘুরে এসেছ, কৈলাস, মানস, অমরনাথ, গঙ্গোত্রী। বেশ, বলো দেখি স্বয়ম্ভু পূষন কাকে বলে?
ডাক্তারবাবু বললেন, পারব না মুকুজ্যেমশাই! শাস্ত্রজ্ঞানে আপনার জুড়ি নেই। আমি জানি, নাক্স, ইপিকাক, অ্যালো, জেলসিমিয়াম। আমি ঘুরি দেশ দেখার ধান্দায়। আপনি খোঁজেন ভারতাত্মা, আমি খুঁজি মানবাত্মা।
হাঃ হাঃ তাই বলো। তা হলে দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ কাকে বলে তাও নিশ্চয় জানো না!
আজ্ঞে না।
সেই শঙ্খ গভীর রাতে আপনি বাজতে থাকে। সাধকের ইড়া পিঙ্গলায় তখন ওঁকারধ্বনি ওঠে।
ডাক্তারবাবু ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে বসতে বসতে বললেন, তা হলে অ্যাকোনাইট থ্রি এক্সই দিয়ে যাই।
দাদু বললেন, দেবেই তো, দেবেই তো। ও ছাড়া আর কোনও ওষুধই নেই। দক্ষিণাবর্ত শঙ্খের মতো আমার মুখ দিয়ে বেটি ঠিক ওষুধের নামটি বের করে দিয়েছে। জানো তো সিদ্ধপুরুষের বাক্যে বজ্রপাত হয়। ত্রেতায় হত, দ্বাপরে হত। মহাকলিতে সব গেছে। এক ডোজ ওষুধ দাও না। ডাক্তার যাতে কুলকুণ্ডলিনীটা খুলে যায়।
মাতামহ প্রায় ধ্যানস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তারবাবু এক পুরিয়া ওষুধ বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে পড়তে আমার জিভে উজাড় করে দিলেন। দাদু বললেন, এক একটা গুলি এক একটা বীজমন্ত্রের মতো পেটে পড়ে দক্ষযজ্ঞ শুরু করে দিক। ডাক্তার, তোমাকে নয়, তোমার বিশ্বাসকে আমি ভক্তি করি। এবার যখন পাহাড়ে যাবে আমার জন্যে একটু শিলাতু আর এক ডেলা মৃগনাভি আনবে।
আচ্ছা মনে থাকবে, বলে ডাক্তারবাবু চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের বাইরে প্রায় চলে গেছেন, দাদু তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন, ডাক্তার, ডাক্তার আহারের বিধানটা দিয়ে গেলে না?
সকালে উপবাস। মিছরির জল চলতে পারে। রাতে টাকা সাইজের চারখানা লুচি, নুন দিয়ে লুচি। ভাজার আগে ঘিয়ে কয়েক কুচি আদা ভেজে নেবেন। অত ভজঘট করবে কে?
পিতাঠাকুর হাঁটুতে তাল ঠুকে বললেন, কেন আমি!
আপনার অফিস?
অফিস আগে না ছেলে আগে ডাক্তার!
শ্যামবল্লভ মৃদু হেসে চলে যেতেই মাতামহ বললেন, দাঁত থাকতে লোকে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না। কী, এখন তোমার মনে হচ্ছে না হরিশঙ্কর, স্ত্রী বেঁচে থাকলে কত সুখে থাকতে পারতে?
আজ্ঞে না, সুখ আমার জীবনে নেই। আমি জন্মেছি বেঁচে থাকার মাশুল দিতে। ওর মা বছর তিনেক সুস্থ ছিল, তারপরই তো শয্যাশায়ী। সারাজীবন আপনি ঘি খেয়ে, দুধে কাঁঠালের ক্ষীর খেয়ে, তীর্থ আর মহাপুরুষ করেই কাটিয়ে গেলেন। ছেলেমেয়ের কথা যদি একটু ভাবতেন?
বলো কী হরিশঙ্কর? হরিশঙ্কর ঠিকই বলে, কারুর পরোয়া করে না। আপনার মেয়ের মতো অত ক্ষীণ স্বাস্থ্যের মহিলার সংসারধর্ম করতে আসাটাই অন্যায় হয়েছিল। আমাকে অনাথ করে, স্মৃতিটুকু ফেলে রেখে চলে গেল ড্যাং ড্যাং করে। স্বার্থপর, সেলফিশ, এসকেপিস্ট। ওপরে গিয়ে একবার দেখা হলে আমি গায়ে গায়ে শোধ তুলব। নাঃ, ওপর বলে তো কিছু নেই! সবই এখানে। সবই এখানে। হিয়ার, হিয়ার অ্যান্ড হিয়ার। চোখে জল। দু’জনের চোখেই জল।
১.০২ কৌপীনবন্ত: খলু ভাগ্যবন্ত
কোমরের কাছ থেকে ছোট্ট একটুকরো কাপড় বের করে পিতৃদেব চোখ মুছলেন। আড়চোখে আমাকে একবার দেখে নিলেন। উঃ, পিতা হবার কী জ্বালা! আমার মতো সৌভাগ্যবান ক’জন আছে। জন্মেই মরুভূমি। ধরে বেঁধে রাখার মতো কেউ কোথাও নেই। পরিস্থিতি লম্বা আঙুল তুলে দিকনির্দেশ করছে, পিন্টু, লোটাকম্বল। কৌপীনবন্তং খলু ভাগ্যবন্তং। জয় শিবশঙ্কু, উখার দে মকান, লাগা দে তম্ভ। চিতপাত হয়ে শুয়ে আছে, আর এক গৌতমবুদ্ধ। মানুষের কী কষ্ট। রোগ, শোক, জরা, ব্যাধি। মানুষ জেরবার হয়ে গেল। এ থাকে তো ও যায়, ও থাকে তো এ যায়। কী যে কেলোর কীর্তি চারদিকে। প্রবীণরা এসে মাঝে মাঝেই শুনিয়ে যান, হরিশঙ্কর, তোমরা শুনলে না তখন, এই ভূতের বাড়িতে এসে ঢুকলে! অত বড় সংসার, একে একে সবাই চলে গেল। এখন বংশে বাতি দেবার মতো কেউ থাকে কি না দেখো! হরিশঙ্কর তখন বুক ফুলিয়ে বলেন, কেউ না থাকে আমি থাকব। সেই ছাত্রজীবনে বাংলার শিক্ষক আমাদের চাঁদসদাগর পড়াতেন, হাতে লাঠি নিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছেন সদাগর, সব গেছে তবু নতি স্বীকার করব না।
