তা হলে, তোমার মাথার সামনের দিকের চুল উঠে গিয়ে টাক বেরিয়ে পড়ছে কেন? এই বয়েসেও আমার চুল দেখো।
আজ্ঞে, ওটা হিস্ট্রি নয় ব্যাড মেনটেনেন্স। ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার। যত্ন আর তদারকির অভাব।
সাধুদের জটা দেখেছ? তারা চুলের কি যত্ন করে হরিশঙ্কর?
আপনি অন্য লাইনে চলে যাচ্ছেন। তা হলে বলতে হয় আপনারা সকলে অকালপক্ক কেন?
অকালপক্ক? হাসালে। পঁয়ষট্টিতে চুল পাকবে না? চুলের বাবা পাকবে।
তা হলে ওই দেখুন, আমার পিতাঠাকুরের ছবি। কুচকুচ করছে একমাথা কালো চুল।
ওটা কলপ হরিশঙ্কর। গোঁফজোড়া দেখেছ? পেকে ফটফট করছে।
ডাক্তারবাবু মৃদু হেসে বললেন, আপনারা কী আরম্ভ করলেন দু’জনে। শুনুন শুনুন, হিস্টিরিয়া হল মেয়েদের অসুখ। কোথা থেকে কোথায় চলে গেলেন!
পিতৃদেব অম্লান মুখে বললেন, ওকে আমি পুরুষ বলে মনে করি না, মহিলা, এফিমিনেট স্বভাবের। চুল আঁচড়াচ্ছে তো আঁচড়াচ্ছেই, গালে রুমাল ঘষছে তো ঘষছেই। ভাল করে গোফ পর্যন্ত বেরোল না। মাতুল বংশের দিকে চলে গেছে। চুলের বাহার দেখেছেন। খোঁপা বাঁধলেই হয়।
দাদু বললেন, ওহে হরিশঙ্কর, একতরফা খুব তো বলে যাচ্ছ, ফঁকা মাঠে হারোয়া লাঠি ঘুরিয়েই চলেছ। আমার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখো। গোঁফজোড়া দেখেছ। দেউড়ির দরোয়ানকেও। হার মানায়।
আপনার কথা আলাদা। আমি বলেছি মাতুল বংশ।
মাতামহ ছাড়া মাতুল আসে কোথা থেকে বৃন্দাবনচন্দ্র।
আমার নাম হরিশঙ্কর। নাম বিকৃত করা আপনার এক বদ স্বভাব। শাস্ত্র বলছে, নরানাং মাতুলক্রম, মাতামহক্রম নয়। ধর্মের পথে আছেন যখন একটু শাস্ত্রটাস্ত্র উলটে দেখলে লাভ বই লোকসান হবে না।
ডাক্তারবাবু এবার বেশ সশব্দে হাসলেন, স্ত্রীবিয়োগ হলে মানুষের মস্তিষ্ক যে বিকৃত হয়, আপনারাই তার প্রমাণ।
তার মানে? দু’জনেই প্রতিবাদ করে উঠলেন। আমরা পাগল?
পাগল বললে ভুল হবে, সামান্য ছিটগ্রস্ত। সামান্য বিষয় নিয়ে যেভাবে কচলাকচলি করছেন। দু’জনে?
দাদু বললেন, প্রতিবাদ করো হরিশঙ্কর, প্রতিবাদ।
আই প্রোটেস্ট, কে বলেছে স্ত্রীবিয়োগ হলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। আপনার হ্যাঁনিম্যান সায়েব? মুখুজ্যেমশাই, আপনি কত বছর উইডোয়ার?
তা হবে, বছর তিরিশ তো হবেই।
আমার হাফ, প্রায় পনেরো বছর। আমার কী ইনস্যানিটি আপনি দেখলেন?
দাদু ভালমানুষের মতো মুখ করে বললেন, কিছুই না, যা ছিল তাই আছে।
তার মানে? পিতাঠাকুর আবার তেড়ে উঠলেন।
ডাক্তারবাবু ওঁদের দু’জনকে অগ্রাহ্য করে এবার আমাকেই জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে বাপু?
সেই ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি, উনি এইভাবেই কথা বলেন। রোগীদের মনে হয় বয়স বাড়ে না। যতটা সম্ভব চাপা গলায় বললুম, রক্ত আমাশা।
রক্ত আমাশা? পিতৃদেবের কান এদিকেও ছিল, লাফিয়ে উঠলেন, হরিগিরির ডালবড়া। বাজার থেকে মারা কাঁচা পয়সা পকেটে গজগজ করছে, ডালবড়া চলছে, ফুলুরি চলছে, কচুরি ঘুগনি চলছে, পেটের আর দোষ কী! নাও এবার তিনমাস বিছানায় লটকে পড়ে থাকো। পিতার হোটেলে। দাদু সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন, শখের প্রাণ গড়ের মাঠ।
ডাক্তারবাবু শান্ত গলায় বললেন, আহা, আপনারা অত উতলা হচ্ছেন কেন? আমাকে যখন আনলেন, একটু দেখতে দিন। তা বাবা, কী খেয়েছিলে? কোনও গুরুপাক কিছু?
দাদু চোখ টিপলেন। অর্থাৎ ফ্যানের কথাটা গোপন রাখ।
আজ্ঞে না, তেমন তো কিছু খাইনি।
পিতৃদেব সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন, মিথ্যে কথা। কার্য না থাকলে কারণ থাকে না। কিছু না খেলে কিছু হয় না। একে লিভার নেই, তার ওপর গোটা চল্লিশ ডালবড়া, তার ওপর কনস্টিপেশন, যাবে কোথায়? বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার ঘুঘু তোর–।
তুমি তখন থেকে অত ডালবড়ার দিকে ঝুঁকে আছ কেন বলো তো? মাতামহের প্রশ্ন।
আমি যে ওর উইকনেস জানি। আপনার যেমন ছোলার ডাল আর লুচি ওর তেমনি ডালবড়া।
এটা তুমি ঠিক বলেছ হরিশঙ্কর। চাপ চাপ ছোলার ডাল, আর গোটা চল্লিশ ফুলকো ফুলকো লুচি আর শেষে তোমার হাতের ঘি-চপচপ হালুয়া। আহা, ওটা তুমি যা বানাও না! খেতে খেতে মনে হয় কে যেন পটাপট পটাপট কাথবার্টসন হার্পারের বাড়ির জুতো হাঁকড়াচ্ছে গালে। অনেকদিন হয়নি, একদিন হয়ে যাক।
আড়চোখে একবার দেখে নিলুম, পিতাঠাকুরের মুখ নিমেষে প্রসন্ন হয়ে উঠেছে। স্বভাব অনেকটা শিবঠাকুরের মতো। অল্পেই তুষ্ট। মাতামহ এই মুহূর্তে খুবই মনের মানুষ। মোহনভোগ বস্তুটিতে বাবা সিদ্ধিলাভ করেছেন। বড়ে গোলাম আলি যেমন মালকোষ রাগে। সুজি শুকনো কড়ায় কতক্ষণ নাড়তে হবে, কখন, কতটা ঘি দিতে হবে, প্লাস্টারের মশলার যেমন ভাগ আছে, এতটা বালিতে এতটা সিমেন্ট, সেইরকম চার কাপ সুজিতে এক কাপ চিনি, ফোর ইজ টু ওয়ান। জলের মাপ আরও সাংঘাতিক, একটু এদিক-ওদিক হলেই মোহনভোগ হয়ে যাবে লেই। মোগলাই ব্যাপার। ময়ূর সিংহাসনে বসে বাদশাহরা খেতেন সুর্মা-টানা চোখে।
পিতাঠাকুর মহোৎসাহে বললেন, হলেই হয়। আজই হতে পারে। রাতে আমার মনে হয় রোগীর পথ্য হবে গাওয়া ঘিয়ে ভাজা চারখানা লুচি আর একটু নুন। কী বলেন ডাক্তারবাবু?
ডাক্তারবাবু বললেন, হতে পারে, তবে রুগিকে তো এখনও ঠিকমতো দেখাই হল না।
আমি মনে মনে বলছি, হে ডাক্তারবাবু, বাগড়া দেবেন না। দাদু বললেন, এর আর অত দেখার কী আছে! ইয়ংম্যান পেটটা একটু ছেড়েছে। তা ছাড়ক না। এক ডোজ অ্যাকোনাইট থ্রি এক্স দিলেই তো মিটে যায়।
