মাতামহ অনেকটা টর্পেডোর ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকে পড়ে জামাইয়ের দিকে এগিয়ে এলেন। ধরাধরা গলায় বললেন, হরিশঙ্কর, আমার এই জিভ, আমার এই নোলায় একটু হেঁকা দিতে পারো! সামনে জিভ ঝুলছে লকলক করে।
পিতা বললেন, ওটাকে আপনি ভেতরে গুটিয়ে রাখুন। হেঁকা দেবার ব্যবস্থা আমি করছি। তার আগে হিসেবটা লিখে নিই।
দাদু চেয়ারে বসে গান ধরলেন, এখনও কি ব্রহ্মময়ী, হয়নি মা তোর মনের মতো।
পিতা ক্যাশবাক্স খুলে সেই বিখ্যাত হিসেবের খাতাটি খুললেন। যার পাতায় পাতায় প্রতিদিনের হিসেব লেখা। পাইপয়সার এদিক-ওদিক হবার উপায় নেই। প্রতিদিনের হিসেব মেলাতে গিয়ে একটি কথা লিখতেই হবে, শর্ট, এত পয়সা। পাশে একটি জিজ্ঞাসার চিহ্ন। বড়ই সন্দেহ। কেন শর্ট? কে মেরেছে? আমি নয় তো! মিথ্যে বলব না, দু-এক দিন মেরেছি। বেশ নরম করে ভাজা বোকাদার দোকানের ডিমের ওমলেট বড়ই সুস্বাদু! মনের ওপর এখনও যে তেমন সংযম আসেনি। একটু-আধটু এদিকে-সেদিকে পা ফেলে। কিন্তু সে তো মাঝেমধ্যে। তা হলে রোজ শর্ট হয় কী করে! কে জানে? এদিকে শুনি হিসেবের কড়ি বাঘে খায় না।
ডাক্তারবাবুকে দু’টাকা ভিজিট দিয়েছেন। সকালে নর্দমা সাফ করার লোক এসেছিল, তাকে এক সিকি। ভিখিরি এসেছিল, দু’পয়সা। ওয়েস্ট নট ওয়ান্ট নট। চুলচেরা ব্যাপার। আমি যদি সত্যি বুদ্ধদেব হতুম, তা হলে কবে বোধিবৃক্ষের তলায় গিয়ে বসতুম। রোজ এইসব ছোটখাটো অপমান। বাজার থেকে পয়সা মেরেছি। অসুখে পড়ে ডাক্তার খরচ করিয়েছি। অহংকারে লাগে। আবার মহাপুরুষরা বলছেন, অহংকার কী রে ব্যাটা!
পাঁড়ে ন করসী বাদ-বিবাদঁ। যা দেহী বিন সবদ না স্বাদঁ
অণ্ড ব্রহ্মাণ্ড খণ্ড ভি মাটি। মাটি নবনিধি কায়া।
আরে পাঁড়েজি তর্কাতর্কি মাত করো। এই দেহে শব্দ নেই, স্বাদ নেই, স্রেফ মাটি রে ভাই। অণ্ড, ব্ৰহ্মাণ্ড, খণ্ড সবই মাটি। ওই যে আমার পিতৃদেব টাকা টাকা করছেন, ওঁর কানের কাছে আমি যদি নাকি সুরে দু’কলি গেয়ে উঠি;
মন রে রতন কাগজ কা পুতলা।
লাগে ঝুঁদ বিনসি জাই ছিল মৈ গরব করৈ ক্যা ইতনা ॥
মন রে, ধনরত্ন সব কাগজের খেলনা। বুদবুদ এই উঠছে এই মিলিয়ে যাচ্ছে। এত গর্ব কীসের!
আর কিছু না পারি বেশ দু-চারটে শ্লোক, দোহা টোহা মুখস্থ করে, পিপুল-পাকা অবস্থায় পৌঁছে গেছি। নাকে রসকলি করে সামনে পুঁথি খুলে কথকতায় বসলেই হয়। গলায় গাঁদাফুলের মালা, সামনে মরা, আধমরা, বড়ি খোঁপা, পানদোক্তা-খাওয়া হরেক মেজাজের একপাল বিধবা।
মাতামহ বেশ তারিফের গলায় বললেন, বড় ভাল অভ্যাস হরিশঙ্কর! মরো আর বাঁচো রোজ হিসেবটি লিখে যাবে। নিজেকে সংযত রাখার এর চেয়ে ভাল রাস্তা আর কিছুই নেই। ওড়ার আগেই ডানাটি কেটে ফেলল। খাতার দিকে তাকাও আর শামুকের মতো গুটিয়ে যাও। মহাত্মা গান্ধী শুনেছি। রোজ হিসেব লিখতেন। সাধে স্বাধীনতা আনতে পেরেছিলেন! ইংরেজ বললে, বাবা, বড় সাংঘাতিক লোক। কাপড় হাঁটুর উপর তুলেছে। আরও ওপরে তোলার আগেই সরে পড়ো।
আপনার সব ভাল, মাঝেমধ্যে এই যে একটু গ্রাম্য হয়ে পড়েন, তখনই পিত্তি চটে যায়। হচ্ছে হিসেবের কথা, চলে গেলেন মহাত্মা গান্ধীতে। উত্তর পশ্চিম জ্ঞানের বড়ই অভাব।
তুমি ঠিক বলেছ হরিশঙ্কর। আমার মুখটা একটু আলগা। এক-একটা কথা ফস করে মুখ দিয়ে যেই বেরোয়, চমকে চমকে উঠি। রিভলভারের গুলির মত বেরোবার সময় ধাক্কা দিয়ে যায়। তখন নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করি, ওরে তোর মুখ না পেছন? অ্যাই, অ্যাই দেখো, যেই বললুম অমনি ধাক্কা খেলুম। উপমাটা তেমন সুবিধের হল না। মুখকে যার সঙ্গে তুলনা করলুম, সে জায়গাটা খুব সভ্য নয়।
কে আপনাকে ব্যাখ্যা করতে বলেছে?
কেউ বলেনি। তোমাকে দেখালুম আমি একেবারে গবেট নই। বোধবুদ্ধি আছে, কেবল অভ্যাসটা নেই। ঢলকো ছিপির মতো! কী, রাগ করছ নাকি? রেগে গেলে তোমার আবার জ্ঞান থাকে না। ভুলেই যাবে, আমি তোমার শ্বশুরমশাই। এখুনি বলবে, আপনি তা হলে আসুন। আমার লুচি-হালুয়া বন্ধ হয়ে যাবে। বেটির সামনে আসনে মন আর কিছুতেই স্থির হবে না। হরু পাগলের মতো গাইতে হবে,
থেকে থেকে যেন মাগো লুচির গন্ধ পাই
কোথা তোর রাঙা চরণ, ভাসছে চোখে মণ্ডামেঠাই।
থেকে থেকে যেন মাগো লুচির গন্ধ পাই।
খাতা ক্যাশবাক্সের মধ্যে ঢুকে পড়ল। চাবিটি লাগাতে ভুল হল না। দাদুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আহারাদি তা হলে আজ এখানেই হোক।
গান থেমে গেল। লাজুক লাজুক মুখে বললেন, স্বপাকে ভাতেভাত খাই, এ তো অতি উত্তম প্রস্তাব। ওরে কাঙাল ভাত খাবি? না, হাত ধুয়ে বসে আছি। তা, কী কী পদ হবে হরিশঙ্কর?
ধরুন খুব সরু চালের ভাত। তার ওপর পরিমাণ মতো গব্য ঘৃত।
আহা, আহা!
পালং শাক পোস্ত দিয়ে ভাজা।
বড়ি আর মুলো পড়বে?
পড়বে।
তোফা তোফা।
সোনামুগের ডাল।
বলো কী?
পাকা রুইমাছের কালিয়া।
কেয়া বাত কেয়া বাত।
একটু চাটনি আর দই।
সর্বাঙ্গসুন্দর।
কিন্তু কে করবে?
কে করবে? হ্যাঁ তাও তো বটে, কে করবে? এ তো শ্মশানভূমি। চারদিক হাহা করছে, খাঁখাঁ। তা হলে বললে কেন?
স্বপ্ন দেখালুম মুকুজ্যেমশাই। দিবা স্বপ্ন।
তা হলে কী হবে?
জগাখিচুড়ি। চালে, ডালে, লাউ উঁটায়, আলুতে, পটলে এক মহা সম্মেলন। কী, দুঃখ হচ্ছে?
কিছুমাত্র না। দুঃখু কীসের? মূলং তরোঃ কেবলমাশয়ন্তঃ, পানিদ্বয়ং ভোমামন্ত্রয়ন্ত কামিব শ্রীমপি কুৎসয়ন্তঃ, কৌপীনবন্তঃ খলু ভাগ্যবন্ত। বুঝলে হরিশঙ্কর।
