ভদ্রমহিলা বলছেন, আর বসতে পারছি না। কতক্ষণ পায়ের ভরে বসে থাকা যায়।
ভদ্রলোক দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন, নেমে এসো না সুন্দরী। কেউ তো তোমাকে মাথার দিব্যি দিয়ে টঙে উঠে বসে থাকতে বলেনি।
মহিলাও একই রকম খিঁচিয়ে উত্তর দিলেন, কোলের জিনিসগুলি না ধরলে নামা যায়?
এঁরা কারা? কোথায় চলেছেন? হঠাৎ এখানে থামলেন কেন?
ভদ্রলোক হঠাৎ ওপর দিকে তাকাতেই আমার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেল। তোবড়ানো গালে একমুখ হাসি। নিমেষে এমন ভাবান্তর ভাবা যায় না। চেঁচিয়ে বললেন, এই যে মাস্টার, ফাদার কোথায়?
ভদ্রমহিলা সেই মুহূর্তে নামার চেষ্টা করায় কোল থেকে আবার একটা কৌটো সশব্দে গড়িয়ে। পড়ল। রত্নগর্ভা শুনেছি, এমন কৌটোগর্ভা কদাচিৎ দেখা যায়।
ভদ্রলোকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। মহিলাকে দাবড়ে উঠলেন, তেরি নোলে খেলি। এ আবার কী ভাষা! আবার ওপর দিকে তাকালেন। সেই গাল-ভাঙা হাসি। মেঘ-ভাঙা রোদের মতো। ফাদার, মাস্টার কোথায়!
যাঃ উত্তেজনায় সব গুলিয়ে ফেলেছেন! ডেকে দোব?
ইয়েস, ইয়েস। ডেকে দাও। উই কাম।
ভদ্রলোকের চালচলন যেন দু’মুখো ছুরির মতো। একবার এদিকে কাটছেন, একবার ওদিকে কাটছেন। মহিলার দিকে ফিরে বললেন, নামতে পারছ না? তখনই বলেছিলুম ভীম ভবানীর মতো গতর কোরো না।
পিতা সবে বাথরুম থেকে বেরিয়েছেন। গায়ে তোয়ালে জড়ানো। পায়ের ব্যান্ডেজ জায়গায়। জায়গায় সামান্য ভিজেছে।
সস্ত্রীক এক ভদ্রলোক আপনাকে ডাকছেন।
আকৃতি?
চেহারার বর্ণনা শুনে বললেন, ও, প্রফুল্ল এসেছে। কোনও নোটিশ না দিয়েই চলে এল! বিপদে ফেললে।
তোয়ালে জড়ানো অবস্থায় জানলার সামনে গিয়ে বললেন, কী খবর প্রফুল্ল?
আমার আসার ঠিক ছিল না। হঠাৎ চলে আসতে হল।
বেশ করেছ, চলে এসো ওপরে।
আর এক খেপ মাল আসবে। নিয়ে আসি তা হলে।
যাও নিয়ে এসো।
এই স্ত্রীলোকটি রইল।
ওপরে পাঠিয়ে দাও। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক হবে না।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি একটু তদারকি করো। নীচে অনেক ঘর পড়ে আছে, সেইখানেই থাকবে। অনেক আগে একবার বলেছিল। কথার কথা। আজ দেখছি এসেই পড়েছে। নীচেটা ভূতের বাসা হয়ে আছে, এতদিনে মানুষের হাত পড়বে।
মাহেশে রথ দেখতে গিয়ে মাতামহ এক মহিলাকে দেখে বলেছিলেন, আহা! মা যেন রাবণলক্ষ্মী।
রাবণলক্ষ্মী কী জিনিস দাদু!
মালক্ষ্মী একটু স্থূলাঙ্গী হলেই যক্ষপুরীর লক্ষ্মী হয়ে যান।
প্রফুল্লবাবুর স্ত্রীকে দেখে আমার সেইরকমই মনে হল। বেশ একটা জমজমাট অস্তিত্ব। এত চওড়া পাড় শাড়ি আমি আগে দেখিনি। ঠোঁটদুটো লাল টুকটুকে। স্যানাটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে এলে মানুষের এইরকম দুধেআলতা চেহারা হয়। কী মানুষের কী স্ত্রী। প্রবীণা মহিলা হলে বলতেন বাঁদরের গলায় চাঁদমালা।
একগাদা জিনিসপত্রের মাঝে মহিলা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।
আপনি ওপরে চলুন।
বড় বড় চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, আমাকে যে এখানেই দাঁড়াতে বলে গেল।
তাতে কী হয়েছে।
এসে দেখতে না পেলে কুরুক্ষেত্র করবে। আমি বরং এই রকটায় বসি।
একটা ছাগল এসে বড়ি খাচ্ছিল বেশ তারিয়ে তারিয়ে, চোখ বুজিয়ে। হু হু করে মাঝেমধ্যে শব্দ ছাড়ছিল। হঠাৎ তিড়বিড় করে লাফাতে শুরু করল।
মহিলা বললেন, ঝাল লেগেছে। এর নাম পাঞ্জাবি বড়ি। কত কষ্ট করে দিয়েছিলুম। সব রাস্তায় পড়ে গেল। সব ব্যাপারে এত হকপাক করে।
রকে বসে পড়লেন। চারপাশ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। আমাদের নীচেটা যেন যক্ষপুরী। এখানে বসবাস করবেন কী করে! অন্ধকার সঁতসেঁতে।
মহিলা বললেন, সারাটা দিন চলে যাবে এইসব পোষ্কারঝোষ্কার করতে। কী হয়ে আছে! মেয়েদের হাত না পড়লে বাড়ির লক্ষ্মীশ্রী ফেরে না।
ছাগলটা আবার বড়ি খেতে শুরু করেছে। ঘাসপাতা খাওয়া মুখে নতুন ধরনের স্বাদ। ছাগলের কখনও পেট খারাপ হয় না। এমন লিভার, যাই খাক না কেন, সেই ছাগলনাদি।
বাকি মালপত্র নিয়ে প্রফুল্লবাবু এসে পড়লেন। তিন ভাগ পাকা, এক ভাগ কঁচা চুল, টান টান করে পেছনে ওলটানো মুখে একটা সিগারেট। কথা বললেই পিড়িক পিড়িক করে নাচছে।
পিতা চাবির গোছা নিয়ে নীচে নেমে এলেন, খুব সাবধানে, ধীরে ধরে ধরে। প্রফুল্লবাবু বললেন, জুতো মেরে চলে এলুম।
সেকী, মামাকে কেউ জুতো মারে?
জুতো মারার কাজ করলে জুতোই মারতে হবে। ফুল গেঁদুয়া নয়। নাও নাও, প্রণাম করো। ব্রাহ্মণ মানুষ। একী তোমার পায়ে আবার কী হল?
চোট লেগেছে।
তা হলে নেমে এলে কেন? ব্যাটাচ্ছেলে আমার তবলাটা দুম করে রাস্তায় ফেলে দিলে। দেখি একবার, ঘাটফাট সব ঠিক আছে কি না!
রকে বিড়ে সমেত তবলা বসিয়ে টাই করে একটা চাটি মেরে কিছু কুচো বোল ছাড়লেন। যেন চকমকি খেলে গেল। দেখতে যেমনই হোক গুণী মানুষ।
পিতা বললেন, আহা আহা, একটা হাত করেছ বটে প্রফুল্ল। ঘুরিয়ে এনে তেহাইয়ে ফেলো।
প্রফুল্লবাবু তিনটে তেহাই মেরে ডান হাতটা আকাশের দিকে তুলে দিলেন। শ্রীমতী প্রফুল্ল মাথায় ঘোমটা টেনে কলাবউয়ের মতো একপাশে দাঁড়িয়ে।
মুখোমুখি দুটো ঘর খোলা হল। একটা বেশ বড়, আর একটা একটু ছোট। ছোট ঘরটা ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। দিনের বেলাতেই চোখ চলে না। প্রফুল্লবাবু ঘর দেখে বললেন, বাঃ বাঃ বেশ হবে, একটা শোবার, একটা রাধার। নাও হে লেগে পড়ো। পারবে তো সব গোছগাছ করতে!
