আজ্ঞে না।
সবেতেই তোমার না। কী জানো হে তুমি? পাপ পুরুষের ছবি দেখেছ? দেখোনি? তান্ত্রিক সন্ধ্যোপাসনায় আছে। শিরে ব্রহ্মহত্যার চিন্তা, বাহুতে চৌর্যবৃত্তি, হাত নিসপিস করছে, কী করে মেরে নোব। আর কটিদ্বয়। সবচেয়ে মারাত্মক স্থান। ব্যভিচারের উৎস। হোয়াট ইজ লিবিডো?
আজ্ঞে, আমি যে ওসব কিছুই জানি না।
তোমার মুখ দেখলে আমার মায়া হয়। দিস ওয়ার্লড ইজ নট ইয়োর প্লেস, মাই ডিয়ার সান। তোমার জন্যে চাই কিং আর্থারের আইল্যান্ড ভ্যালি অফ অ্যাভালন। মৃত্যুর পর যে-দ্বীপে গিয়ে তিনি আর ফেরেননি।
Where falls not hail/or rain/or any snow/
nor ever blows wind loudly/but it lies.
Deep meadowed/fair with orchard lawns.
কোথায় পাবে তুমি সেই সুখের দ্বীপ। পৃথিবী বড় কঠিন জায়গা। তাই তো জন্মের মুহূর্তে আমরা ককিয়ে কেঁদে উঠি। মাই প্যারাডাইস ইজ লস্ট। যদি মেয়ে হও পুরুষের লালসার জেলিতে আযৌবন বগবগ করবে। যেই বার্ধক্য হল, চলে গেলে আঁস্তাকুড়ে। যদি ছেলে হও, তোমাকে ক্রীতদাস বানাবার জন্যে জগৎ চাবুক হাতে তেড়ে আসবে। ক্ষমতাশালী বলবে, নে ব্যাটা আমার পদলেহন কর। দুর্বলও তোমাকে ছাড়বে না। মাছির মতো ভনভন করবে চারপাশে। ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, উপহাসের ছিটে মেরে উত্যক্ত করবে। সো, হাউ টু লিভ? তেড়ে ওঠো। বৈষ্ণব নয়, শাক্তের শক্ত হুংকার,
My good blade carves the casques of men/
My tough lance thrusteth sure/
My strength is the strength of ten/
Because my heart is pure.
আপনি এইসব বলছেন? প্রেম বলে কি কিছু নেই? আমাদের বন্ধু বলে কি কিছু নেই? এমন সাংঘাতিক নিষ্করুণ পৃথিবী আমার কল্পনায় আসে না।
পৃথিবীতে তুমি করুণা খুঁজতে এসেছ? মাই ডিয়ার ফুল। ওই বইটা নিয়ে এসো। থার্ড ফ্রম দি লেফট। হ্যাঁ হ্যাঁ ওইটা। গিরীন্দ্রশেখর বসুর স্বপ্ন। দাও। হিয়ার ইট ইজ। নাও পড়ে দেখো। গল্পের বই কবিতার বই না পড়ে মাঝে মাঝে এইসব বই পড়ে দেখতে পারো। নিজেকে জানতে পারবে। মানুষকে জানতে পারবে।
বইটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সামান্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাথরুমের দিকে চলে গেলেন। ভোর হতে-না-হতেই কী অশান্তি! পেনসিলে সূক্ষ্ম দাগ দেওয়া অংশটা পড়ে দেখতেই হচ্ছে। এরপরেই যে প্রশ্ন হবে, উত্তর না দিতে পারলেই তো মাই ডিয়ার ইডিয়েট। ‘পরকে মারিব, এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইচ্ছা, নিজে মার খাওয়া।’ পাশে মুক্তাক্ষরে নোট, পাতা ৮৩, চিহ্নিত অংশ। ‘কামবৃত্তির বিকাশ কোনও একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ নহে। কামগন্ধহীন পবিত্র প্রেমও সেই আদি কামভাবেরই রূপান্তর নহে। সেইরূপ, সখিত্ব বন্ধুত্ব ইত্যাদির মূলেও কামগন্ধ রহিয়াছে।’ পরের চিহ্নিত অংশ, ‘দুইটি বিরুদ্ধ ভাবের মধ্যে একটি রুদ্ধ ইচ্ছারূপে মনের মধ্যে থাকিয়া যায়। পুরুষের নিপীড়িত হইবার ইচ্ছা, স্ত্রীলোকের নিপীড়নের ইচ্ছা, পুরুষের রূপ দেখাইবার ইচ্ছা ও স্ত্রীলোকের রূপ দেখিবার ইচ্ছা অজ্ঞাতভাবে মনের মধ্যে থাকে। পরের অধীনে চাকরি করিবার ইচ্ছা পুরুষের নিপীড়িত হইবার ইচ্ছার রূপান্তর মাত্র।‘ পাশে খুদে অক্ষরে সংস্কৃত দু’ছত্র, কামস্তদগ্রে সমবৰ্ত্ততাধি। মনসো রেতঃ প্রথমং যদাসীৎ ॥ বিশ্বজগৎ কামনা হইতে উৎপন্ন হইয়াছে।
বাথরুমে স্নানের শব্দ। সর্বনাশ, জ্বরের রুগি স্নান করছেন।
চান করছেন নাকি?
ঝরনা যেন উত্তর দিল, কেন, আপত্তি আছে?
আপনার জ্বর, পা ক্ষতবিক্ষত, চান করছেন কী?
একে বলে হাইড্রোথেরাপি। শরীরের গরম বার করে দিচ্ছি। ভয় পাবার কিছুই নেই। মোটরগাড়ি দেখেছ?
দেখিছি।
র্যাডিয়েটার কাকে বলে জানো?
জানি।
জল ঢেলে ইঞ্জিনকে ঠান্ডা রাখতে হয়। প্লিজ ডোন্ট ডিস্টার্ব।
তোড়ে জল পড়তে শুরু করল। কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সামনের রাস্তায় হুড়মুড় করে একগাদা টিনের কৌটো পড়ার শব্দ হল। তিরিক্ষি গলায় কে যেন বললেন, যাঃ শালা।
পরমুহূর্তেই হুড়মুড় করে আর একটা শব্দ হল। শব্দের পরেই নারীকণ্ঠ, লাথি মারছ কেন?
পুরুষকণ্ঠ, না লাথি মারবে না, নাতজামাইকে আদর করবে!
কথা শেষ হতে না-হতেই আবার শব্দ। একটা ঢোল গড়িয়ে পড়লে যেরকম শব্দ হতে পারে সেইরকম। পুরুষকণ্ঠ গর্জন করে উঠল, মারেগা শালা এক থাপ্পড়।
হামারা কেয়া কসুর?
একটা চড় মারার শব্দ। নারীকণ্ঠ, শুধু শুধু লোকটাকে মারছ কেন?
না মারবে না, দাড়ি ধরে চুমু খাবে!
কী হচ্ছে কী? জানলার ধারে গিয়ে দেখতে হচ্ছে। বাড়ির সামনে একটা টানা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। চুল-ওলটানো খেকুরে চেহারার এক ভদ্রলোক। গায়ে লেসের কাজ করা পাঞ্জাবি। হাতায় মিহি গিলে। ভদ্রলোক খুব হম্বিতম্বি করছেন। বুড়োটে রিকশাঅলা গামছা নেড়ে নেড়ে বলছে, কাহে হাত উঠায়া, কাহে হাত উঠায়া?
ভদ্রলোক তিড়বিড় তিড়বিড় করতে করতে বলছেন, তুম হামারা সর্বনাশ কর দিয়া। রিকশায় এক ভদ্রমহিলা কোনওরকমে বসে আছেন। বেশ স্বাস্থ্যবতী। তাজা টেপারির মতো দেখতে। কোলের ওপর একগাদা জিনিসপত্র। রাস্তায় গোটাকতক টিনের কৌটো গুরুর সামনে ভক্তের মতো গড়াগড়ি যাচ্ছে। একটা বড় কৌটো ভেতরের মাল ছেড়েছে। একগাদা বড়ি ছত্রাকার হয়ে পড়ে আছে। একটা তবলা একপাশে ডিগবাজি খেয়েছে।
