মানসবাবু দরজার সামনে। কুকুর চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের ভেতরে। এই যে হরিশঙ্কর, উঠেছ?
কুকুর সেই এক প্রশ্ন নিজের ভাষায় রিপিট করল। মশারিটা আঁচড়াবার খুব ইচ্ছে। বকলশে টান পড়ছে বলে তেমন সুবিধে করতে পারছে না।
পিতা বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমি কীরকম গুড স্যামারিটান দেখো, ভোর না-হতেই তোমার খবর নিতে এসেছি। দু’দিন মেয়ের বাড়িতে ছিলুম। জামাই নতুন গাড়ি কিনেছে। বুড়োকে খুব ক’দিন ঘোরালে। কাল রাতে তুমি গাড়ির শব্দ শোনোনি?
অতটা খেয়াল করিনি।
রাত ন’টার সময় জামাইয়ের গাড়িতেই তো ফিরলুম। আজ সকালের প্লেনে দিল্লি যাবে। ওই করে বেড়াচ্ছে বুঝলে? কদিন আর কলকাতায় থাকে? হিল্লিদিল্লি করেই জীবন কাটালে। আর উপায় কী বলো? অত বড় ইঞ্জিনিয়ার ভারতে ক’জন আর আছে। হাতে গোনা যায়। অ্যাঁ, কী বললে!
কুকুরের ডাকের পাংচুয়েশনে কথা চলেছে। কমা ফুলস্টপের গোলমালে শ্রোতারা তেমন মর্মোদ্ধার করতে পারছেন না। পিতা ছোট্ট একটি হাই তুলেছিলেন।
কই না, কিছু বলিনি তো?
মানসবাবু আদুরে গলায় কুকুরকে ধমক লাগালেন, যেন বক্তার স্ত্রীকে থামাতে চাইছেন, আঃ, বিউটি, চুপ করো না। ও তো আমাদের হরিশঙ্কর। ওকে অত ঘেউ ঘেউ করার কী আছে। ও, মাথায় মুড়ি দিয়ে বসে আছে বলে তোমার অপছন্দ হচ্ছে। কী কুকুরই হয়েছ তুমি? একেবারে সায়েব বাসা! অ্যাঁ, কী বললে?
আজ্ঞে, না, কিছু বলিনি তো?
শুনলুম, তুমি নাকি নারীঘটিত ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছ!
আজ্ঞে হ্যাঁ।
সে-এ-এ, কীই-ই? আমরা যে বলতুম, চরিত্র দেখতে চাও তো হরিশঙ্করের চরিত্র? সেই চরিত্রে তা হলে স্পট পড়ে গেল?
আজ্ঞে হ্যাঁ। স্পটেড ডিয়ার।
অ্যাঁ, কী বললে?
ছিলুম বাঘ, এখন হয়েছি গুলবাঘ।
হ্যাঁ, চরিত্র ঠিক রাখা বড় কঠিন ব্যাপার! মুনি ঋষিদের জীবনটাই দেখো না। বিন্ধ্যাচল থেকে হিমালয় থেকে সাধন ভজন করে ঊর্ধরেতা হয়ে সমতলে নেমে এলেন। জেলেনি জাল ফেলছে জলে। ব্যস হয়ে গেল। খেল খতম, পয়সা হজম। বউমা মারা যাবার পর তোমাকে আমি। বলেছিলুম, বারবার বলেছিলুম, আমার একটি বয়স্কা শালি আছে। গুণে তার তুলনা নেই। রূপেই যা একটু গড়বড়ে। মুখে একটু পক্সের দাগ। তুমি কিছুতেই দার পরিগ্রহে রাজি হলে না। বয়েস তোমার এখনও যায়নি হরিশঙ্কর। বলো তো রাস্তা ওপেন আছে।
উচ্ছিষ্টে আমার রুচি নেই।
অ্যাঁ, কী বললে?
আজ্ঞে, উচ্ছিষ্টে অরুচি।
তার মানে?
আপনার স্ত্রীর আত্মহত্যা।
আত্মহত্যা! সে তো স্টোভ ফেটে মারা গেল।
আপনি তাই বলেন, আপনার গুড স্যামারিটানরা তা বলে না। তারা একটু অন্যরকম গন্ধ পায়।
ডিফ্যামেসান কেস করব।
সময় পেরিয়ে গেছে।
তুমি ছোটলোক, ইতর।
মানুষ সম্পর্কে মানুষের ধারণা মেলে না। ওপিনিয়ান ডিফারস।
আমি কিন্তু তোমার শত্রু হয়ে রইলুম। সুযোগ পেলেই এর শোধ নোব।
এই যে একটু আগে বললেন, আপনি আমার গুড স্যামারিটান।
আমি উইথড্র করছি।
দেন ইউ ক্যান সেফলি ক্লিয়ার আউট। ডোন্ট পোক ইয়োর আগলি নোজ ইন মাই অ্যাফেয়ারস।
তোমার বাঁশ তৈরি হচ্ছে, হরি।
বাঁশ আমি খুলতে জানি। বাঁশঝাড়ের দেশের মানুষ আমি। বাঁশ দিতেও জানি, বাঁশ খুলতেও জানি। দেখা যাক আপনার বংশ কোন জাতের।
মানসবাবু কুকরটাকে কোলে তুলে নিলেন। ঘেউ ঘেউ কিছুতেই থামেনি। বাচ্চা-কোলে সিনেমা দেখতে এসেছিলেন কোনও মা। কান্না যেন আর থামে না। আঁচল সরিয়ে অন্ধকারে স্তন্যপান করাও। তবে যদি শান্ত হয়। মানসবাবুর তো স্তন নেই। গোঁফ আছে বিরাট।
সিঁড়ির একটা ধাপ নেমে বললেন, মনে থাকে যেন!
আজ্ঞে হ্যাঁ, থাকবে।
শুভানুধ্যায়ীকে শত্রু করলে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, ক্যামোফ্লেজ আর রইল না। যুদ্ধ সহজ হবে। আপনার সেই ভাইয়ের কী হল? মকর্দমা মিটেছে?
দ্যাটস নান অফ ইয়োর বিজনেস।
আমারও ওই একই উত্তর, তবে ইংরেজিতে নয়, বাংলায়–নিজের চরকায় তেল দিন।
মানসবাবু সরে পড়লেন। পিতা মশারি ঠেলে বেরিয়ে এলেন। গতকাল দাড়ি কামানো হয়নি। কদমফুল ক্ষীরে পড়ে গেলে যেরকম চেহারা হয়, মুখের চেহারা সেইরকম। আমাকে বললেন, কী বুঝলে?
খুব খারাপ।
খারাপ? খারাপ কেন?
ক্রমশই শত্রু বাড়ছে।
তুমি কি এতকাল সব বন্ধু ভাবতে? ইও আর এ ফুল। মানুষ কখনও বন্ধু হয়? বিশেষত প্রতিবেশী। ভাল হল, ভাল। খোঁচা মারলেই সরীসৃপের জাত বেরিয়ে পড়ে। জাত চেনা হয়ে গেলে নাড়াচাড়া করতে আর অসুবিধে হয় না। জেনে রাখো, তুমি এবং তুমিই। বুঝলে কিছু?
আজ্ঞে না।
এক দিকে তুমি, আর এক দিকে তোমার জগৎ। চালিয়ে যাও লড়াই। শক্তি থাকে জিতবে, নয়তো হেরে ভূত হয়ে যাবে।
মানুষকে শুধু শুধু চটিয়ে লাভ কী?
মানুষ? মানুষ নামক জন্তুকে তুমি কতটুকু চেনো? প্রায় হাফ এ সেঞ্চুরি ধরে আমি মানুষকে দেখছি। মানুষের মতো নিষ্ঠুর, পরশ্রীকাতর, নীচ, স্কিমিং, ক্যালকুলেটিং প্রাণী পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় পাবে না। তুমি তো এখন যুবক?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তোমার সব গ্ল্যান্ডসই এখন ফুল সিক্রিশনে। হরমোন, থাইরয়েড, পিটুইটারি। তোমার জানা উচিত সাবকনশাস কীভাবে কনশাসে উঠে আসে। মানুষ কোন উৎস থেকে তার আচার আচরণের নির্দেশ পায়, মন কাকে বলে, তার কতটা সাব-মার্জড কতটা ফ্লোটিং, এ বিষয়ে তোমার কোনও পড়াশোনা আছে?
আজ্ঞে না।
ব্রাহ্মণের ছেলে। পইতে হয়েছে! ত্রিসন্ধ্যা করো। ভূতশুদ্ধি কাকে বলে জানো?
