বলেছেন ভাল, মৎস্য ধরিবে, খাইবে সুখে। ইনশিয়োরেন্স একটা লাইন হল?
কেন? আমাদের ভবেশকে দেখো। কী থেকে কী হয়েছে!
অক্ষয়বাবু বললেন, আমার অ্যাস্ট্রোলজি যদি ঠিক হয়, তা হলে এ ছেলে ফাইন আর্টসের লাইনে যাবেই। কেউ ঠেকাতে পারবে না। অভাব হবে না, তবে চোট খাবে।
চোট খাবে মানে?
সে আমি পরে আপনাকে বলব। সাদা কাগজে একফোঁটা কালি।
আই সি, আই সি, তুমি কী মিন করছ বুঝতে পেরেছি।
আমি আজ উঠি হরিদা। অক্ষয়বাবু উঠে পড়লেন।
কবে পা সামলে অফিসে বেরোতে পারব জানি না। পারলে একবার এসো।
অক্ষয়বাবু সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করলেন, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, হরিদা, গোটাকয়েক টাকা দিতে পারবেন! পকেট একেবারে খালি।
একেবারে খালি! মাতামহ যেন বেশ আনন্দ পেলেন।
পিতা চশমার খাপ থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে আমাকে বললেন, এই নাও দিয়ে দাও। এতে হবে তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব হবে। আমি আপনাকে মাস কাবারে শোধ করে দোব।
সে দেখা যাবে। তুমি আপাতত কাজ চালাও।
অক্ষয়বাবু সিঁড়ির কাছাকাছি গেছেন, হঠাৎ বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কে একজন জড়ানো জড়ানো গলায় চিৎকার করে উঠল, শালা হরিশঙ্কর, তুমি বড় বাড় বেড়েছ। তোমার বাপের নাম আমি ভুলিয়ে দোব।
পিতা তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে, টাল সামলাতে না পেরে আবার চেয়ারেই বসে পড়ে বললেন, এ ব্লাডিবাগারটা আবার কে?
আমরা তিনজনে জানলায় হুমড়ি খেয়ে পড়লুম। অক্ষয়বাবু বললেন, লোকটা কে? চেনা?
হ্যাঁ, জবার কাকা। জবা বলে একটা মেয়ে, তারই কাকা।
মাতামহ বললেন, ব্যাটা মদ খেয়েছে।
অক্ষয়বাবু বললেন, হরিদাকে গালাগাল দিচ্ছে।
জানলায় তিনটে মুখ দেখে বীরত্ব খুব বেড়ে গেল। পা টলছে, হাত ছুঁড়ে বললে, নেমে আয় শালা।
মাতামহ হুংকার ছেড়ে বললেন, ব্যাটাচ্ছেলে, নামলে যে তোর পুঁটকি প্যাক হয়ে যাবে।
জরার কাকা বেসামাল পায়ে নাচতে নাচতে বললে, নেমে আয় শালা পেঁড়িদারের দল।
মাতামহ অসহায় মুখে পিতার দিকে তাকালেন, কী করব হরিশঙ্কর? ঝেড়ে আসব এক লাথি?
অক্ষয়বাবু বললেন, আপনাকেই তো বলছে মনে হয়, একটা ধোপার আছাড় মেরে আসব?
তথাগতের মতো হাত তুলে পিতা বললেন, ভায়োলেন্স বিগেটস ভায়োলেন্স, খিস্তি বিগেটস খিস্তি। তুমি শুধু যাবার সময় একটা টুসকি মেরে খানায় শুইয়ে দাও। মাতালস্য কর্দম গতি।
১.১৮ My good blade carves the casques of men
সারারাত জ্বরের ঘোরে পিতা বলতে লাগলেন, তুমি এসেছ? তুমি এসেছ?
আমি তো পাশেই বসে আছি। কী করব কিছুই জানি না। ডাক্তারবাবুকেও ডাকা হল না। গল্পে গল্পে রাত বেড়ে বসে রইল। রাত অনেকটা সরীসৃপের মতো। ক্রমশ বড় হতে হতে বড় হতে হতে, ভোরের দিকে অন্ধকারের ন্যাজটি টেনে নেয়।
তুমি এসেছ বলায় প্রথমে ভেবেছিলুম, আমাকেই বলছেন বোধহয়। আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি এসেছি। পিতা বললেন, একটু দাঁড়াও, আমিও আসছি।
তখনই বুঝলুম, এ তুমি আমি নই, অন্য কেউ। জ্বর বাড়লে জলপট্টি লাগায়। সে চেষ্টাও করে দেখলুম। এমন হাতের ঝাঁপটা মারলেন, জলের বাটি উলটে বিছানার চাদর ভিজে গেল। চাঁদরের তলায় পাট পাট খবরের কাগজ ঢুকিয়েছি।
শব্দহীন মধ্যরাত। ঘড়ির পদধ্বনি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। সময়ের সান্ত্রি যেন কয়েদের বাইরে পায়চারি করছে। ফঁসির আসামি শেষ রাত জাগছে। পরমায়ু থেকে একটি দিন না নিয়ে সে যাবে না। ভোরের শমীবৃক্ষে দিনের প্রাণদণ্ড। সায়েব হলে ইংরেজিতে কবিতা লিখতুম, এভরি মর্নিং এ ডে ইজ হ্যাঁঙ্গড। মিনিট গলে যাচ্ছে ঘণ্টায়, ঘণ্টা চুঁইয়ে পড়ছে দিনে। দিন যায়, আর আসে না।
ভোরের আকাশ কতদিন দেখিনি! কে যেন সিঁদুর ঢেলে দিয়েছে। রুগি এখন শান্ত। পৃথিবীর যত কিছু বাড়াবাড়ি সবই যেন মধ্যরাতে। খুনির খুন, চোরের চুরি, সাধকের ঈশ্বর দর্শন, রুগির রোগ, সবই যেন তুঙ্গে আরোহণ করে বসে থাকে। শুনেছি আত্মহত্যার ইচ্ছেও প্রবল হয়ে ওঠে। পাগলের পাগলামিও বেড়ে যায়। রাতের কী মহিমা!
মানসবাবু খুরথুরে একটা কুকুরের বুকে চামড়ার ক্রস বেল্ট বেঁধে প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি। চোখ জ্বালা করছে। রাতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। মুখেচোখে ভোরের ঠান্ডা বাতাস বেশ লাগছিল। মানসবাবু হঠাৎ গোঁত করে আমাদের সদরে ঢুকে পড়ে কড়া নাড়তে শুরু করলেন। নাও বোঝো ঠ্যালা। সাতসকালেও শান্তি নেই। কুকুরটা মেয়েলি গলায় খেউ খেউ করছে।
দরজার খিল খুলতেই মানসবাবু লম্বা পা ফেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন, হরিশঙ্কর, হরিশঙ্কর।
বাবার খুব জ্বর, শেষরাতে সবে একটু ঘুমিয়েছেন।
ধমকের সুরে মানসবাবু বললেন, ঘুমিয়েছেন বলে আমি একটু খোঁজখবর করব না! তোমার আচ্ছা আবদার তো! তুমি আগে জন্মেছ, না আমি আগে জন্মেছি হে ছোকরা!
মানসবাবু আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলেন। উঠছেন আর বলছেন, ব্বাবাঃ সিঁড়ি করেছ বটে! কাশীর সিঁড়িকেও হার মানায়!
আমাকে পেছন পেছন উঠতে দেখে কুকুরটা খুব অসন্তুষ্ট হচ্ছে। ফিরে ফিরে তাকায় আর ফিনফিনে গলায় ঘেঁউ ঘেঁউ করে ওঠে। এইসময় মাতামহ থাকলে বুঝিয়ে দিতেন ঠ্যালা। বাড়িতে ডাকাত পড়ার অবস্থা। পিতা মশারির ভেতর উঠে বসেছেন। না বসে উপায় কী!
