কী মনে হয়?
মাতামহ পিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, যাও, কুলকুচো করে এসো। কতদিন বলেছি, চা খাবার পর মুখ ধোবে। দাঁত ভাল থাকবে। শেষ বয়েসেও দোলের দিন মঠ আর ফুটকড়াই খেতে পারবে।
আপনিও তো চা খেলেন?
আমি? এই দেখো! মাতামহ পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে আস্ত দু’পাটি দাঁত বের করে দেখালেন। মাতামহ যেন নিজের হাতের তালুতেই পড়ে পড়ে খিলখিল করে হাসছেন।
এই যদি আপনার অবস্থা হয় তা হলে আমার আর নিয়ম মানার প্রয়োজন নেই। পা নিয়ে নড়তে পারছি না। আতুরে নিয়ম নাস্তি।
মাতামহ আবার পূর্বপ্রসঙ্গে ফিরে গেলেন, আমার কী মনে হয় জানো, এই বাড়ির উত্তরের ওই বাগানে কোথাও একটা হাড় পোঁতা আছে।
শ্রোতারা সমস্বরে বললেন, হাড়?
হ্যাঁ, হাড়। সেই হাড়টা মাটি খুঁড়ে তুললে দেখা যাবে, সরু সরু কালো কালো লোম বেরিয়েছে।
শ্রোতারা বললেন, সে আবার কী?
মাতামহ বড় বড় চোখ করে বললেন, তোমরা এসবের কতটুকু জানো। দু’কলম ইংরেজি পড়ে সব পণ্ডিত হয়ে গেছ। নিশির ডাক শুনেছ?
ডাক শুনিনি, তবে আছে শুনেছি।
আমাদের শশাঙ্ক সাড়া দিয়ে চোখের সামনে মারা গেল। আড়াই প্রহর রাতে গুণিন এসে বাড়ির সামনে দাঁড়াল, হাতে একটা মুখ-খোলা ডাব। শশাঙ্ক, শশাঙ্ক, তিনবার ডাকল, শশাঙ্ক আছ! শশাঙ্ক ঘুমের ঘোরে উত্তর দিল, কে, যাই। ব্যস কপ করে ডাবের মুখে চাপা পড়ে গেল। শশাঙ্কর প্রাণবায়ু চলে এল ডাবের জলে। সেই জল খেয়ে বেঁচে উঠল মণি চাটুজ্জে। আজও বুড়ো বেঁচে আছে। তেজপক্ষের বউটা সংসার ছারখার করে দিলে। প্রথম পক্ষের বড় ছেলেটার সঙ্গে, সে আমি বলতে পারব না, তুমি আবার বকাবকি করবে।
বুঝতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছি। সবসময় সবকথা বলার দরকার করে না। কবিদের মতে ব্যঞ্জনায় মেরে দিতে হয়।
তা হলে দেখো, তোমার ট্রেনিংয়ে কীরকম তৈরি হয়েছি। রেলের মালবাবু থেকে কবি কালিদাস। যাক যে কথা বলছিলুম, তুমিই তো শিখিয়েছ, বেশি লাইন চেঞ্জ করা খুব খারাপ। মেন লাইন ধরে থাকতে হয়। মাঝরাতে পৃথিবীর চেহারা কীরকম দাঁড়ায় জানো? তোমার স্বপ্নের মতো। মাপার উপায় নেই, তা হলে সত্যি সত্যিই দেখতে পেতে, আকাশ অনেকটা নীচে নেমে আসে। তারাদের চোখ ড্যাবড্যাবা হয়ে ওঠে। গাছ চুল এলো করে দেয়। গর্তে আগুন জ্বলে, নদীর জল রক্তগোলা হয়ে যায়, কবরে কবরে মৃতদেহ উঠে বসে। এ সব আমার দেখা। তারাপীঠের মহাশ্মশানে বসে দেখেছি।
আপনি দেখছি, আর এক মিলটন।
ও, সেই অন্ধ মহাকবি। অন্ধ না হলে মনের চোখ খোলে না। আচ্ছা, তোমার সেই হ্যাঁমিলটন সায়েবকে মনে আছে! রোজ কলকাতা থেকে প্লেনে চেপে দিঘার সমুদ্রে চান করতে যেতেন।
আবার লাইন চেঞ্জ করছেন।
মিলটনের নাম শুনে হঠাৎ মনে পড়ল, তাই জিজ্ঞেস করলুম। এই যে তুলসী, তুলসী আমার মেয়ে, তুলসী কেন মারা গেল?
পিতা বললেন, ওসব অসুখের এখনও কোনও চিকিৎসা বেরোয়নি।
ও তোমাদের কথা। আমি জানি, তুলসী কেন মারা গেল। মনে আছে, ওর তারে-মেলা শাড়ির আঁচলের খানিকটা কেটে নিয়ে গেল। তোমরা সন্দেহ করলে হাবুর মাকে। তুলসী আর ভাল হল না। হাবুর বউ কিন্তু এখনও বেঁচে আছে। দশ-দশটা ছেলেমেয়ে, এই গতর। মাছের ভেড়ি করে হাবু এখন ধনকুবের। লোকে বলে বেড়াচ্ছে, বিধান রায় মন্ত্রী হবার জন্যে ডেকে পাঠিয়েছেন। তার আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই। হাবুকে ডেকে পাঠাবেন। বাংলাদেশে যেন মানুষের অভাব।
লৌকিক জগৎটাকে আগে ভাল করে জানি, তারপর সময় থাকলে অলৌকিক নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে।
পিতার কথায় মাতামহ কেমন যেন মিইয়ে গেলেন। অক্ষয়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার নাতির হাতটা একবার দেখো না। বেশ বড়টড় একটা কিছু হতে পারবে কি না?
ওর হাত আমি দেখেছি। হরিদা অ্যালাউ করবেন না, তা না হলে ও খুব ভাল নাচিয়ে হতে পারত। ড্যান্সার।
মাতামহ বড় আনন্দ পেলেন, অ্যাঁ, বলো কী? উদয়শঙ্কর! কালই তা হলে নিয়ে যাই।
পিতা বললেন, কোথায়?
কেন? উদয়শঙ্করের আখড়ায়।
থাক, নাচিয়ে করে আর কাজ নেই। ছেলেরা হিলহিল করে মেয়েদের মতো পাছা দুলিয়ে দুলিয়ে নাচবে ভাবলেও কেমন যেন গা ঘিনঘিন করে।
এ তুমি কী বলছ? উদয়শঙ্করের নটরাজ নৃত্য দেখেছ!
উদয়শঙ্কর একটাই হয়, একশোটা হয় না। প্রতিভার ডুপ্লিকেট নেই।
অক্ষয়বাবু বললেন, আমাদের অফিসে একটা পোস্ট খালি হয়েছে। আপনি একবার বললেই ওর একটা চাকরি হয়ে যায়। ভাল ফিউচার।
একই অফিসে বাপ-ছেলে। মাপ করো রাজা। ওকে আমি সম্বলপুর পাঠাব।
সম্বলপুর? সেখানে কী করবে? হাতিখেদা? মাতামহ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।
সেখানে আমার বন্ধু অমল আছে। বিড়ির পাতার ব্যাবসা করবে। একেবারে নিউ লাইন। অমলের মেয়েটি পরমাসুন্দরী।
মাতামহ বললেন, আঃ তা হলে তো কোনও কথাই নেই। আহার ঔষধ দুই-ই হয়ে গেল।
অক্ষয়বাবু বললেন, ব্যাবসা ওর হবে না হরিদা। ভাবুক টাইপের চরিত্র। ব্যাবসার দিকে যদি পাঠাতেই চান তা হলে মিউজিক্যাল ইনমেন্ট কিংবা গন্ধ দ্রব্যের লাইনে দিন।
বাদ্যযন্ত্র। সেতার, তানপুরা, হারমোনিয়াম, ফুলুট বাঁশি। বলেছ ভাল। আবার আতর। কানে তুলো, হাতে কাঠি, চামড়ার বাক্সে ছোট ছোট শিশি। আতরওয়ালা। বলেছ ভাল।
আমি বলছি না, বলছি ওর হাত যা বলছে।
মাতামহ বললেন, আমার মতে ওকে ইনশিয়োরেন্সের লাইনে দাও। বেশ পাকা পাকা কথা বলতে পারে। ঝপঝপ ক্লায়েন্ট ধরবে আর ফেঁপে ফুলে উঠবে।
