অক্ষয়বাবু শুকনো মুখে বললেন, আপনি কি আমাকে এতদিন পরে সেই খুনি ভাবলেন নাকি? মাতামহ হেসে বললেন, কী, ভয় পেয়েছ তো!
তা একটু পেয়েছি।
দেখলে তো, ভূতের ভয় ছাড়াও, অন্য ভয় আছে। প্রতীপও নেই, পদ্মিনীও নেই। যে খুন। করেছিল, সে এখনও বেঁচে আছে চন্দননগরে। সারাগায়ে শ্বেতী। প্রতীপের প্রেতাত্মা গায়ে হাত বুলিয়ে সাদা করে দিয়েছে। পদ্মিনী পুড়ে মারা গেছে।
পরের খবর কাগজে আর বেরোয়নি। পৃথিবীর আদালত থেকে মামলা গিয়ে উঠেছিল ভগবানের আদালতে। একেই বলে, ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট।
মাতামহ বললেন, জীবনে আমি বহু পাপী দেখেছি। মানুষের আদালতে পার পেয়ে গেলেও ঈশ্বরের আদালতে অন্যভাবে সাজা পেয়েছে। আশু রেল কোম্পানির ক্যাশ ভেঙেছিল। অনেক টাকা। জেলে গেল তার অ্যাসিসটেন্ট প্রভাত। বউটা গলায় দড়ি দিলে। দিন যায়। আশুর একমাত্র ছেলে। খুব বড় ঘরে বিয়ে দিলে। ছ’মাসের মাথায় বাস অ্যাকসিডেন্টে ছেলেটা মারা গেল। দিন যায়। আশুর চোখদুটো গেল। চুরি-টাকার বাড়ি নিলাম হয়ে গেল। তাই বলি, পাপ করার আগে ঈশ্বরের কথা একবার ভেবো। সে চোখকে তো ফাঁকি দিতে পারবে না।
পিতা ব্যান্ডেজ বাঁধা পা-টা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, এই দেখুন আমার ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট।
অক্ষয়বাবু বললেন, কী ক্রাইম করেছিলেন?
সামান্য অহংকার, একছিটে প্রত্যাশাভঙ্গের ক্রোধ, একটু ঘোলাটে বুদ্ধি, সব মিলে ঘণ্টা কয়েকের পশু। খুব লপচপানি, ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে পানিশমেন্ট। হাতে হাতে গীতার ফল প্রাপ্তি।
ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ।
স্মৃতিভ্রংশাঘুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশা প্রণশ্যতি ॥
মাতামহ মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, হে হেঃ ব্বাবা, পথে এসো ম্যান। খুব তো পুরুষকার পুরুষকার করতে, আমি কতদিন বলেছি, কারুর কাছে কিছু আশা কোরো না। না পেলেই মন খারাপ, মন খারাপ থেকে অভিমান, অভিমান থেকে রাগ। রাগ হল লাল লোহা। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পশুকে জাগিয়ে তোলে। অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্।
থাক থাক আর গীতা নয়। ও অনেক শুনেছি। মুখে আওড়ে কাঁচকলা হয়। মনকে বশে আনতে হবে।
এই তো, এই তো। তুমি ঘুরে গেছ। এইবার সাধনা। রত্নাকর থেকে বাল্মীকি।
রত্নাকর বাল্মীকি হয়। মিটমিটে মধ্যবিত্ত বাঙালি বাঙালিই থেকে যায়।
অক্ষয়বাবু বললেন, সবই হল গ্রহের প্রভাব। যে যা হবে, সে তা হবে। আগে থেকেই ঠিক করা আছে। সাধু সাধু হবে। চোর চোর হবে।
ওটা আবার তোমার লাইন। আমি বিশ্বাস করি না। ম্যান ইজ এ ক্রিচার অফ সারকামস্ট্যানসেস। তবে কালকের একটা ব্যাপারে আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি।
কীরকম, কীরকম? মাতামহ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন।
কাল আমি একটা স্বপ্ন দেখলুম। আমি যেন মাঝরাতে খোলা ছাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আকাশটা খুব কাছে নেমে এসেছে।
আহা, কী ভাল স্বপ্ন। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।
দাঁড়ান দাঁড়ান। সবটা আগে শুনুন। আকাশটা খুব কাছে নেমে এসেছে। ধকধক করে তারা জ্বলছে। আমি বলছি, আরে ওই তো কালপুরুষ। যেই বলেছি কালপুরুষ, অমনি কালপুরুষ ঘুরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। অবাক হয়ে ভাবছি, এ আবার কী! কালপুরুষ অমনি হুহু করে নীচের দিকে নামতে লাগল। আলো, আলো। চারপাশ যেন ঝলসে যাচ্ছে। নেমে এল ছাতে। সঙ্গে সেই কুকুরটাও আছে। লোমে হিলহিল করছে আগুন। আমি ভয়ে বলছি, একী একী, আকাশ ছেড়ো না। কালপুরুষ ধনুকে তির জুড়ল। মারবে নাকি! বলতে না-বলতেই তির ছেড়ে দিল। এত আলো, মনে হল সারা পৃথিবী জ্বলে উঠেছে। পেট্রলে আগুন লাগার মতো আমি দপ করে জ্বলে উঠে এক খণ্ড পোড়া কাঠের মতো হয়ে গেলুম। সব দেখতে পাচ্ছি, সব বুঝতে পারছি। নিজেই নিজের সৎকার দেখছি। কালপুরুষ রকেটের মতো আকাশে উঠে গেল। আকাশ সরে গেল। চারপাশে থকথকে অন্ধকার। ছাদে সেই পোড়া কাঠ। হাওয়া লেগে ছাই হচ্ছে, আর পিটপিট শব্দ করছে।
মাতামহ পিতার পিঠে হাত রেখে বললেন, তোমার হয়ে গেছে। তুমি পেয়ে গেছ। তোমার আর দেরি নেই। দীক্ষাটা নিয়ে ফেলল। এখন গেরুয়া পরার দরকার নেই। সবসময় সঙ্গে একটা গেরুয়া রুমাল রাখো। সন্ন্যাসাশ্রমে তোমার নাম হোক, স্বামী হরিহরানন্দ। এই বাড়িটাকে আমরা আশ্রম বানাব। পাঁজিতে তোমার নাম তুলে দোব।
আহা উত্তেজিত হবেন না। কী স্বপ্নের কী ব্যাখ্যা! কাল রাতে ওই স্বপ্ন, আজ সকালে আহত, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। দুটোর মধ্যে কেমন যেন যোগসাজস খুঁজে পাচ্ছি। অক্ষয়, তুমি এর কী মানে করবে?
আজ্ঞে, আমি তো তেমন স্বপ্নতত্ত্ব জানি না। তবে, মনে হয়, আপনার এই প্রমোশনের সঙ্গে ওর কোনও যোগ আছে।
মাতামহ মানতে পারলেন না। আরে, না হে না, একেবারে আধ্যাত্মিক স্বপ্ন। নক্ষত্র জ্যোতিতে পুড়ে ছাই হয়ে হরিশঙ্কর নবীন জন্ম লাভ করে ঊর্ধ্বে আরোহণ করছে। এসব স্বপ্নের অর্থ তোমরা কী বুঝবে! আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব? হয়তো বলতে পারবে, জ্যোতিষ ট্যোতিষ করো তো।
অক্ষয়বাবু বললেন, বলুন, জ্ঞান থাকলে বলব।
এই বাড়িটা, বুঝলে অক্ষয়, এই বাড়িটায় একটা কিছু আছে। সংসারটা একেবারে ছারখার হয়ে গেল। এই দুটো সলতে কেবল টিমটিম করে জ্বলছে। নাতিটা তো একটা বদ্ধ পাগল। এই বয়েসের ছেলে, একটা সিগারেট খায় না, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেশে না, যাত্রা থিয়েটার দেখে না, আবার বেদবেদান্ত পড়ে। ব্যাটা মহাপুরুষ না কাপুরুষ বোঝা দায়। আমার কী মনে হয় জানো?
