হ্যাঁ, তাও তো বটে। আমি তো বড় একটা কাউকে আপনি বলি না। আপনিটা তুমি নিজের গুণেই আদায় করে নিলে।
পিতা চায়ের কাপ রাখতে রাখতে বললেন, অক্ষয়ের সাহস কত জানেন? তোমার সেই ঘটনাটা বলো না।
কোনটা হরিদা?
সেই বালির ব্রিজে মুণ্ডু কাটা মানুষ।
উঃ, সে ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।
কীরকম, কীরকম? মাতামহ উত্তেজনায় সামনে ঝুঁকে পড়লেন।
অক্ষয়বাবু বেশ আয়েশ করে বসে গল্প শুরু করলেন। আমি তখন উত্তরপাড়ায় থাকি। বউদির ভীষণ অসুখ। ডাক্তারবাবু এমন এক ওষুধ দিলেন যা কলকাতা ছাড়া পাওয়া যাবে না। রাত হয়ে গেছে। ওষুধ না পড়লে রুগির রাত কাটবে কি না সন্দেহ। বেরিয়ে পড়লুম সাইকেল নিয়ে। কোথাও না পাই শ্যামবাজারের রাইমারে পাবই। শীত পড়েছে জাঁকিয়ে! অমাবস্যা তিথি। যাবার সময় দেখে গেলুম গঙ্গা থেকে হিলহিল করে কুয়াশা উঠছে। ওষুধ পেয়ে গেলুম। ফেরার পথে টালার কাছে টায়ার পাংচার হয়ে গেল। সারাতে সারাতে বেজে গেল রাত দশটা। ফের যখন ব্রিজে উঠলুম তখন মাঝরাত। গঙ্গা অদৃশ্য। ব্রিজ পড়ে আছে নরকে যাবার একফালি রাস্তার মতন। কুয়াশায় ভেসে আছে। মনে হচ্ছে কুরে কুরে রাস্তা বের করতে হবে। সে দৃশ্য ভাবা যায় না। দু’হাত দূরেও দৃষ্টি চলে না। ব্রিজের মাঝামাঝি এসেছি। বাঁ পাশে তাকিয়ে দেখি লোহার গার্ডারে ঠেসান দিয়ে কে যেন বসে আছে। কে রে বাবা! এই শীতের রাত। থিকথিকে কুয়াশা। আত্মহত্যা করতে চায় নাকি! ব্রিজ হল আত্মহত্যার জায়গা। সাইকেল থেকে নেমে পড়লুম। ফুটপাথে ঠেসিয়ে রেখে কাছে গিয়ে। ডাকছি, ও মশাই শুনছেন, ও মশাই শুনছেন? কোনও উত্তর নেই? কাঁধে হাত দিয়ে বললুম, ও মশাই! যেই না নাড়া দিয়েছি, কাঁধ থেকে মুভুটা খুলে ঠাস করে গড়িয়ে পড়ল। কী সর্বনাশ! আমার তো খালি পা। এতক্ষণ পায়ে নরম নরম রবারের মতো কী লাগছিল। ভাল করে তাকিয়ে দেখি আলকাতরার মতো জমাট রক্ত। আর ঠিক সেই সময় একটা স্টিমার গম্ভীর সুরে ভোঁ দিয়ে উঠল। কুয়াশার সাদা চাদর কেঁপে গেল। এপাশ ওপাশ তাকিয়ে চট করে রাস্তা থেকে মুন্ডুটা তুলে নিয়ে আবার কাঁধে ফিট করে দিলুম। চেহারা দেখে মনে হল বেশ মানিড ম্যান। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই মনে হল পিঠে কে যেন হাত রাখল। চমকে উঠেছি। পুলিশ নাকি! কেউ কোথাও নেই। অথচ পিঠে হাত রেখেছিল কেউ! ফিসফিস করে কানের কাছে কে বললে, তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। ঝড়ের বেগে সাইকেল চালালুম। পড়ি কি মরি। বাড়ি ঢুকছি, ভাইপো ভাইঝিরা কেঁদে উঠল। বউদি মারা গেলেন।
পিতা মাতামহের দিকে তাকিয়ে বললেন, কেমন শুনলেন? আপনি হলে কী করতেন?
মাতামহ ভয়ে জমে পাথর হয়ে গেছেন। নীচের ঠোঁট থিরথির করে কাঁপছে। চোখদুটো প্রায় উলটে গেছে।
পিতা বললেন, একটা ঠোঙা ফুলিয়ে কানের কাছে ফট করে ফাটাও। শক ট্রিটমেন্ট।
অক্ষয়বাবু বললেন, শকে শাক্যং সমাচরেৎ। ভীষণ ভিতু মানুষ।
না না, অন্য ব্যাপারে তেমন ভয় নেই। আগে খুব বাঘের ভয় ছিল। আমাদের সঙ্গে একবার জামতাড়া বেড়াতে গিয়ে রাতে বাঘের স্বপ্ন দেখে মশারিফশারি ছিঁড়ে এমন কাণ্ড করেছিলেন! সে আর এক কাহিনি। পরে তারাপীঠে শ্মশান জাগাতে গিয়ে ভূতের ভয় ধরিয়ে এসেছেন। ভ্রষ্ট তান্ত্রিক। মাঝরাতে ভূতে নাকি আঁচড়ে দিয়েছিল। আঁচড় দেখেই বুঝেছিলাম, খাকশেয়ালের কাজ। সঙ্গে সঙ্গে পাস্তুরে নিয়ে গিয়ে তলপেটে চব্বিশটা।
ফ্যাট করে ঠোঙা ফাটার শব্দ হতেই মাতামহ সংবিৎ ফিরে পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন। অক্ষয়বাবু বললেন, তা হলে মর্গের গল্পটা না বলাই ভাল। কী বলেন হরিদা!
হ্যাঁ, না বলাই ভাল। সে তো আরও সাংঘাতিক।
মাতামহ বললেন, আমি কিন্তু ভয় পাইনি হরিশঙ্কর। তোমরা আমাকে ভুল বুঝো না। আমি একটা অন্য জগতে চলে গিয়েছিলুম। তুমি যার কাঁধে মুন্ডু ফিট করেছিলে, সে আমার শ্যালক প্রতীপ।
অ্যাঁ, বলেন কী! একই সঙ্গে দু’জনের বিস্ময় প্রকাশ।
হ্যাঁ গো, তোমাদের মনে নেই, সেই পদ্মিনী মামলার কথা?
হ্যাঁ হ্যাঁ, পদ্মিনী মামলা! মনে পড়েছে। বছরের পর বছর চলেছিল। এতদিন আপনি চেপে ছিলেন কেন?
সে যে বড় লজ্জার কথা ছিল।
হ্যাঁ, তা ছিল, লাস্ট, গ্রিড।
হ্যাঁ, একেবারে চটকাঁচটকি ব্যাপার। অক্ষয়বাবু ফোড়ন কাটলেন।
মাতামহ বললেন, প্রতীপ আজ বেঁচে থাকলে কত বড় গাইয়ে হত জানো? ওর মতন অমন ঠুংরি খুব কম গাইয়েই গাইতে পারত। একেবারে আবদুল করিম কেটে বসানো। আমি তোমার ভয়ে বাক্যহারা হয়ে গিয়েছিলুম।
আমার ভয়ে? অক্ষয়বাবু ভুরু কোচকালেন।
হ্যাঁ, খুব বাঁচা বেঁচে গেছ। মনে আছে, মৃতের পাশে একটা ইঞ্জেকশনের অ্যামপুলস্ পড়ে ছিল। সেটা তো তা হলে তোমার পকেট থেকেই পড়েছিল।
পিতা বললেন, যদুর মনে পড়ছে, সেটা তো ছিল মরফিয়া। তুমি কি রাইমার থেকে মরফিয়া কিনেছিলে?
কতদিন আগের কথা, আর কি মনে আছে! হতে পারে মরফিয়া। বউদির মাথায় হেমারেজ হচ্ছিল, এইটুকু মনে আছে।
মাতামহ বললেন, সেইসময় আমি পরপর চোদ্দোদিন টানা সাক্ষী দিয়েছিলুম। আসামিরা সব ওই অ্যামপুলসের জোরে একে একে খালাস পেয়ে গেল। প্রতীপ মরফিয়া নিত না। আসামিরাও নয়। তা হলে মরফিয়া এল কোথা থেকে? খুনির পকেট থেকে। আর তুমিই সেই খুনি। তখন খুঁজে পাওয়া যায়নি। আজ পাওয়া গেল।
