হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। জ্যোতিষে আমার বিশ্বাস নেই, তবে অক্ষয়ের অধ্যবসায়ে আমার গভীর বিশ্বাস। দেখা যাক ও এই বুজরুকিকে বিজ্ঞানের স্তরে নিয়ে যেতে পারে কি না। মর্গে তোমার সেই ভূত দর্শনের ঘটনাটা ভাবো অক্ষয়?
মাতামহ আরও সোজা হয়ে বসে বললেন, অ্যাঁ, ভূতের হাত? ইনি ভূতের হাত দেখেছেন?
ভূতের হাত নয়, ভূতের হাতে পড়েছিলেন।
আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।
এসেছে যখন শুনবেন, তার আগে একটু জলযোগ করে নিক। খাইয়ে মানুষ। সারা মাসই তো ওকে নেমন্তন্ন খেয়ে খেয়ে বেড়াতে হয়। ও হল কলকাতার এক নম্বর প্রোফেশনাল খাইয়ে। বড় বড় বাড়ির রেজিস্টারে ওর নাম আছে।
উঃ, একেই বলে ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বয়। আমরা সারাবছর হাপিত্যেশ করে বসে থাকি, আর ইনি রোজ ভোজ মেরে বেড়ান। ভোজরাজ। কিন্তু ভূতের ব্যাপারটা সন্ধের মুখে সেরে নেওয়াই ভাল। বেশি রাতে ওসব আলোচনা না করাই উচিত। ছোটরা ভয় পেতে পারে।
আমরা তো সবাই বুড়ো দামড়া, ভয় পাবার মতো তো কেউ নেই। এক আপনি যদি ভয় পান তা হলে আলাদা কথা।
আমি একটু ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করি। তোমার মতো অবিশ্বাসী নই। বাগানের একপাশে পড়ে থাকি। বুঝলে কিনা?
আপনি তো তন্ত্রসাধক! আপনার আবার ভয় কীসের?
তা-আ ঠিক। মাতামহ আবার মাথা নিচু করলেন।
পিতা বললেন, নাও, এঁদের একটু জলযোগের ব্যবস্থা করো। আমি তো বেএক্তিয়ার হয়ে পড়েছি। তোমাকে সাহায্য করতে পারছি না।
থাক না হরিদাজলযোগের জন্যে ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? পরে আর একদিন হবে। অক্ষয়বাবু খুঁতখুঁত করে উঠলেন।
আমার ডিকশনরিতে পরে বলে কোনও কথা নেই। আমি জানি, নাও অর নেভার। ওর ট্রেনিংও সেইভাবেই হয়েছে। তুমি কিন্তু কিন্তু কোরো না।
মাতামহ বললেন, আমি সাহায্য করছি। আমরা সব অন্য জাতের মানুষ, কী বলল হরিশঙ্কর! আমরা হলুম গিয়ে অর্ধনারীশ্বর। বাড়িতে মেয়েরা নেই তো কী হয়েছে। আমরা হলুম গিয়ে মেয়েদের বাবা। গর্ভধারণ ছাড়া সবই পারি।
উঃ, আবার আপনার মুখ আলগা হয়েছে। সেদিন কী সারমন দিলুম?
গর্ভধারণ তো খারাপ কথা নয়। একেবারে শুদ্ধ সংস্কৃত।
শব্দটা খারাপ নয়, ভাবটা ভালগার।
তা হলে ওটা তুমি কেটে দাও।
বলা কথা আর ছোঁড়া পাথর আর ওলটানো দুধ হাতের বাইরে চলে যায়।
পিতার মনে হয় জ্বরের দাপট একটু কমেছে। সেই ঝিমুনি ভাবটা আর নেই। অনর্গল কথা বলছেন।
মাতামহ উঠে এলেন। মুখে সেই অনাবিল হাসিটি লেগে আছে। শুভ্র একটি রাজহংস। জীবনের কোনও কিছুই গায়ে মাখলেন না। একবার করে পালক ঝাড়েন আর সব ছিটকে পড়ে যায়। ফিসফিস করে বললেন, আসার সময় দেখে এলুম ওই মোড়ের দোকানে গরম গরম হিঙের কচুরি ভাজছে। এই ফুলোফুলো, লাল লাল।
আপনি যা ভাবছেন আমিও তাই ভাবছি। কচুরি, ঘুগনি, আর চা।
উঃ, তুই আমার নাতির মতো নাতি। তুলসী তোকে রেখে গেছে আমার জন্যে আর ওই দুর্দান্ত ছেলেটার জন্যে। পা-টাকে অমন ক্ষতবিক্ষত করল কী করে?
বাথরুমের দেয়াল ঝরাচ্ছিলেন, পায়ে প্লাসটারের চাঙড় ভেঙে পড়েছে।
নাঃ তুলসী ওকে ভুলতে পারেনি।
তার মানে?
সে তুই বুঝতে পারবি না। এই পৃথিবীর চারপাশে আর একটা জগৎ ঘুরপাক খাচ্ছে। ডাক্তারখানায় যেমন রুগিরা মুড়িসুড়ি দিয়ে বসে থাকে সেইরকম মৃত আত্মারা সেইখানে বসে আছে। ওখানের আলোটা কেমন জানিস?
না।
বিদ্যুৎ চমকালে যেমন নীল আলোলা হয় সবসময় সেইরকম নীল আলো স্থির হয়ে আছে।
কী করে জানলেন?
আমার মনে হয়। তা হলে কচুরি আর ঘুগনি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
মোড়ের মাথায় দিনুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কী রে, সুখেন কোথায়?
খুব নিরাপদ জায়গায়। আচ্ছা, চুল বেরোতে ক’মাস সময় লাগে রে?
রাখ তোর চুল। জবা ছাত টপকে আমাদের বাড়ির খিড়কি দিয়ে সেই ন্যাড়ার সন্ধানে ছুটেছে।
অ্যাঁ, বলিস কী? পৃথিবীটা হঠাৎ পালটে গেল নাকি! যাই জবাকে খুঁজে বের করি। কেউ জানে?
না, কাউকে বলিনি।
দিনু আবার দৌড়োল। আমাদের গ্রেট দিন।
কচুরি আর ঘুগনি খেয়ে অক্ষয়বাবু একটু ধাতস্থ হলেন। এতটা পথ হেঁটে এসেছেন, বেশ খিদে পেয়েছিল মনে হয়। চায়ের কাপটা সামনে রাখতেই পকেট থেকে খানিকটা তুলো বের করে চায়ে ভেজাতে লাগলেন।
মাতামহ জিজ্ঞেস করলেন, চায়ে তো বিস্কুট ভিজিয়ে খায়, তুলোও খাওয়া যায় নাকি?
আজ্ঞে না, আসার পথে হোঁচট খেয়ে ডানপায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা কৌটোর ঢাকা খোলার মতো হয়ে গেছে। চায়ে তুলো ভিজিয়ে একটু বেঁধে রাখি।
এটা কী ধরনের চিকিৎসা?
আজ্ঞে আসুরিক। মানুষ যখন জঙ্গলে থাকত, পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করত, তখন তাদের অনেক দাওয়াই জানা ছিল।
তখন কি চা ছিল?
না, চা-চিকিৎসা আমার আবিষ্কার। চা খেলে পেট মরে যায়, লিভার শুকিয়ে যায়, তা হলে ঘা কেন শুকোবে না, জীবাণু কেন মরবে না? কাটাছেঁড়ায় চা আমার দাওয়াই।
চা-টা যে নোংরা হয়ে গেল।
না, না, নোংরা আবার কী? নোংরা, পরিষ্কার সবই আমাদের মনের বিকার। ওঃ কত বড় সাধক আপনি! ভূত দেখেছেন, ভৌতিক চিকিৎসায় উপকার পেয়েছেন, ভগবান দেখেছেন?
আজ্ঞে না।
দেখবেন দেখবেন। কেউ আটকাতে পারবে না। ঠাকুর বলেছিলেন, যখন গঙ্গার জল আর নর্দমার জল এক মনে হবে তখন বুঝবে ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে। আপনার তো তাই হয়েছে। আপনি প্রকৃত ভাগ্যবান।
আমাকে আপনি আপনি করছেন কেন?
