মেসোমশাইয়ের চেয়ে প্রতাপ রায়ের উৎসাহ যেন বেশি। মেসোমশাই বিক্ষিপ্ত সমস্ত জিনিস গোছগাছ করে সুটকেসে ভরতে লাগলেন। মেয়েদের শাড়ির হিসেব রাখেন না, তাই জানতেও পারলেন না একখানা শাড়ি নেই। আশ্চর্য, মেয়ে দুটোকে কেন রেখে এলেন?
মেসোমশাইয়ের সেই প্রথম দিনের বেশ। হাতে শোলার টুপি।
হরিদা, আমি তা হলে আসছি। মেয়েদুটো থিয়েটার দেখতে গেছে। অনেকদিনের শখ কলকাতার থিয়েটার দেখবে। যাবার আগে দেখা করে যাব। দিনকতক আপনার অসুবিধে করে গেলুম।
অসুবিধে হলে যাবার আগেও আসতে পারেন।
নাঃ অসুবিধে আর কী? প্রাসাদতুল্য বাড়ি। দাসদাসী। আচ্ছা আসি।
দু’জনে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলেন, আগে পরে। প্রতাপ রায়ের এত উৎসাহ কীসের! পিতা এতক্ষণে চোখ খুললেন।
কী বুঝলে?
আমাকে আর বুঝতে হল না। মাতামহ আসছেন গাইতে গাইতে, রিপুর বশে চললেম আগে, ভাবলেম না কী হবে পাছে।
১.১৭ আপনার চেয়ে পর ভাল, পরের চেয়ে বন ভাল
গান গাইতেন, আপনার জন সতত আপন, পর কি কখনও হয় রে আপন। কনকের বাবা যেভাবে চলে গেছেন, নিতান্ত স্বার্থপর না হলে এভাবে কেউ যেতে পারে না। কুইক মার্চ অ্যান্ড এগজিট। জীবনে বড়সড় হতে গেলে নিজের কথাই ভাবতে হয়, অন্যের কথা ভাবতে গেলে চলে না। ভেবেছ। কী মরেছ। কে কার?
মাতামহ দরজার আড়াল থেকে ঘরে উঁকি মেরে বললেন, একী, এমন রাখাল রাজার বেশ কেন? মাথায় ফেট্টি। তুমি কি রাখালভাবে সাধনা করছ নাকি?
পিতা চোখ আধ-খোলা করে বললেন, ব্রেকডাউন। একশো তিনটিন হবে। ডান পা-টা ড্যামেজ করে ফেলেছি।
মাতামহ পিতার সামনে চেয়ার টেনে এনে সোজা হয়ে বসে বললেন, তোমার মঙ্গল কিঞ্চিৎ কুপিত। প্রায়ই রক্তপাত হচ্ছে। ফ্রন্টিয়ারে যুদ্ধ করতে গেলেও ঘনঘন এতবার আহত হতে হয় না। তোমার এই কাটা সৈনিকের অবস্থা দেখতে ভাল লাগে না। তুমি হলে আমাদের পুরুষসিংহ। সিংহ যদি গর্জন না করে বেড়ালের মতো মিউ মিউ করে, বড় মন খারাপ হয়ে যায়।
সংসারে চিরকালই আমি এক কাটা-সৈনিক। মাঝেমধ্যে তেড়েফুঁড়ে উঠি, সঙ্গে সঙ্গে ড্যাঙোস খেয়ে চিতপাত হয়ে পড়ি।
তোমাকে ড্যাঙোস মারে এমন পুরুষ মাতৃগর্ভে জন্মায়নি।
আমি তো আছি। নিজেই নিজেকে মেরে ফ্ল্যাট করে দিচ্ছি।
হরিদা আছেন? হরিদা?
অপরিচিত কণ্ঠস্বর। মোটা খদ্দরের পাঞ্জাবি। খদ্দরের খাটো ধুতি। একমাথা আধ-পাকা চুল চারপাশে ঝকড়া কঁকড়া হয়ে ঝুলছে। ধুলোমাখা দুটো খালি পা। অন্তত ফুট ছয়েক লম্বা। তেমনি বিশাল চেহারা। বুকের সবক’টা বোতাম খোলা। ভেতরে আবার গেঞ্জি নেই। বুকে একটাও লোম নেই। মসৃণ, তেলা। কোমলে কঠোরে মেশানো অদ্ভুত এক চেহারা।
হ্যাঁ, আছেন। আপনি আসুন।
কে, অক্ষয় নাকি? পিতা ক্ষীণ কণ্ঠে জানতে চাইলেন।
হ্যাঁ, আমি অক্ষয়। কী ব্যাপার আজ অফিসে গেলেন না?
এই যে পা খোঁড়া করে বসে আছি।
আমার মন বলছিল একটা কিছু হয়েছে। অকারণে বসে থাকার মানুষ আপনি নন।
তুমি ওই চেয়ারটায় বসে পড়ো। আমার শ্বশুরমশায়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে?
না, আপনার মুখে ওঁর কথা আমি শুনেছি। আজ দর্শন হল। একটু পায়ের ধুলো নিই। শুনেছি আপনি অনেক দূর এগিয়েছেন।
মাতামহ পদযুগল কাপড়ের আড়ালে লুকোতে লুকোতে বললেন, না, না, প্রণাম কেন? আবার প্রণাম কেন?
তা বললে হয়, প্রণম্যকে প্রণাম করতেই হবে। অক্ষয়বাবু সামনে ঝুঁকে পড়ে চিকের আড়াল থেকে পা খুঁজে বের করার কসরত দেখাতে লাগলেন। মাতামহ ইজ্জত-যেতে বসা রমণীর মতো মুখভঙ্গি করে বসেই রইলেন।
পিতা বললেন, ধুলো নেবার মতো পা হল তোমার অক্ষয়। যেখান দিয়ে চলেছ সেইখানেই টন টন পদরেণু ঝরে ঝরে পড়ছে।
অক্ষয়বাবু খাড়া হয়ে বললেন, আমি ঝেড়ে দিচ্ছি হরিদা। একটা ঝাডুটাড়ু দিন।
আরে বোসো বোসো। আমি ধুলোর কথা বলেছি। ধুলো ঝাড়ার কথা বলিনি।
আপনার বাড়িতে লোকজন নেই, সারা শহরের ধুলো টেনে এনেছি, দিন না পরিষ্কার করে দিই।
মাতামহ মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, বাড়িতে এখন অনেক লোক। আমাদের সংসার ভরে উঠেছে।
পিতা বললেন, ভরে উঠেছিল, আবার খালি হয়ে গেছে।
সেকী? সব হাওয়া!
আজ্ঞে হ্যাঁ। তারা চলে গেছেন। আরও ভাল বাড়ি, আরও ভাল ব্যবস্থা। আরও সুখসুবিধে। যাক বাবা, বাঁচা গেছে। আর তা হলে জড়োসড়ো হয়ে থাকতে হবে না। আরে আমাদের পুরুষের সংসারে ওসব মানায় নাকি? আমরা নিজেদের মতো খাবদাব আর সানকি বাজাব। এ ক’দিন যেন আমাদের আক্কেল দাঁত উঠেছিল। তা হলে ঝেড়েই দাও।
না না, কোনও প্রয়োজন নেই, তুমি বোসো, আরাম করো। নিশ্চয় হেঁটে হেঁটে এসেছ!
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার আছে চরণবাবুর জুড়িগাড়ি। তা হলে বাইরে গিয়ে একটু নেচে আসি। যা ঝরার ঝরে যাক।
কোনও দরকার নেই, তুমি শান্ত হয়ে বোসো।
অক্ষয়বাবু বসলেন। বসে বললেন, আমি আরও এলুম, একটা সুখবর আছে। আপনার প্রোমোশনের সেই অর্ডারটা আজ এসে গেছে।
বলো কী? ল্যাং তা হলে মারতে পারল না।
নাঃ ফেল করল। আপনাকে আমি বলেছিলুম, অ্যাস্ট্রোলজিক্যলি আপনার এই প্রমোশন কারুর আটকাবার ক্ষমতা নেই। আপনার ব্যাড ডেজ চলে গেল। এইবার ভাগ্যের রথ গড়গড়িয়ে চলবে।
মাতামহের ঘুমঘুম ভাব কেটে গেল। বড় বড় চোখে তাকিয়ে বললেন, ও, তুমি এনার কথাই বলেছিলে। বিরাট জ্যোতিষী। মর্গে গিয়ে মৃতদেহের হাত দেখে দেখে জ্যোতিষের সত্য অসত্য মেলান।
