বাপ রে? সিন্নি দেখে এগিয়েছিলুম, কেতকা দেখে আবার পেছিয়ে এলুম। দুর্গ জয় করা কি অত সহজ কাজ। মনোদুর্গে বসবাস, আলোছায়া খেলে অধরাকে ধরা কি সহজ? পিতার সঙ্গে আমার একদিন কবির লড়াই হলে বেশ হয়। দেখি কার স্টকে কত কবিতা আছে?
বোদ মিলিয়ে গেল রাতের ছায়ায়। বেগুনি রঙের আলোয় পৃথিবী বড় বিষণ্ণ। ফুলগাছের টবে জল দিচ্ছি। দু’-এক ফোঁটা ছাদে পড়লেই সোঁ সোঁ করে টেনে নিচ্ছে। মিট্টিকা আতরের মতো গন্ধ বেরোচ্ছে। কাকের দল যেদিকে উড়ে গেল বাসায়, সেদিক থেকে বাদুড় উড়ে আসছে। পেছনে ধপ করে কিছু একটা পড়ার আওয়াজ হল। বেশ ভারী। পেছন ফিরে তাকাতেই চমকে উঠতে হল। খুনি আততায়ীর মতো এ কে?
জটেবুড়ির মতো চেহারা। জট-পাকানো লাল লাল চুল চারপাশে উড়ছে। মুখ লাল টকটকে। চোখদুটো ছাদের আবছা বেগুনি আলোয় পাথরের মতো জ্বলছে। পোশাকও অদ্ভুত। লাল একটা ঘাগরা। ঘাগরা নয় সায়া। তার ওপর হলদে রঙের একটা ব্লাউজ। কোথা থেকে এল? আকাশ থেকে পড়ল নাকি? সতীমার ক্ষুদ্র সংস্করণ? সামনের দিকে দৌড়ে পালাবার উপায় নেই। ছাদের বাইরে চলে যেতে হবে। মূর্তির গলায় শব্দ বেরোল,
পিন্টুদা?
কে, জবা?
হ্যাঁ, চিনতে পারছ না?
তুমি কোথা থেকে এলে? কীভাবে এলে?
তোমাদের ছাদের আলসে টপকে।
আমাদের ছাত অবদি এলে কী করে?
আমাদের বাড়ির কার্নিসে নেমে তোমাদের বাড়ির কার্নিসে পা রাখলুম।
ভয়ে আমার চোখ বুজে এল। গা শিরশির করে উঠল। যদি একবার পড়ে যেত, নির্ঘাত মৃত্যু।
তুমি এভাবে আসতে গেলে কেন?
আমার শাড়ি খুলে নিয়ে ঘরে শেল বন্ধ করে রেখেছিল। এ সব হল আমার মাসিটার কাজ।
মাসি মানে?
ওই হল, ছোট মা। তুমি আর কথা বাড়িও না। তোমার সামনে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার লজ্জা করছে। চট করে একটা শাড়ি এনে দাও।
শাড়ি পাব কোথায়?
তোমাদের বাড়িতে দু-দুটো মেয়ে, শাড়ি পাব কোথায়? যাও শিগগির নিয়ে এসো। এখুনি খোঁজপাত শুরু হবে।
নীচের তারে কনকের শাড়ি ঝুলছিল। যা হয় তবে, এখন দিয়ে তো দিই। কনককে বোঝালে। নিশ্চয়ই বুঝবে। জবার হাতে শাড়িটা দিতেই বলল, এত দামি কাপড় না আনলেই পারতে।
শাড়িটা পরতে পরতে বললে, তোমাদের পেছন দিকের দরজা দিয়ে আমি বেরিয়ে যাব।
কোথায় যাবে?
আমার জায়গায়।
সেটা আবার কোথায়?
বিয়ের পর মেয়েদের জায়গা কোথায় জানো না!
জবা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে চলল। জোরে চেঁচাতেও পারছি না। পেছন পেছন নামতে নামতে ফিসফিস করে বললুম, সুখেন নেই। দীনু তাকে কোথায় যেন নিয়ে গেছে।
যাক, আমি ঠিক খুঁজে বের করব।
তোমার চেহারাটা একটু ঠিক করে নিলে হত না।
সময় নেই, উপায়ও নেই। আমি চুপিচুপি নেমে বেরিয়ে যাচ্ছি, তোমাকে আর আসতে হবে না। যদি কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে, বলবে আমি কিছু জানি না।
তোমাকে আবার ধরে ফেলবে।
কারুর বাপের ক্ষমতা নেই।
জবা পায়ে পায়ে নীচে নেমে গেল। ভাগ্য ভাল, পিতৃদেব জ্বরে ইজিচেয়ারশায়ী। উঃ, সুখেনের বরাতটা তো খুব ভাল! এত প্রেম! দু’জনে এক সুরে বাঁধা! এমন তত বড় একটা দেখা যায় না। জলের ঝারিটা আনতে গিয়ে কানে এল, জবাদের বাড়িতে এক মহিলা খ্যানখ্যানে গলায় চিৎকার করছে, জবা, জবা। পালাও জবা, পালাও।
কোলের ওপর শেক্সপিয়ার, চেয়ারে পিতা আচ্ছন্ন। মাথায় ফেট্টি, চোখ বন্ধ। বাড়িতে বয়স্ক কেউ থাকলে একটু সাহস পাওয়া যেত। ঘরে ঘুটুর ঘুটুর করছি, চোখ না খুলেই পিতা বললেন, রাতে আমার উপবাস। তুমি যা হয় একটা কিছু নিজের মতো করে নাও। ওঁরা তো এখনও ফিরলেন না!
না, বেশ দেরি হচ্ছে।
মুখ থেকে কথা সরতে-নাসরতেই বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে থামল। প্রতাপ রায় এলেন। দু’জনে কথা বলতে বলতে ওপরে উঠছেন। মেসোমশাইকে বেশ খুশিখুশি দেখাচ্ছে। ভোজনতৃপ্ত চেহারা। ঘরে ঢুকে কিছু একটা বলতে গিয়ে পিতার অবস্থা দেখে থেমে গেলেন। কী হল? শরীর। খুব খারাপ হয়েছে?
চোখ না খুলে পিতা বললেন, আপনার কাজ হল?
প্রশ্ন প্রশ্নে চাপা পড়ে গেল। এ বেশ ভাল কৌশল। যে-প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না পালটা প্রশ্ন করে পাশ কাটিয়ে যাই। কনক আর মুকু কোথায় গেল? তাদের দেখছি না তো!
হ্যাঁ, কাজ হয়েছে। প্রতাপের মতো ছেলে হয় না। হরিদা, আপনার অনুমতি চাইছি।
অনুমতির প্রয়োজন নেই। ম্যাটার অফ কনভিনিয়েন্স। আপনি যেতে পারেন।
যাবার কথাই জিজ্ঞেস করছি কী করে বুঝলেন।
কমন সেন্স বিনয়দা, কমন সেন্স।
প্রতাপের বাড়িটা বিশাল, জনপ্রাণী নেই।
লেখাপড়ার সুবিধে হবে।
ঠিক বলেছেন, তা ছাড়া…
নীচের তলাতেই ডাক্তারের চেম্বার।
ঠিক বলেছেন, তা ছাড়া…
প্রতাপের বিষয় সম্পত্তির মামলা এমন জড়ভট্টি হয়ে আছে, জট ছাড়াতে হলে কাছেই থাকা দরকার।
ঠিক বলেছেন, তা ছাড়া…
কলকাতায় থাকলে পরীক্ষা দেবার সুবিধে অনেক।
ঠিক বলেছেন, তা ছাড়া প্রতাপের এক কাকা দর্শনের অধ্যাপক। কাছাকাছি থাকলে আমার চেয়ে ভাল কোচিং পাবে।
এই মুহূর্তে আপনি চলে যান। আর একটুও দেরি করবেন না।
আপনি চোখ খুলছেন না কেন?
কোনও কোনও সময় চোখ বুজিয়ে থাকলে পৃথিবীকে কম কর্কশ মনে হয়।
প্রতাপ রায় বললেন, আপনাকে বেশ অসুস্থ মনে হচ্ছে। চলুন না একবার স্পেশালিস্ট দেখিয়ে দিই।
তেমন স্পেশাল কিছু হয়নি প্রতাপ। ধন্যবাদ।
