চা নিয়ে এসে দেখলুম, পিতা জ্বরে হাঁসফাস করছেন। দেয়াল আয়নার দিকে দৃষ্টি স্থির। দু’চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমেছে। হাত বাড়িয়ে চা নিলেন।
কী, খুব যন্ত্রণা হচ্ছে আপনার?
শরীরে নয়, মনে। জীবনে ছোটখাটো দু-একটা ভুল করে ফেলেছি। My thoughtless youth was winged with vain desirers/My manhood, long misled by wandering fires. আর তো শৈশবে ফিরে যাওয়া যাবে না, আর তো যৌবনে ফিরে আসবে না। Where is the Life we have lost in living?/where is the wisdom we have lost in Knowledge?/where is the knowledge we have lost in information?
চায়ে চুমুক দিলেন। যা কোনওদিন হয় না, আজ হাত কাঁপছে। চোখ আরও রক্তবর্ণ। উচ্চ চাপ মনে হয় বেড়েছে। এত আবেগই বা কোথায় ছিল? বাঁধভাঙা নদীর প্রবল স্রোতধারায় বেরিয়ে আসছে।
ওই যে আয়নাটা দেখছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
ওই আয়নায় আমার যৌবন ধরা আছে, তোমার কৈশোর আছে, তোমার মায়ের ছায়া আছে। তা হলে শোনো একদিনের কথা বলি। তাড়া আছে?
আজ্ঞে না।
তা হলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার মতো পা ইকছ কেন? বোসো। তোমার বয়েস তখন তিন কি চার। ভীষণ জ্বর। তিন কি চার। উঠছে নামছে। সকালে এক পুরিয়া ওষুধ দিয়ে ভীষণ উদ্বেগ নিয়ে অফিসে গেলুম। কাজে মন বসছে না। ছটফট করছি। ল্যাবরেটরিতে অ্যানালিসিসে একটা স্যাম্পল চড়িয়েছি। অন্যমনস্ক, ইথারের বোতলে আগুন ধরে গেল। পুড়তে পুড়তে বেঁচে গেলুম। আমার অ্যাসিস্টেন্ট অন্নদা বললে, আজ আপনার কী হয়েছে বলুন তো? আমি বললুম, তুমি কিছুক্ষণ সামলাও, আমি একবার চট করে বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। ছেলেটার খুব জ্বর দেখে এসেছি। ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। সাড়াশব্দ নেই। নিস্তব্ধ বাড়ি। ঘরে ঢুকে দেখি, তোমার মা ওই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। সবে চান সেরেছে। ভিজে চুল কোমর ছাপিয়ে পায়ের কাছে চামরের মতো দুলছে। চাঁপাফুল রঙের শাড়ি পরেছে। গালে গোলাপি আভা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে সিঁদুরের টিপ পরছে। আর তুমি খাটে শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছ। আয়নায় আমাকে দেখে ঘুরে দাঁড়াল, আঙুল কপালের টিপে, তুমি? হ্যাঁ আমি। খোকা কেমন আছে? হেসে বললে, জ্বর ছেড়ে গেছে। Time, you old gipsy man/Will you not stay/Put up your caravan/Just for one day/Just for one day?
আপনার চা যে ঠান্ডা হয়ে গেল। টাটকা আর এক কাপ করে দিই।
নাঃ, মুখে আর ভাল লাগছে না কিছু। বিস্বাদ হয়ে গেছে। ওই কোটের পকেট থেকে আমাকে বড় রুমালটা দাও। মাথায় একটা ফেট্টি বাঁধি। যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।
শুয়ে পড়ুন। একটু টিপে দিই।
দুর পাগল। সেবা নিলে মানুষ দুর্বল হয়ে যায়। He who was living is now dead/We who were living are now dying/With a little patience. তুমি বরং ওই রেকর্ডটা একবার চাপাও তো।
কোনটা বলুন?
ওই যে, তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই বারে বারে।
কোণের দিকে ছোট্ট একটা টেবিলে আদ্যিকালের চোঙা-লাগানো গ্রামোফোন। হাতল ঘুরিয়ে দম দিয়ে রেকর্ড চাপাতে হয়। ঘুঘু আর ডাকছে না। বাইরের কার্নিসে গোটাকতক বুড়ো পায়রা বাতের ব্যথায় অনবরত কোত পেড়ে চলেছে। গান বেজে উঠল। পিনটা পালটানো উচিত ছিল। পিতা চোখ বুজে গান শুনছেন। গান একসময় থেমে গেল। তবু চোখ খুলছেন না। মাথার কাছে এগিয়ে গেলুম। জ্বরে বেহুশ মতো হয়ে গেছেন। এখান থেকে হলঘরে মায়ের ছবিটা স্পষ্ট দেখা যায়। পশ্চিমের একচিলতে রোদ পড়েছে। জ্বলজ্বল করছে। আয়নাটাও কেমন যেন গভীর আকাশের চেহারা নিয়েছে। মেসোমশাইদের ঘরের খাটের চাঁদরের একটা অংশ আয়নায় ভেসে আছে। আয়নার জগৎ একেবারে নির্জন নয়। বাতাসে চাদর নড়লে ছায়াও নড়ে উঠছে। মনে হচ্ছে বহু দূর থেকে কেউ যেন আঁচল উড়িয়ে আসছে। ভারী অদ্ভুত লাগছে। বিরাট বড় একটা দায়িত্ব পেয়ে গেছি। বিশাল শক্তিশালী এই মানুষটি আজ কত অসহায়! অদৃশ্য বন্ধনের কত আকর্ষণ। ফেলে যাব কোথায়! সন্ন্যাস কি মুখের কথা! সব ছাড়োয়ে বললেই কি সব ছাড়া যায়!
মাথার নীচে ছোট একটা বালিশ লাগাতে গেলুম। চমকে উঠলেন। ক’টা বাজল?
প্রায় সাড়ে চারটে।
রোদ পড়ে এসেছে। ছাতের গাছে একটু করে জল দিতে হবে।
রোদের ঝঝ কমুক, এখন দিলে শুকিয়ে যাবে।
হ্যাঁ, সন্ধের মুখে দিয়ো। আমার পা-টা বেশ টাটিয়েছে। ওঁরা ফিরেছেন?
আজ্ঞে না।
সকালে আমি একটু বেশি ইমোশানাল হয়ে পড়েছিলুম। তোমাকে কেউ আক্রমণ করলে আমার অ্যানিম্যাল ইনস্টিংক্ট প্রখর হয়ে ওঠে।
The world turns and the world changes
But one thing does not change
In all of my years, one thing does not change
However you disguise it, this thing does not change
The perpetual struggle of good and evil.
দেবতা আর অসুরের মাঝখানে পাতলা কাগজের ডায়াফ্রাম। একটু এদিক-ওদিক হলেই ফরদাফাঁই। নাঃ, সংযত হতে হবে। কী করব? তুমি যে আমার সন্তান। তোমার মধ্যে যে আমার বিশালের ছায়া আছে। আমাকে শেক্সপিয়ারের কমপ্লিট ওয়ার্কসটা একবার দাও তো।
বই না পড়ে, একটু শুয়ে পড়ুন না। শরীর খারাপ হলে রেস্ট নিতে হয়।
তুমি আমাকে শুইয়ে দিতে চাইছ কেন? তাতে তোমার কী লাভ?
