ওঃ, তা হবে।
পিতা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। মেসোমশাই বললেন, হরিদা, আমি তা হলে মেয়েদের নিয়ে একবার ঘুরে আসি। রথ দেখা, কলা বেচা দুই-ই হবে।
অ্যাজ ইউ লাইক।
কনক চাপা সুরে বললে, এঁদের খাওয়াদাওয়ার কোনও ব্যবস্থা না করেই চলে যাব?
আমরা যখন আসিনি তখন এঁরা কী করতেন? এঁদের বেঁধে খাওয়াবার জন্যে তো আমরা আসিনি।
পিতার কথায় কনক কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। বড়দের জগৎ স্বার্থের চাকায় ঘোরে। রাধে, তুমি কি তা জানতে না!
সেজেগুজে তৈরি হয়ে, কনক পিতৃদেবের সামনে ছলছলে চোখে এসে দাঁড়াল, মেসোমশাই, কী করব বলুন, আমি তা হলে আসছি।
পিতা মাথায় হাত রেখে বললেন, হ্যাঁ মা, সেরে এসো।
মুকুকে নিয়ে মেসোমশাই এসে দাঁড়ালেন, হরিদা, ঘুরে আসছি।
হ্যাঁ, আসুন।
প্রতাপ রায় দূর থেকে হেঁকে বললেন, আমরা আসছি।
অতি ক্ষীণ গলায় পিতা বললেন, এসো।
শুনতে পেল কি পেল না, কেউ বিশেষ গ্রাহ্য করল না। গাড়ির দরজা বন্ধ হল। ইঞ্জিনের শব্দ দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল। বারান্দার রেলিংয়ে ভর রেখে, রোদ ঝলমলে গাছপালার দিকে তাকিয়ে পিতা বললেন, কী বুঝলে?
আজ্ঞে?
কী বুঝলে? আপনার জন সতত আপন/পর কি কখনও আপন হয়।
আপনার সেই গান!
ইয়েস। আমার সেই ইন্টারন্যাল মিউজিক। একলা চলো রে!
দখিনা বাতাস হু হু করে বয়ে এল। এলোপাতা খসে পড়ল গাছ থেকে। তারে কনকের নীল শাড়ি আমার অভিমানে ফুলে উঠল।
১.১৬ সিন্নি দেখেই এগোই কেঁতকা দেখে পেছোই
খাঁখাঁ দুপুর। খাঁখাঁ বাড়ি। বাগানের গাছে আবার ঘুঘু ডাকছে। নির্জন দুপুরের কারিগর। মনে হয় যেন স্যাকরার হাতুড়ি পিটছে! কনক চাল, ডাল, তরিতরকারি সবই বের করেছিল। রান্নার সময় পায়নি। প্রতাপ রায় তুলে নিয়ে গেছে। বড়লোকের সাতমহলা বাড়ি। জলসাঘর, ঝাড়লণ্ঠন, দাসদাসী। আস্তাবল, ওয়েলার ঘোড়া। তেলরঙে আঁকা পূর্বপুরুষদের ছবি। কার্পেটের ওপর আলতো পায়ে কনক ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। ভেতরটা কেমন যেন করছে। একেই বলে হিংসে।
পিতৃদেবের বেশ জ্বর এসে গেছে পায়ের তাড়সে। ইজিচেয়ারে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। কোলের ওপর গণিতের বই। পাশের টেবিলে খাতা আর পেনসিল। গল্পের বই পড়তে চান না। তাতে মন নাকি এলিয়ে পড়ে। বুদ্ধিবৃত্তি উপন্যাসের খোটা বেয়ে লতিয়ে উঠতে থাকে। মন হবে বটবৃক্ষের মতো। শিকড় নেমে যাবে বিজ্ঞানে, দর্শনে, তর্কশাস্ত্রে, চিকিৎসাবিদ্যায়। শাখাপ্রশাখায় বিশাল মহীরুহ। আসুক বাতাস, আসুক ঝড়, অচল অটল, ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশ। তলায় শীতল ছায়া। পারো তো একটুখানি উদারতার বেদি বাঁধিয়ে দাও। বাট্রান্ড রাসেলের খুব আত্মহত্যার ইচ্ছে হত। গণিতে বাঁচার প্রেরণা পেয়েছিলেন। যখনই মনে হত এইবার ঝুলে পড়ি তখনই বসে যেতেন অঙ্ক নিয়ে। গণিত থেকে চলে গেলেন দর্শনে। পিতৃদেব গণিত নিয়ে পড়েছেন, মাঝে মাঝে দর্শনের দিকে ঝুঁকেছেন, মৃত্যু সম্পর্কে অসীম কৌতুকের ভাব। কারুর মৃত্যুতে কখনও আহা আহা করতে শুনিনি। আহার নিদ্রার মতোই একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। পেয়াদা এসে খাজনা নিয়ে গেল। মেনিদার মা মারা গেলেন। বুড়ির জন্যে ছেলে ফাঁসোর ফোঁসর করে অস্থির। শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ করতে এসে কান্নায় একেবারে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। পিতা বললেন, সদ্য-বিধবার মতো অমন হাপুস হুপুস করছেন কেন? বয়েসে মানুষ তো মরবেই! আপনার ইনটেলেক্ট তো তেমন খোলেনি। তেরাত্তির কঁদবেন, চতুর্থ রাতেই তো হেসে হেসে জর্দাপান খাবেন! পৃথিবীতে সে মৃত্যু কোথায়, যার শোকে মানুষ সারাজীবন মুহ্যমান থাকবে! Death borders upon our birth, and our cradle stands in the grave.
জ্বর মনে হয় বেশ তেড়েই আসছে। মাঝে মাঝে আড়মোড়া ভাঙছেন। চোখ বেশ জবাফুলের মতো লাল হয়ে উঠছে। মুখের চেহারা শুকনো শুকনো। ফটিফাইভ। এ পরিবারের অ্যাভারেজ পরমায়ু নাকি পঁয়তাল্লিশ। সেই বয়েস যেই পেরোবে জল ঝেড়ে বইঠা তুলে পাটাতনে তুলে রাখো। মনকে বলো, যা আছে সব চটপট তাড়াতাড়ি সেরে নাও। এখন আমার সময় হল, যাবার দুয়ার খোলো। সেপটিক ফিভার। সেরকম কিছু হবে না তো! আমার মনের অত জোর নেই। মচকাব না, একেবারে মট করে ভেঙে যাব।
শোনো!
ভয়ে ভয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম।
জ্বর বেশ আঁকিয়ে আসছে। বুঝলে!
আজ্ঞে হ্যাঁ।
পা-টাও বেশ টাটিয়ে উঠেছে।
সন্ধেবেলা ডাক্তারবাবুকে একবার ডেকে আনি।
কোনও প্রয়োজন নেই। ডোন্ট বি নার্ভাস। বোসো না, দাঁড়িয়ে কেন? হ্যাঁ, যা বলছিলুম। বয়েস বাড়ছে, বুঝেছ?
আজ্ঞে না।
অ্যাঁ সেকী, বয়েস বাড়ছে, তুমি বুঝতে পারছ না! তুমি কি ভাবো, সময় স্ট্যাটিক। তোমার মা কত বছর হল মারা গেছেন জানো? চোদ্দো বছর হয়ে গেল। লং ফোর্টিন ইয়ার্স। তখন আমার। বয়েস ধরো পঁয়ত্রিশ কি ছত্রিশ হবে। নাউ আই অ্যাম ফিফটি। পঞ্চাশ বছর! হাফ এ সেঞ্চুরি মাই সন। পঞ্চাশটা বছর দুঃখে সুখে পার করে দিলুম। কী বলছ তুমি! অ্যান্ড লাস্ট ফোর্টিন ইয়ার্স আই। অ্যাম অ্যালোন। এ লোন ফাঁইটার। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। আই কেয়ার এ ফিগ ফর দেম। পৃথিবীকেও আমি থোড়াই কেয়ার করি। জন্মের দরজা দিয়ে স্টেজে ঢুকেছি মৃত্যুর দরজা দিয়ে নাচতে নাচতে বেরিয়ে যাব। যতদিন শক্তি আছে ততদিন অভিনয়।
