তা হলে তাই করুন। আপনার ছেলে সম্পর্কে এমন কিছু অন্যায় বলিনি। যা দেখছি হিতৈষী হিসেবে তাই বলেছি। পুত্রস্নেহে আপনি অন্ধ হয়ে আছেন। আপনি ওর মঙ্গল চান, না অমঙ্গল চান?
আপনি যেভাবে চান, আমি সেভাবে চাই না। আমি ক্রীতদাস তৈরি করতে চাই না। আমি চাই মানুষ। পরিপূর্ণ একটি মানুষ। তর্ক করে লাভ নেই। তর্কে বিবেকানন্দ আসবেন, রবীন্দ্রনাথ আসবেন। আপনাদের শিক্ষার মূল নড়ে যাবে। চুপ করে থাকাই ভাল। কাল পর্যন্ত আপনি আমার আত্মীয় ছিলেন, আজ আপনি একজন শিক্ষাগর্বী মদগর্বী ব্যারিস্টার। অনেক টাকা, অনেক ক্ষমতা, অনেক উচ্চাশা। আমরা রিক্ত ফকির। আদর্শ নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টাই আমার যৎসামান্য। বিলাসিতা।
কী আপনার আদর্শ? গাছ তৈরিটা আদর্শ না আগাছা গজিয়ে তোলা আদর্শ?
কনক এগিয়ে এসে বললে, আপনাদের এই কথা কাটাকাটি আমার একদম ভাল লাগছে না।
বাবা, আপনি চুপ করুন না। মুকুকে পড়াতে বসুন। বই খুলে বসে আছে অনেকক্ষণ।
মেয়ের কথায় মেসোমশাই সরে গেলেন। কনক শান্ত নরম গলায় জিজ্ঞেস করলে, একটু চা খাবেন মেসোমশাই?
চা? হ্যাঁ, তা খেলে হয়। না থাক।
কনক কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। চোখ ছলছল করে উঠছে। একটু ধরাধরা গলায় বললে, আপনারা বড় নিষ্ঠুর।
নিষ্ঠুর কেন? নিষ্ঠুরতার কী দেখলে?
আমরা কী সুন্দর ছিলুম, কী বিচ্ছিরি হয়ে গেলুম। বাইরে কী একটা ঝামেলা হল, আমাদের ভেতরটা সব ওলটপালট হয়ে গেল।
পিতা শব্দ করে হাসলেন, জীবন মানেই ঝোড়ো হাওয়া কনক, জীবন মানেই ঝড়। করার কিছু নেই।
সকাল থেকেই সংসারের চাতালে চড়া নাটক চলেছে। হাত নড়ছে, মাথা দুলছে, চোখ ছলছল হচ্ছে। দেয়ালের দিকে মুখ করে, অদৃশ্য কোনও শ্রোতাকে পিতা বললেন,
When the wind works, against us in the dark
come out, come out
It costs no inward struggle not to go.
বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। শব্দ শুনে পিতা বললেন, পুলিশ এল। গেট রেডি। শোনো তোমাকে বলে যাই, জেলখানার খাবার আমার গলা দিয়ে গলবে না, তুমি আমাকে রোজ একটু দুধ আর পাউরুটি দিয়ে আসবে। পারবে না?
আজ্ঞে হ্যাঁ। কেন পারব না? কিন্তু আপনাকে ছাড়িয়ে আনার কী হবে?
তোমার মাতামহের সাহায্য নিয়ো। তিনিই আমার রিয়েল ফ্রেন্ড। দুজনেই আমরা ঘরপোড়া। গোরু।
গাড়ির দরজা বন্ধ হল। এইবার জোড়া জোড়া বুটের শব্দ তুলে সিঁড়ি বেয়ে পুলিশের দল উঠে আসবে। আমাদের অপরাধটা কী? পুলিশ আসবে কেন?
সিঁড়িতে খুড়স খুডুস করে জুতোর শব্দ হচ্ছে। পুলিশ তো এমন ভদ্রভাবে আসে না। এ যেন পাঁচির ছাগল ছাড়া পেয়ে ওপরে উঠে আসছে। খোলা দরজার সামনে প্রতাপ রায়। আমাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, নাটকের মহড়া চলছে নাকি?
পিতা বললেন, কী ব্যাপার, তুমি?
চলে এলুম। ওই কিছু লিগ্যাল পরামর্শ, তা ছাড়া মেডিকেল চেকআপ। বিষয় বিষ! বিষয় বিষ! প্রতাপ রায়ের গলা শুনে মেসোমশাই ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। হাল-ভাঙা নাবিক যেন তীর দেখতে পেয়েছেন। কোস্ট অ্যাহয় কোস্ট অ্যাহয় বলে চিৎকার করে উঠলেন।
প্রতাপ রায় উদ্ভাসিত মুখে বললেন, কিছু আগেই এসে পড়লুম দুটো কারণে। কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ কোনটা কী লাগে জানা নেই, আমার ওখানে বসেই যদি দেখেন বড় বাধিত হই। তা ছাড়া কোনও কাজের দায়িত্ব নিলে, যতক্ষণ সেটা করতে না পারছি, ততক্ষণ ভেতরটা এত ছটফট করে, খেয়ে নেয়ে শুয়ে স্বস্তি পাই না। ওই মেডিকেল চেকআপ! আমার বন্ধু বললে, বেলাবেলি পেশেন্টকে নিয়ে আয়।
মেসোমশাই একমুখ হেসে বললেন, কর্তব্যপরায়ণ মানুষের লক্ষণ। এ এক দুর্লভ লক্ষণ। ভগবান আপনার মঙ্গল করুন।
আপনি আমাকে তুমিই বলবেন। আমি আপনার ছেলের বয়সি। চেহারাটাই যা একটু মোটাসোটা হয়ে গেছে।
মোটাসোটাই তো ভাল। বেশ ম্যানলি। পুরুষের চেহারা ফিনফিনে হলে মানায় না। মানুষ হবে হেলদি, ওয়েলদি অ্যান্ড ওয়াইজ।
ঘুঘুক ঘুঘুক করে হেসে প্রতাপ রায় বললেন, তা হলে চলুন।
কিন্তু বাবা খাওয়াদাওয়া যে হয়নি এখনও!
খাওয়াদাওয়া! ওটা একটা কথা হল! আপনারা যাচ্ছেন কলকাতার বিখ্যাত রায়বাড়িতে। যে-পরিবার অতিথি সৎকারে ইতিহাস তৈরি করে রেখে গেছে। যার পিতাকে জনৈক নিমন্ত্রিত, তবে রে শালা বলে, পঙক্তি থেকে উঠে খড়ম নিয়ে তাড়া করেছিলেন।
কেন গো!
এত খাইয়েছেন যে আর হাঁ করতে পারছেন না, সেই অবস্থায় জোর করে পাতে গোটাকতক একেবারে গাছপাকা ল্যাংড়া আম ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আপনি মেসোমশাই সেই বাড়িতে যাচ্ছেন।
পিতৃদেব এতক্ষণ একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, তুমি লেখাপড়া কতদূর করেছ প্রতাপ?
প্রতাপ রায় আমতা আমতা করে বললেন, স্কটিশে পড়তুম। ফোর্থ ইয়ারে বাবা মারা গেলেন। বিষয়সম্পত্তির চাপ এসে গেল। তাই ছেড়ে দিতে হল।
এমনভাবে, ‘ছেড়ে দিতে হল’, বললেন যেন খাঁচা খুলে পাখি ছাড়লেন।
পিতা বললেন, এটা তুমি আজ কী পরে এসেছ?
কেন? চিকনের কাজ করা পাঞ্জাবি।
মেয়েদের অন্তর্বাসে এই ধরনের কাজ দেখা যায় বটে।
তা যা বলেন।
এতে কিন্তু তোমাকে তেমন ম্যানলি ম্যানলি দেখাচ্ছে না। কীরকম যেন লোফার লোফার দেখাচ্ছে।
মেসোমশাই বললেন, রহিস আদমিরা এইরকম পাঞ্জাবিই পরেন। চমৎকার মানিয়েছে।
