দীনু বীরদর্পে বেরিয়ে গেল। সুখেন প্রেমের ধাতুতে তৈরি হলে, দীনু বীরের ধাতুতে। সুখেন ন্যাড়া মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললে, ইস, কী করে দিয়েছে মাইরি। সুযোগ পেলে এর বদলা একদিন আমি নেবই।
একা ভাল কাজ করা যায় সুখেন, অন্যায় কাজে দল চাই। একা তুই মঠ, মন্দির, মিশন করতে পারিস, পরনের কাপড় খুলে দান করে দিতে পারিস, কিন্তু অন্যায়ের প্রতিকার করতে পারবি না। রোজ কত অন্যায়ই তো মানুষ করছে, কোথায় তার প্রতিকার! সৎ কাজের চেয়ে পৃথিবী জুড়ে অসৎ কাজের পরিমাণ হাজার গুণ বেশি।
যা যা, বুড়োদের মতো ভিজেভিজে কথা আর বলিসনি তো! তুই ব্যাটা একেবারে বুড়ো হয়ে গেছিস। কাকাবাবু এখনও তোর চেয়ে ইয়ং আছেন।
দীনুর মোটরসাইকেল বাড়ির সামনে এসে থামল। এরই মধ্যে পোশাক পালটে এসেছে। ছোকরার শরীরে রাজপুত্তুরের রক্ত বইছে। তা না হলে এমন ‘লেডি-কিলারের’ মতো চেহারা হয়? পুলিশ কি পাড়ার লোক দীনুর টিকিও ছুঁতে পারবে না। দীনুর বাবার যা ইনফ্লুয়েন্স। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ওঠাবসা করেন। আমাদের অনেক ক্ষতি অনেকে করতে পারে। বাঁচাবার কেউ নেই।
সুখেনকে পেছনে বসিয়ে দীনু সশব্দে পাড়া কাপিয়ে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল, ন্যাড়াকে বেলতলায় ছেড়ে দিয়ে আসি।
সুখেনের ছেঁড়া ঝুলঝুলে প্যান্ট, কালিঝুলি মাখা জামা, ফেলে যাওয়া উৎকণ্ঠার মতো গলিতে পড়ে রইল। ওই সাজ এবার তোমাকে না পরিয়ে ছাড়ে। প্রেমের কাঁঠাল কোথায় পাকছে মানিক। শীতলাতলার আটচালায়। মায়ার সঙ্গে আর বেশি মাখামাখি করতে যেয়ো না। ওখানে ভোদার নজর পড়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী বড় প্রবল হে।
সিঁড়ির মাথায় পিতৃদেব। প্রশ্ন করলেন, ওরা কোথায় গেল?
কিছু বলে গেল না তো।
একবার জিজ্ঞেস করলে না! তোমার কি মনে হয় চ্যাপ্টার ক্লোজড হয়ে গেল?
আজ্ঞে না। এই তো সবে শুরু।
দ্যাটস রাইট। এই তো বুদ্ধি পাকছে। কে বলে, তুমি আমার পুঁয়ে পাওয়া ছেলে? আশঙ্কা নিয়ে বাঁচতে শেখো। বিপদের ঢেউ কেটে কেটে চালাও তোমার জীবনের জাহাজ। ছেঁড়াখোঁড়া ওগুলো কী?
সুখেনের জামাপ্যান্ট।
ফেলো না, ছাতে নিয়ে চলো।
কী করবেন?
কাকতাড়ুয়া তৈরি করব। প্রেমের কাকতাড়ুয়া। ও পাশের ছাতে, যে-পাশে গাছের টব, হতচ্ছাড়াদের বাড়ি, সেই ছাতে থাকবে কাকতাড়ুয়া। একে কী বলে জানো?
আজ্ঞে স্কেয়ার ক্রো।
তোমার মাথা। একে বলে সাইকোলজিক্যাল টর্চার। ওরা ঘুরবে ফিরবে আর দেখবে। ক্রমশই মেন্টালি সিক হয়ে পড়বে। ম্যাকবেথের ভোজসভায় ব্যাঙ্কোর ভূত। রাজার আসন দখল করে বসে আছে। কেউ দেখতে পাচ্ছে না, পাচ্ছে খুনি ম্যাকবেথ। চিৎকার করে বলছে, তুমি মাথা নাড়তে পারো না, তুমি কথা বলতে পারো না, তোমাকে আবার ভয় কীসের! পরমুহূর্তেই আর্তনাদ, ঈশ্বর, মর্গ থেকে যদি মৃতদেহ বেরিয়ে আসে, যাদের কবরে রেখে এসেছি তারা যদি কফিনের ডালা খুলে একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে, old mouments, shall be the maws of kites. তোমার কেমন লেগেছিল কাল?
কী লাগার কথা বলছেন?
যখন বালিশটালিশ বের করতে করতে বললুম, তোমার সঙ্গে এক বিছানায় শুতে আমার ঘেন্না করছে।
খুব খারাপ।
মনটা কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে যায়নি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
দেহ ঠিক রইল, মনটা কুঁচকে এতটুকু হয়ে গেল। কী ভীষণ যন্ত্রণা, তাই না? একে বলে সাইকোলজিক্যাল টর্চার। মানুষকে সংযত রাখার জন্যে মনের মধ্যে ভূত ঢোকাতে হয়। তা না হলে শয়তান বাড়তে বাড়তে দেবতাকে গ্রাস করে ফেলে। রান্না মনে আছে, না ক’দিনের সুখে ভুলে বসে আছ
না, মনে আছে।
তা হলে চলে এসো ওপরে। পুরনো অভ্যাস আজ আবার ঝালাই হবে।
উত্তরের বারান্দার একপাশে কনক উদাস মুখে বাগানের গাছপালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কীসের যেন প্রত্যাশা! গ্রহান্তরের কোনও জীব এসে নামবে বাগানের কোণে। বড়ঘরে মেসোমশাই পায়চারি করছেন। পিতৃদেবের হাঁটাচলা করতে অসুবিধা হচ্ছে। সামান্য খোঁড়াতে হচ্ছে।
মেসোমশাই বললেন, হরিদা, আপনার হঠাৎ এই সিদ্ধান্তের কোনও কারণ খুঁজে পেলুম না।
কারণ দেখিয়ে কোনও কাজ করার অভ্যাস আমার কোনওকালে ছিল না, আজও নেই। আমাদের রান্না আমরাই করে নোব, যেমন করে আসছি এতকাল।
কেন, বলনে তো!
আবার কেন? কোনও কেন নেই। সিদ্ধান্ত ইজ সিদ্ধান্ত।
তার মানে আমাদের এখান থেকে চলে যেতে বলছেন।
তা তো বলিনি। কনক কথা কাটাকাটি শুনে ঘরে এসেছে। ছলছলে চোখে বললে, আপনি কেন এত রেগে গেলেন মেসোমশাই। এই তো কালই বললেন, তোমার মতো মেয়ে পাশে থাকলে সংসারে ফুল ফুটিয়ে ছেড়ে দিতুম।
হ্যাঁ বলেছিলুম। যে-আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা সূর্যের প্রত্যাশা করি, সে আকাশেও হঠাৎ মেঘ আসে, সূর্য ঢাকা পড়ে যায়, দিনে ছাতল ধরে। আশা আর প্রত্যাশার মাঝখানে অনিশ্চয়তার বিশাল ব্যবধান। অনেক বাধা দিতে চাইলেও দেওয়া যায় না, নিতে চাইলেও নেওয়া যায় না। সাইকোলজিক্যাল ম্যানের এই হল ট্র্যাজেডি। মনের বিশুদ্ধ নীল আকাশে অহংকারের মিশকালো মেঘ।
মেসোমশাই বললেন, আপনি ভয়ংকর ইমোশানাল। সামান্যকে অসামান্য করে তুলে নাটক। করতে চান।
কী বললেন, ইমোশান! এই চেয়ারের ইমোশান নেই, ওই টেবিলের নেই, দেয়ালের নেই। ইমোশান আছে বলেই আমরা মানুষ। ইমোশানই আমাদের মোশান। আবেগই আমাদের প্রাণ। বিশাল এই রঙ্গমঞ্চে সারাজীবন আমি নাটক করে যাব।
