সে কাকাবাবু এক নোংরা ব্যাপার। দাদাকে তো আপনি চেনেন না। অতি নোংরা মানুষ। বউদিকে তো প্রায় ত্যাগই করেছে। নিত্য কিল, চড়, ঘুসি, লাথি। বাইরে আসা যাওয়া আছে। রেস আছে। নেশা আছে। আর আছে, আমাকে ফাঁকি দিয়ে বিষয়সম্পত্তি একা গ্রাস করার ইচ্ছে। জবার কাকার হাতে কালোবাজারির পয়সা। বাড়িটা তাকে বেচতে পারলে, দু’তরফেরই লাভ। এর ফুর্তি, ওর সম্পত্তি। রতনে রতন চিনেছে।
আই সি। জবার বয়েস কত? সাবালিকা?
কুড়ি-একুশ তো হবেই।
বহত আচ্ছা! তবে তো কোনও ভয়ই নেই। কী বলেন বিনয়দা?
হ্যাঁ, আইন বলে, সাবালিকা স্বেচ্ছায় তার পছন্দমতো ছেলেকে বিয়ে করতে পারে।
তা হলে, আমরা লড়ে যাই। গেট রেডি ফর এ লিগ্যাল ফাঁইট। দীনুর অ্যাগেনস্টে ওরা ফৌজদারি করবেই। পয়সা আছে, ছেড়ে কথা বলবে না। সুখেনকেও ফাসাবার চেষ্টা করবে।
মেসোমশাই হু হু করে হেসে বললেন, আপনি একটা লিগ্যাল এড সোসাইটি খুলুন হরিদা। যেভাবে হুড়হুড় করে কে আসছে, আমি এখানেই পার্মানেন্টলি থেকে যাই।
কথার মধ্যে ব্যঙ্গের ছোঁয়াটুকু পিতা ধরতে পারলেন না। উত্তেজনায় মেতে আছেন। আমাকে বললেন, টারপেন্টাইনের বোতল আর একফালি ন্যাকড়া নিয়ে এসো। আর হ্যাঁ, আমার বাটলারের ক্ষুরটাও নিয়ে এসো। মাথাটা পুরো চেঁচে দিই।
মেসোমশাই ওপরে উঠতে উঠতে বললেন, কখন কী নিয়ে যে মেতে ওঠেন আপনি! নিজের পা-টা আগে সামলান। নিজের ছেলেটাকে আগে মানুষ করুন।
তার মানে? পিতা ফোঁস করে উঠলেন, ও কি অমানুষ হয়ে আছে?
মানুষ বলতে যা বোঝায় তা কি হয়েছে? যদি মনে করেন হয়েছে, আমার কিছু বলার নেই।
মানুষ বলতে আপনি কী বোঝেন?
এডুকেশন। এম এ করুক। পি আর এস, পি এইচ ডি করুক। বড় ডাক্তার, কি ইঞ্জিনিয়ার হোক। সারাদিন বাড়ি বসে আছে, ফস্টিনস্টি করছে। বড় বড় কথা বলছে। এটা কি মানুষ হবার লক্ষণ!
বিনয়দা, মানুষ বলতে আপনি বোঝেন তোতাপাখি, আমি বুঝি মানুষ। চরিত্রে, আচারে, আচরণে, সংস্কৃতিতে, সহবতে একটা পরিপূর্ণ মানুষ ইউনিভার্সিটির দরজা গলে বেরোয় না, বেরোয়। পরিবারের ফার্নেস থেকে। একদিন ইংরিজি নিয়ে ওর মুখোমুখি বসবেন নাকি? বসবেন সাহিত্য আর সংস্কৃতি নিয়ে? ধর্ম নিয়ে একদিন একটু আলোচনা হোক না। পরীক্ষা করুন না ওর ধৈর্য, সংযম, লোভ, সহিষ্ণুতা।
ওতে জাগতিক কিছু হয় না হরিদা। ছাপ চাই, ছাপা নামের পেছনে এত বড় একটা ন্যাজ চাই, ন্যাজ। আপনার ছেলে আপনার কাছে হিরের টুকরো হতে পারে, জগতের বিচারে কয়লা।
মেসোমশাই দুমদুম করে ওপরে উঠে গেলেন, সিনেমার ব্যারিস্টারের ভঙ্গিতে। হঠাৎ আমার বয়েস যেন বিশ বছর বেড়ে গেল। এতসব গুণের কোনও ঘনঘটাই আমার নেই। আমি মহাপুরুষ? কাপুরুষ বললে শোভা পায়। ধৈর্য? ছুঁচে সুতো পরাবার সময়েই ধৈর্য বোঝা যায়। সহিষ্ণুতা? একটার বেশি দুটো কাজের কথায় যার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, সে হল সহিষ্ণু? সকালে বিছানা ছেড়ে ওঠার সময় যে বেতো ঘোড়ার মতো আর্তনাদ করে সে হল সহিষ্ণু? আমার লজ্জা বাড়াবার। জন্যে কেন এসব বললেন? মেসোমশাই ঠিকই বলেছেন আমার দ্বিভুজে এমন কোনও হাতিয়ার নেই যা দিয়ে জগতের সঙ্গে লড়তে পারি। ময়লা পইতেতে চাবি বেঁধে, হাতে শালগ্রাম নিয়ে বাড়ি বাড়ি পুরুতগিরি করে যাকে দূর ভবিষ্যতে পেট চালাতে হবে, তার জন্যে পিতার এত গর্ব মানায় না। লোকে বলবে, লাভ ইজ ব্লাইন্ড। অহংকারী মানুষটি বড় অপমান করে গেলেন। ন্যাজ নেই বলে এত অসম্মান?
তারপিন দিয়ে সুখেনের মুখের আলকাতরা তোলা হল ন্যাকড়া দিয়ে ঘষে ঘষে। মাথা তেল চুকচুকে করে কামানো। বেশ সাধু সাধু দেখাচ্ছে। ব্যাপার অনেক দূর গড়াবে। দীনু এক সেট প্যান্ট, জামা আর টুপি এনে দিয়েছে। বাথরুমে ঢুকে সুখেন চান করে নিয়েছে। রাস্তায় বেরোতে লজ্জা পাচ্ছে। মানুষের ভুলতে সময় তো লাগবেই। রাত ছাড়া এ প্যাচার আর রাস্তায় বেরোবার উপায় নেই। কাকে ঠোকরাবে।
সুখেন বললে, আমি আজই দুর্গাপুর চলে যাব।
দীনু বললে, মামার বাড়ি। তোর বউয়ের কী হবে?
এক রাতের বউ ভাই। তাকে আর পাব কোথায়? চিরাগ কাহা, রোশনি কাঁহা। তাকে বোধহয় উলঙ্গ করে ঘরে চাবি দিয়ে রেখেছে।
সেকী রে!
আরে ওটা একটা পাপের বাড়ি।
সুযোগ পেলেই তাল বুঝে পাখি দেখবি উড়ে আসবে তোর খাঁচায়। সবুরে ম্যাওয়া ফলে রাজা।
কোনও পরিখাই খুব প্রশস্ত নয় এবং কোনও দেয়ালই খুব উঁচু নয়। ভালবাসা যদি থাকে, দু’জনে এসে মিলবেই। কোনও ঝড়ই খুব ভয়ংকর নয় এবং কোনও রাত্রিই খুব অন্ধকার নয়। ভালবাসা যদি থাকে, দু’জনে পরস্পরকে দেখবেই। যেমন ভাবেই হোক জ্যোৎস্না আসবে, তারার আলো ঝরবে, যেমন ভাবেই হোক মোমবাতি, আলো বা একটি লণ্ঠন জ্বলবেই।
কার কবিতা রে? পরে আমাকে লিখে দিস তো। বাঁধিয়ে রেখে দোব। আমার জন্যেই লেখা মনে
যে-গাড়ায় পড়েছিস, সেই গাড়া থেকে আগে ঠেলে ওঠ। মাথায় সেই কোকড়ানো চুল আবার ফিরে আসুক, তারপর আবার প্রেমের গর্তে পা দিবি। ব্যাটা ন্যাজ কাটা শেয়াল।
প্রেম হল ফলন্ত গাছের ফুলের মতো। গাছ যতদিন না মরছে ততদিন ঋতুতে ঋতুতে ফুল ফুটবেই।
এখনও তোর কাব্য আসছে রে দামড়া! নাঃ তুই রিয়েল প্রেমের ধাতুতে তৈরি। বোস, মোটরবাইকটা বের করে আনি। তোকে এ পাড়া থেকে পগারপার করে দিয়ে আসি।
