পিতৃদেবের একপাশে মেসোমশাই আর একপাশে ডাক্তারবাবু, হাতে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ। দুই বোন আর এক জানলায় পাশাপাশি। আমি ফাঁকেফোকরে চোখ রেখেছি। দীনুর বীরত্ব যত বাড়ছে আমার ভেতরটা তত হুহু করে জ্বলছে। শামুকের মতো বীরত্বের ডান্ডা বেয়ে দীনু ওপরে উঠছে। হিরো, সুপার হিরো, সুপ্রিম হিরো, ক্রমশই ঝান্ডা উঁচু হচ্ছে আর আমি ক্রমশই ঠান্ডা হয়ে আসছি। আড়ে আড়ে তাকাচ্ছি কনকের মুখের দিকে। চোখ ক্রমশই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। কনকের মনের দেয়ালে দীনুর বীরত্বের গজাল পেরেক এক এক ঘুসিতে ইঞ্চি ইঞ্চি করে ঢুকছে। সাধে বলে বীরভোগ্যা বসুন্ধরা!
বৃত্তাকার একটা জায়গায় চুনকালি মাখা, আধ-মাথা কামানো, ছেঁড়া প্যান্ট পরা সুখেন আমাদের ‘ফক্স সাহেবে’র মতো দাঁড়িয়ে আছে। মাঝেমধ্যে ফক্স সাহেব এখনও এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। বেঁটেখাটো মানুষ। মাথায় শোলার টুপি। পরনে ঢোলা কোটপ্যান্ট। প্যান্টের তলা ছিঁড়েখুঁড়ে ঝুলঝুলে। পায়ে গোড়ালি খয়ে যাওয়া তালিমারা বুট জুতো। মুখে চুন আর কালি। প্রেমের নয়, জীবিকার। পেছনে এক হাফপ্যান্ট পরা কিশোরের মাথায় বিশাল কাঠের সিন্দুক। সাহেব চলেছে হুপ হাপ শব্দ করতে করতে। ম্যাজিক ফ্যাজিক দেখায়। কোনওদিন দেখা হয়নি।
দীনু তাল ঠুকে বললে, আর কে আছিস চলে আয়।
পিতৃদেব বললেন, আমারও ইচ্ছে করছে গোটাকতক ঘুসি হাঁকড়ে আসি।
ডাক্তারবাবু বললেন, ব্যাপারটা কী তা জানা আছে?
অনুমান করতে পারি, এ ফর্ম অফ সোশ্যাল র্যাগিং।
কেন, সে খবর রাখেন? পুলিশ কেসে পড়ে যাবেন যে!
কেন?
ওই ছেলেটা কাল একটা মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছিল। আজ ধরা পড়েছে। সেই অপরাধের উচিত শাস্তি চলেছে। এর মধ্যে দীনুর নাক গলাবার কোনও প্রয়োজন ছিল না।
আই সি! আমাদের পাশের বাড়ির সেই মেয়েটি। বেশ, ছেলেটাকে ধরে পুলিশে দিক। দেশে আইন আছে, আদালত আছে। কতকগুলো অর্বাচীন ইডিয়েটস হাতে আইন তুলে নেবে, আর আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাধার মতো দেখব! সে তো হতে পারে না। সভ্য মানুষ সভ্য উপায়ে বিচার করবে। আমরা জঙ্গলে বাস করছি না। আমরা একদল হনুমান নই? কিল হিম। কিল দ্যাট বাস্টার্ড।
জবার কাকা আধলা একটা ইট তুলে দীনুর দিকে এগিয়ে আসছিল। আহত পা নিয়ে পিঅ দুদ্দাড় করে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিলেন। মেসোমশাই চেপে ধরলেন, করছেন কী? আপনার সে বয়েস আছে?
পিতা রুখে দাঁড়ালেন, অন্যায়ের প্রতিবাদে বয়েস আবার কীসের বাধা?
অন্যায় বলছেন কেন? ওরা যা করছে ঠিকই করছে, এগজাম্পল ইজ বেটার দ্যান প্রিসেপ্ট।
একে এগজাম্পল বলে না। এ হল চরম অসভ্যতা। মনুষ্যত্বের অবমাননা। আই মাস্ট রেজিস্টার মাই প্রোটেস্ট উইথ এ ব্লো।
ডাক্তারবাবু বললেন, আপনার পায়ের অবস্থা খুব ভাল নয় হরিবাবু। তা ছাড়া এই উটকো ঝামেলায় আপনার মতো মানুষের জড়িয়ে পড়াটা ঠিক নয়।
এসকেপিস্ট। ইউ আর অল এসকেপিস্ট। মধ্যবিত্তের মিন মেন্টালিটিতে ভুগছেন।
দীনু হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, পালাচ্ছিস কেন শালারা? পালাচ্ছিস কেন?
পিতা বললেন, ইস, ইস, শালাটা না বললেই পারত।
উত্তেজনার ছোঁয়া কনকের মনেও লেগেছে। জানলার ধার থেকে রিলে করলে, সব ব্যাটা পালাচ্ছে। মেসোমশাই বললেন, দিজ জানলাজ, অফুল উইনডোজ, ভদ্রবাড়িতে জানলা থাকা উচিত নয়। ভেতরে যাও। তোমরা ভেতরে যাও।
ডাক্তারবাবু বললেন, চেম্বারে রুগি বসিয়ে এসেছি। বি সেনসিব। আমাকে আমার কাজটা সেরে নিতে দিন।
পিতা হাতটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, নিন ফুঁড়ে নিন।
বসুন। মাথা ঘুরে যেতে পারে।
আমার সে মাথা নয় ডাক্তার। অ্যানেসথেসিয়া ছাড়াই আমার তিন-তিনটে দাঁত তুলিয়েছি।
নীচে থেকে দীনু বীরের মতো হাঁক ছাড়ল, পিন্টু, নেমে আয়।
সুখেন আমাদের গলিতে এসে বসেছে। সারাশরীর থিরথির করে কাঁপছে। দু’চোখে দু’রঙের জল গড়াচ্ছে। চুন-মাখানো গালে মুক্তোর দানা, আলকাতরা-মাখানো গালে কয়লার রস। দীনু এক ধমক লাগিয়ে বললে, তুই আমাদের একবারও বললি না কেন ইডিয়েট? আমরা দলবল নিয়ে রেডি থাকতুম। এবার তুই পাড়ায় মুখ দেখাবি কী করে?
পিতৃদেব নীচে নেমে এলেন। প্রথমে ডাক্তারবাবু, সবশেষে মেসোমশাই। ডাক্তারবাবু যেন পালিয়ে বাঁচলেন। পিতা সুখেনকে ভাল করে দেখে বললেন, তুমি তো চক্রবর্তী বাড়ির ছেলে?
উত্তর দিল দীনু, আজ্ঞে হ্যাঁ।
তুমিই তো ট্র্যাপিজের খেলা দেখাও ব্যায়াম সমিতিতে?
দীনু বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ।
তোমার এই দুর্মতি হল কেন? দেশে কি মেয়ের অভাব!
সুখেন ধরাধরা গলায় বললে, কাকাবাবু, আমার একলার দোষ নয়। জবা বললে, কলিতেও আর একবার অহল্যা উদ্ধার হোক। দুটো মা আর একটা কাকাতে মিলে আমার জীবন শেষ করে দিলে।
এই বাজারে একটি বাঙালি মেয়েকে উদ্ধার করার চেষ্টা অহল্যা উদ্ধারের চেয়েও মহৎ কাজ। জজেও মানবে। কী বলেন বিনয়দা?
মেসোমশাই হিসেবির হাসি হাসলেন। স্বাভাবিক। মাথায় মাথায় যাঁর দুই মেয়ে তাঁকে এই ব্যাপারে রায় দিতে হলে অবশ্যই অনেক ভাবতে হবে। বলা যায় না, আবার কোনও রামচন্দ্র যদি এদিকে হঠাৎ পা বাড়ান, তা হলে জয় রাম না বলে ছিছি রামই বলতে হবে।
পিতা সুখেনকে বললেন, তোমার দাদা হঠাৎ ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে তোমাকে নিয়ে বাঁদর নাচ করল কেন?
