ওদিকে মনে হয় সুখেনকে নিয়ে প্রসেশন বেরিয়ে পড়েছে। মোহনদার সেলুনের সামনে ক্যানেস্তারা বাজছে মহরমের বোলে। এসব কাজে লোকের অভাব হয় না। কারও সর্বনাশ করার চেয়ে উৎসাহের কাজ আর কী আছে!
ওদিককার জটলার দিকে তাকিয়ে ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কী হচ্ছে বলো তো? আজ কি কোনও পুজোপার্বণ আছে? ছট পুজোটুজো!
আজ্ঞে না। সুখেনের মাথা ন্যাড়া করা হচ্ছে।
ও, মানসিক ছিল!
মানসিক নয়। কাল রাতে জবা বলে একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে।
ও, ট্রাইব্যাল ম্যারেজ।
না, রাক্ষস বিবাহ।
খেয়ে ফেলেছে।
খাবে কেন? সুখেন আমাদের চক্রবর্তী বাড়ির ছেলে। জবাকে হরণ করে নিয়ে কাল রাতে কালীঘাটে গিয়ে বিয়ে করেছিল, আজ সকালে ধরা পড়েছে। এখন মেয়ের কাকা আর ছেলের দাদা দুজনে মিলে ধরে ন্যাড়া করে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরাবে।
জবা কোন বাড়ির মেয়ে বলো তো?
ওই তো যার বাবার দু’বার বিয়ে, অনেকদিন হল নিরুদ্দেশ।
ও, বিশুবাবুর মেয়ে। আরে সে মেয়েটার তো খুব খারাপ একটা অসুখ আছে গো! ছেলেটা রামছাগল।
পায়ের ধপাস ধপাস শব্দ করে ডাক্তারবাবু সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগলেন। দীনু পাকা ডাক্তারের মতো কাজ করেছে। ওই কড়কড়ে বালি আর চুন একটু একটু করে ক্ষতস্থান থেকে ছাড়িয়েছে। পায়ের অবস্থা দেখে গা শিরশির করে ওঠে। নুনছাল গুটিয়ে পাকিয়ে গেছে। সাদা দগদগে। ঘামের মতো বিন্দু বিন্দু রক্ত বেরোচ্ছে। কনক পাকা নার্সের মতো দীনু ডাক্তারের হুকুম তামিল করছে। আমি কোথায় প্রভু! এই এক্সপার্টদের জগতে আমি এক কুণ্ড। কিছুই পারি না, কিছুই জানি না। তফাত যাও তফাত যাও বলে সবাই হড়হড় করে এগিয়ে চলেছে। দীনুতে কনকেতে যেরকম মাখামাখি, ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’ অবস্থা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে শুভযোগ মেসোমশাইয়ের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। কনকের বাবাও বিলেত-ফেরত, দীনুর বাবাও বিলেত-মারা মানুষ। দুই বেয়াইয়ে জমবে ভাল। মিথ্যে বলে লাভ নেই। দু’জনকে পাশাপাশি দারুণ মানিয়েছে। দীনু একটা জামাইয়ের। মতো জামাই। কনক একটা বউয়ের মতো বউ। গন্ধর্ব আর কিন্নরী। চোখের সামনে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। না, আমার মনে কোনও ক্ষোভ নেই। আমি নিজে ঈশ্বরের দরবারে প্রার্থনা জানাচ্ছি, নকের যেন দীনুর সঙ্গেই বিয়ে হয়। আজ হোক, কাল হোক, ছমাস পরে তোক, যেন হয়। মেসোমশাই কাঁচা ছেলে নন। দু’মেয়ের বাপ। জামাই চেনেন।
ডাক্তারবাবু দীনুকে ভালই চেনেন। বললেন, বাঃ তুমি তো আমার কাজ অনেকটা এগিয়েই রেখেছ। সি এ না হয়ে ডাক্তার হলেই তো পারতে।
মেসোমশাই বললেন, তুমি বুঝি সি এ পড়ছ? খুব ভাল লাইন। যেমন রেসপেক্টবল তেমনই রিওয়ার্ডিং।
এই তো, এই তো মাছে টোপ গিলেছে। ঈশ্বর আমার কথা শুনেছেন। ডাক্তারবাবু পিতার পায়ের সামনে মোড়ায় বসলেন। বসে বললেন, বাঃ, এই তো বেশ জট পাকিয়েছেন। বালিতে, চুনেতে, চামড়াতে, রক্ততে একেবারে ক্যাডাভারাস কাণ্ড।
ডাক্তারি ব্যাগটা বেশ প্রাচীন হয়েছে। চামড়ায় কোচ ধরেছে। যৌবনের বাঁধুনি নেই। মেঝের ওপর পড়ে আছে থেকে। নিচু হয়ে একটা সার্জিক্যাল কাচি বের করতে করতে ডাক্তারবাবু বললেন, হরিবাবু, আপনি হলেন আমাদের পরীক্ষা। অঙ্কে যেমন কম্পাউন্ড ইন্টারেস্ট, রুগিদের মধ্যে সেইরকম আপনি। একেবারে জটিল জলতরঙ্গ। কী কায়দায় এমন করলেন? পা দিয়ে পিলার ভাঙছিলেন, নৃসিংহ অবতারের খোঁজে?
পিতা মৃদু মৃদু হাসছেন। মুখে একটু গর্বের ভাব। হেঁ হেঁ বাবা করেছি একটা কাণ্ড। আমার কী! আমি তো পা ছড়িয়ে বসে আছি। ম্যাও সামলান আপনি। কাঁচি দিয়ে কুট কুট করে চামড়া কাটছেন। গা শিরশির করছে। দীনুর কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। পাশেই হেলেন কেলার। তিনিও নির্বিকার।
ক্যানেস্তারা বাদ্য বাড়ির সামনে এসে পড়েছে। ইস, সুখেন চলেছে। একগালে চুন, একগালে কালি। ডাক্তারবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কলির কেষ্ট চলেছে হে। শ্রীরাধিকা কি সঙ্গেই আছেন?
পিতা মুখ তুলে তাকালেন। নীরব প্রশ্নে জানতে চান, কী হচ্ছে রাস্তায়। রাধাকৃষ্ণ আবার কোথা থেকে এলেন। দীনু তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। আমি এক্ষুনি আসছি, বলে, তিরবেগে দৌড়োল সিঁড়ির দিকে।
ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুলে ছোট্ট করাত ঘষতে ঘষতে ডাক্তারবাবু বললেন, আজকালকার ছেলেপুলে যা হয়েছে, শান্তিতে আর সংসার করা যাবে না হরিবাবু। ছেলে থাকলেও মুশকিল, মেয়ে থাকলেও মুশকিল।
উত্তরে পিতা একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, বলা হল না। রাস্তায় ঘুসোঘুসির শব্দ হচ্ছে। কে কাকে ধরে প্রচণ্ড পেটাচ্ছে।
সিরিঞ্জের নিডলটি হাতে ঢোকাতে ঢোকাতে ডাক্তারবাবু বললেন, দীনুকে বিশ্বাস নেই। গিয়েই মনে হয় মারামারি শুরু করেছে।
পিতা লাফিয়ে উঠলেন, অ্যাঁ, বলেন কী! দীনু মারামারি করছে।
ডাক্তারবাবু বলছেন, করেন কী, করেন কী! নিডল ভেঙে যাবে।
.
দীনু ধরাধধড় ঘুসি চালাচ্ছে। যে ব্যাটা নেচে নেচে টিন পেটাচ্ছিল সে টিন ফেলে দৌড় মেরেছে। সুখেনের দাদাটা একপাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জবার কাকা, সেই পালের গোদাটা হাতের আস্তিন গুটিয়ে দূর থেকে একবার করে ঘুসি তুলছে আর বলছে, হু আর ইউ? হু আর ইউ?
দীনুর শুধু হাত নয়, পা-ও চলছে সমানে। পিতার ওপর-বাহুতে এ টি এস সামান্যই ঢুকেছে। ডাক্তারবাবু তাড়াতাড়ি নিডলটা বের করে নিয়েছেন। নইলে ভেঙে ঢুকে যেত। রক্তের স্রোতে বেলকাঁটা ঘুরছে, সঙ্গে দোসর জুটত ভাঙা উঁচ। রাস্তার দিকে জানলায় দাঁড়িয়ে উত্তেজনায় পিতা পা ঠুকছেন, আর একসময়ের কৃতী ছাত্র দীনুকে উৎসাহ দিচ্ছেন, শাবাশ! শাবাশ! চালিয়ে যাও। মেরে ফ্ল্যাট করে দাও। সব বাড়ির জানলাতেই সারি সারি মুখ।
