মেসোমশাই উদ্বেগ-মাখানো গলায় বলছেন, কিছু তো একটা করতে হয় হরিদা। বালিতে চুনেতে রক্তে মাখামাখি।
হ্যাঁ, কিছু তো একটা করবই। তবে যতটা বেরোবার, আগে বেরিয়ে যাক। আপনারা ব্যস্ত হবেন না। এরকম দুর্ঘটনা আমার প্রায়ই হয়। একে বলে প্রোফেশনাল হ্যাজার্ড।
দীনু আমার পেছন পেছন ওপরে উঠে এসেছে। একমাথা কোকড়ানো কোঁকড়ানো চুল। ফরসা টকটকে রং। বুক-খোলা টি শার্ট। এতখানি চওড়া বুক। এ পাড়ার সবচেয়ে শিক্ষিত পরিবারের ছেলে। কিছুকাল পিতার কাছে অঙ্ক বুঝে নিতে আসত। লেটারফেটার নিয়ে পাশ করেছে। এখন সি এ পড়ছে। পাশ করেই নিজেদের ফার্মে বসে পড়বে।
দীনু পায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে বললে, পিন্টু, শিগগির গরম জল আর বোরিক তুলে নিয়ে আয়।
পিতা হাসিহাসি মুখে বললেন, আরে, দীনু যে, কেমন আছ?
আমি তো ভাল আছি কাকাবাবু, আপনি এ কী কাণ্ড করেছেন?
তোমার বাবা কেমন আছেন?
চিঠি দিয়েছেন। ভালই আছেন।
তিনি এখন কোথায়?
লন্ডনে।
আই সি।
আমি ডক্টর সেনকে ডেকে আনি।
প্রয়োজন হবে না। মাইনর ব্যাপার। লেট মি ব্লিড। সবকিছুরই একটা শেষ আছে। অত বড় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও একসময় শেষ হয়েছিল।
তা হয়েছিল, কিন্তু আহতদের এখনও ফেলে রাখা হয়নি। পিন্টু, তুই ডাক্তারবাবুকে ডেকে নিয়ে আয়। আমি ড্রেসিংটা করে রাখি।
তুই পারবি?
পারব না মানে? রেডক্রসের ট্রেনিং নিয়ে রেখেছি কী জন্যে! তুই ডাক্তারবাবুকে একেবারে ধরে নিয়ে আয়। বলবি এ টি এস নিয়ে আসতে।
পিতা বললেন, ডাক্তার, এ টি এস কিছুই লাগবে না। এমন একটা মারাত্মক কিছু হয়নি। সামান্য একটু বরইজ, একটু ব্লিডিং।
এখন আপনি আমাদের হাতে। আমাদের মতে চলতে হবে। পিন্টু তুই চলে যা।
সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে শুনলাম দীনু কনককে বলছে, দিদি, গরম জল বসিয়েছেন?
রাস্তায় বেরিয়ে মনে হল, পাড়া আজ বিশেষভাবে জেগে উঠেছে। পাড়ায় সাড়া পড়ে গেছে। মোহনদার সেলুনের সামনে বিশাল ভিড়। সুখেনের মাথা কামানো হচ্ছে। সমাজের চোখ লাল হয়েছে, পেট গরম হয়েছে। কোথা থেকে একদল দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ নীতির হাতিয়ার নিয়ে নিরস্ত্র একটি ছেলেকে চেপে ধরেছে। বাধা দেবার কেউ নেই। সুখেন কী এমন অন্যায় করেছে! এমনি সব নাকে কেঁদে অস্থির, মেয়ে বড় হয়েছে, পাত্র জুটছে না, জুটলেও কাড়ি টাকা চাইছে, আর পাত্র যখন নিজে যেচে এসে মাথা মুড়োতে চাইছে, তখন সব বেঁকে বসছেন। মানুষ এক আজব চিজ।
দু-চারজন রুগি বসে আছেন চেম্বারে। ডাক্তারবাবু এক অল্পবয়সি মহিলার বুকে স্টেথিস্কোপ চেপে ধরে বলছেন, জোরে জোরে নিশ্বাস নাও, আরও জোরে, হাঁ করে। হাঁ করে নিয়ে ভস করে ছাড়ো। টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে এক তিরিক্ষি চেহারার ভদ্রলোক ক্রমাগত বলে চলেছেন, ছ’টা ক্যাপসুল পড়ে গেল ডাক্তারবাবু, এখনও ভসভসে ভাবটা যে গেল না।
ডাক্তারবাবু নির্বিকার। বুক থেকে পিঠে চলে গেছেন। মহিলা হাপরের মতো ভসভস করে চলেছেন। পিঠ পরীক্ষা করতে করতেই চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। মুচকি হাসি খেলে গেল মুখে। স্টেথিস্কোপ তুলে নিয়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, কী সংবাদ বিদুর?
তিরিক্ষি ভদ্রলোক মরিয়া হয়ে বললেন, ভসভসে ডাক্তারবাবু।
আরে দুর মশাই। আপনার ভসভসের নিকুচি করেছে। রোজ মাংসর স্টু খাওয়াচ্ছেন?
আপনি তো বলেই খালাস। অত পয়সা কোথায়?
তা হলে ভসভসেই হবে। কারও বাবার ক্ষমতা নেই জিয়ার্ডিয়ার রুগিকে হাই প্রোটিন ছাড়া ভাল করে।
ভদ্রলোক বললেন, ডাক্তারবাবুদের এই এক দোষ, বড়লোক, গরিবলোক আলাদা করতে পারেন না। সব যেন সমান। মুড়িমিছরির এক দর।
বড়লোকের অসুখ বাধিয়ে গরিব গরিব করে চেল্লালে আমি কী করব? ভগবানের দরবারে নালিশ পেশ করুন। ওই হলদে ট্যাবলেট তিরিশটা খাওয়ান। শাকপাতা একদম চলবে না।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কী খবর?
একবার যেতে হবে ডাক্তারবাবু। বাবার পায়ে প্লাস্টার ভেঙে পড়েছে।
প্লাস্টার করতে হবে?
আজ্ঞে না, কেটেকুটে গেছে। এ টি এস দিতে হবে।
তোমার বাবার চিকিৎসা করতে সাহস হয় না। আমার জ্ঞান বেরিয়ে পড়বে। উনি হলেন ডাক্তারের ডাক্তার। চলো, দেখি কী করা যায়!
কোঁত পেড়ে চেয়ার থেকে নিজেকে ঠেলে তুললেন। বয়েসের ভার, মেদের ভার। মেয়েরা মিউমিউ করে বললেন, বেরিয়ে যাচ্ছেন! আমরা অনেকক্ষণ বসে আছি।
আরও একটু বসুন। সবুরে ম্যাওয়া ফলে। ওষুধের গন্ধে অসুখ অর্ধেক ভাল হয়ে যাবে।
রিকশার তিনের চার ভাগে ডাক্তারবাবু। একের চার ভাগে আমি। ঈশ্বরের কী সুন্দর ব্যালেন্স। মানুষের শরীরেও জোয়ার-ভাটা। এদিক ফোলে তো ওদিক চোপসায়। রিকশাঅলা টানতে পারছে না। লোড তো কম নয়। ডাক্তারবাবু নস্যি নিতে নিতে বললেন, তোমার বাবার একটা বিয়ে দাও। বেশ রণচণ্ডী-মার্কা একটা মেয়ের সঙ্গে। মা ছাড়া এ মানুষকে সামলাবে কে? এই নিয়ে ক’বার হল? এই হাত উড়ে যাচ্ছে, এই পা উড়ে যাচ্ছে। সেই বেলাটাটা বেরিয়েছে?
আজ্ঞে না মনে হয়।
বুঝবে ঠ্যালা পরে। ওই কাঁটা এখন ব্লাডস্ট্রিমে ঘুরছে। সোজা যেদিন হার্টে গিয়ে ঢুকবে সেদিন ফিনিশ।
উনি বলেন, সে হজম হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, হজমা হজম। তবে বলা যায় না, ওঁর রক্ত তো সবসময় ফুটছে। কাঁটা হয়তো ভেপার হয়ে নাক দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
