রাস্তায় প্রবল উত্তেজনা। সবাই একমুখো দৌড়াচ্ছে আর বলছে, ধরেচে, ধরেছে। কী ধরেছে রে বাবা! চোর না ডাকাত! বারান্দায় আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দীনু ডাকলে, শিগগির নেমে আয়।
নীচে নামতেই যাঁড়ের গলায় চিৎকার করে উঠল, শালা চিকের আড়াল থেকে বেনারসি বাইজিদের মতো মুখ বের করে রাস্তা দেখছিস, এদিকে কী হয়েছে জানিস?
আস্তে বল, আস্তে। কী হয়েছে? আস্তে!
শালা, সুখেনকে ধরে ধোলাই দিচ্ছে।
কী করেছিল?
জবাকে নিয়ে মাসির বাড়ি লুকিয়ে বসে ছিল। সকালে দুর্গাপুর পালাবে বলে যেই বেরিয়েছে, ক্যাচ, কট, কট।
তা আমরা কী করব? আমাদের কী করার আছে?
তার মানে? প্রেমের যূপকাষ্ঠে একটা ছেলেকে বলি দেওয়া হচ্ছে, একজন রিয়েল প্রেমিক, আমাদের কিছু করার নেই! দুনিয়ার প্রেমিক এক হও। আমরা শুধু প্রেমের কথা বলি। ও করে দেখিয়ে দিলে। আমরা থিয়োরিটিক্যাল, ও প্র্যাকটিক্যাল। কাল কালীঘাটে গিয়ে জবাকে বিয়ে করে এসেছে। কপালে পাঁঠার রক্তের মতো এখনও এতটা সিঁদুর লেগে আছে। সেই প্রেমিককে পাঁঠাবলি দেবে, আর আমরা প্রেমের সাপোর্টার হয়ে চুপ করে বসে থাকব! চলবে না, চলবে না।
ভাগ্য ভাল, ওপরে হাতুড়ি চলছে, নয়তো দীনুর এই গলা ওপরের কানে গিয়ে আর এক নতুন ঝামেলা তৈরি করত। দীনু তো জানে না সুখেনের কলকাঠি কে নেড়েছিল। সুখেনের আগেই তো আমি বলি হয়ে গেছি। দীনুপাঠা সে খবর রাখে! সারাজীবন চেঁচিয়েই মোলো।
আমি গেলে আর এক কাণ্ড হবে।
তুই ভীষণ স্বার্থপর। তোদের ফ্যামিলিটাই স্বার্থপরের ফ্যামিলি।
হ্যাঁ রে, তাই তো বলবি। জানিস আমার কী হয়েছে?
দীনুকে অল্প কথায় ঘটনার আভাস দিতেই দীনু লাফিয়ে উঠল, শালা, কামাল করে দিয়েছিস। সাধে বলে, পেন ইজ মাইটিয়ার দ্যান সোর্ড। এক কলমের খোঁচায় টসকে দিয়েছিস। কী লিখেছিলিস মাইরি। জবা তো তা হলে তোরই বউ রে। মেয়েটা মাইরি…।
দীনু একটা চোখ অ্যায়সা বোজাল, মনে হল সারাজীবনের মতো দেড়চোখো হয়ে গেছে। দীনু চোখ খুলে বললে, এ অপমান, আমাদের সকলের অপমান। কেমন করে পকেটে পুরি, একটা কিছু তো করতেই হয়।
কী করতে চায় ওরা সুখেনকে নিয়ে?
আরে জবার সেই কাকাটা, জানিস তো কী জিনিস! সেই মাল, আর সুখেনের দাদা, দুটো পয়মালে মিলে প্রথমে সুখেনের মাথার অর্ধেকটা কামাবে, তারপর এক গালে চুন আর এক গালে কালি মাখাবে, মাখিয়ে ইজের পরিয়ে পেছনে ক্যানেস্তারা পেটাতে পেটাতে পাড়ায় পাড়ায়। ঘোরাবে। আর হ্যাঁ, একগাদা ছেঁড়া জুতো জোগাড় করেছে। মালা করে গলায় ঝোলাবে। দেশে ব্যর্থ প্রেমিকের তো অভাব নেই। প্রেমে সাকসেস দেখলে জ্বলে পুড়ে মরে। সেই মালেরা জুটেছে। তারাই মদত দিচ্ছে।
কী করা যায় বল তো? রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে।
আর একটা সিক্রেট খবর আছে। সুখেনের দাদা। মালকে চিনিস?
দেখেছি, তবে তুই কোন চেনার কথা বলছিস কে জানে!
দীনু আবার দেড়চোখো হয়ে বললে, মেয়েছেলে আছে।
তার মানে? মেয়েছেলে তো থাকবেই। বিয়ে তো লোকে মেয়েছেলেকেই করে।
তোর মাথা। এ মেয়েছেলে সে মেয়েছেলে নয়। যে-মেয়েছেলে বাজারে থাকে। বুঝলে চাঁদু। যারা নিজেরা পাপ করে তারাই সবচেয়ে বড় মর্যাল গার্জেন হবার চেষ্টা করে। সব গেল সব গেল। বলে তারাই সবচেয়ে বেশি চেল্লামিল্লি করে। আমার কী মনে হয় জানিস, ব্যাটা জবাকে হাতাবার। তালে আছে।
কী করে?
খুব সোজা। রক্ষকই ভক্ষক হয়ে বসবে। ইতিহাস পড়ে দেখ, প্রেমিকরা চিরকাল ফ্যা ফ্যা করে বেড়ায়। কিন্তু লম্পটদের কখনও মেয়ের অভাব হয় না। মেয়েরা মাইরি লম্পটদেরই ভালবাসে।
তুই বড় শালা আর মাইরি বলিস। ভদ্রসমাজে মিশবি কী করে?
রাখ তোর ভদ্রসমাজ! ওই তো ভদ্রসমাজের ব্যাপার। সুখেনের চে খারাপ ছেলের সঙ্গে জবার বিয়ে দেবে সেও ভি আচ্ছা, তবু একটা ছেলে যেচে একটা মেয়েকে বিয়ে করলে গাধার পিঠে চড়াবে। এই তোর ভদ্রসমাজ। এর চেয়ে বিলাসপুরের আদিবাসীরা ঢের ভাল। সুখেনটাকে কী করে তা হলে বাঁচানো যায়?
ব্যাটা পালাল যখন আরও দূরে পালাতে পারল না?
মনে হয় ঝড়বৃষ্টির জন্যে আটকে গিয়েছিল।
আমাদের দলে কাকে কাকে পাবি?
বুঝতে পারছি না। সুখেনেরও তো রাইভ্যাল ছিল অনেক। জবার পেছনে ক’টা ঘুরছিল কে। জানে? তবে শিবুদাকে আমাদের দলে পাবই।
কী করে বুঝলি?
এ পাড়ায় শিবুদাই একমাত্র সাকসেসফুল প্রেমিক। থিয়েটারের মেয়েকে বিয়ে করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এলেবেলে বিয়ে নয়, একটা ফলও হয়েছে। তা ছাড়া লড়িয়ে মানুষ। একবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই সব শালা ঠান্ডা।
আবার শালা?
শালাদের শালা বলব না তো কি ভগিনীপতি বলব! তুই শালা আচ্ছা এক নীতিবাগীশ হয়েছিস। এরপর বলবি, গোরু গলিতে বাথরুম করে গেছে।
ওপরে হুড়মুড় করে একটা শব্দ হল। মেসোমশাই আর কনক দু’জনেরই গলা একসঙ্গে পাওয়া গেল, কী হল, কী হল?
দীনু বললে, তোদের কিছু একটা ড্যামেজ হয়ে গেল। ভূত ছেড়ে যাবার সময় এইরকম শব্দ হয়।
মেসোমশাই বলছেন, লেগেছে আপনার? খুব লেগেছে! কেন যে সাতসকালে ওটার পেছনে লাগতে গেলেন। বেশ তো ছিল।
দীনু বললে, তোদের বোধহয় ছাদ ভেঙে পড়ল।
দাঁড়া আমি দেখে আসি।
হাতুড়িহীন পিতা কুঠারহীন পরশুরামের মতো উত্তরের বারান্দায় ছোট একটা মোড়ায় ডান পা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে স্থির হয়ে বসে আছেন। চুন আর বালির প্রলেপ ভেদ করে কুঁচফলের মতো অনবরতই নতুন নতুন রক্তের দানা ফুটে ফুটে বেরোচ্ছে। মুখে যন্ত্রণার কোনও রেখা নেই। টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখার মতো পায়ে রক্ত ফুটে ওঠার শোভা দেখছেন।
