অনেকক্ষণ সকাল হয়েছে। আকাশ আমার মনের মতোই ঘোলাটে। ঘরের বাইরে একবার বেরিয়েছিলুম। হাওয়া তেমন সুবিধের মনে হল না। কনক আড়চোখে তাকিয়ে সরে গেল। মুকু তো তেমন কথাই বলে না। মুখ খুললে বিদ্যে লিক করে বেরিয়ে যেতে পারে। মেসোমশাই ব্রাশ ছেড়ে নিম দাঁতন ধরেছেন। বারান্দায় মুখ ঝুলিয়ে চিবোচ্ছিলেন, আর থুথু করে নীচের বাগানে ছিটোচ্ছিলেন। পিতা অসম্ভব রকমের গম্ভীর মুখে হাতে একটা হাতুড়ি নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিলেন। বেশ কঠিন কোনও কাজ শুরু করার মতলব। আমি জানি, আগেও দেখেছি, মন তখন তোলপাড় করে তখন বিচিত্র কোনও কাজ নিয়ে ভীষণ মেতে ওঠেন। একে বলে, কাজের বাঁধন দিয়ে মন-তুরঙ্গকে বশে রাখা।
এক কাপ চা জুটেছে। অন্য কোনও কাজের ফরমাশ এদিকে আসছে না। অন্যদিন এতক্ষণে হরেক রকম কর্তব্যকর্ম ঘাড়ে চেপে বসত। আজ একেবারে স্বামী মুক্তানন্দ হয়ে চৌকিতে পা তুলে বসে থাকার সুযোগ মিলে গেছে। জানি না, কোথাকার জল কোথায় গড়াবে। মন বলছে, খেলা বেশ ভালই জমবে। কেমন উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে এসে গেল। নাও এখন ম্যাও সামলাও। সুখেনের সঙ্গে একবার দেখা হোক, ব্যাটার পিন্ডি চটকাব।
মাতামহ ভোর না-হতেই চলে গেছেন। যাবার সময় বলে গেছেন, তেমন ঝামেলা দেখলে চলে আসিস। আমার খুপরিতে দু’জনে মজা করে থাকব। একটা খাবার যা আবিষ্কার করেছি! একেবারে পাহাড়িবাবার ফর্মুলা। একদিন খেলে তিনদিন আর হাঁ করতে হবে না। লাউ সেদ্ধ করে, গুড় আর একটু গাওয়া ঘি দিয়ে চটকে, এক ড্যালা মেরে দাও। কে কার পরোয়া করে না বলে বললেন, কে কার পরোটা ভাজে! পেট নিয়েই তো মানুষ নাকাল। পেটটাকে ম্যাকাডামাইজ করতে পারলে কার দাসত্ব! হু কেয়ারস হুম। তোমার চোখ তুমি রাঙিয়েই রাখো, আমি শিস দিয়ে যাই ডালে বসে। পাখি হয়ে ডাক দিতে থাকি পরমপিতাকে। মনে হচ্ছে একেবারে একা লড়তে হবে না। পক্ষে মাতামহ আর মাতুলকে পাব।
হাতুড়ির শব্দ হচ্ছে। কিছু একটা ভাঙা হচ্ছে। তুলো ধোনার যন্ত্র পড়ে রইল তুলোর অভাবে, তাই কি পিতা দেয়াল ভাঙার দিকে চলে গেলেন সব ছেড়ে। ভাঙার মতো দেয়াল এ বাড়িতে অনেক। আমার ওপর রেগে গিয়ে বাড়িটাকে অংশে অংশে ভেঙে মাঠময়দান করে তাঁবুর ব্যবস্থা হবে নাকি? বলা যায় না, কোন পরিকল্পনায় কী কাজ শুরু হল! কার ক্রোধ কখন কীভাবে কীসের ওপর যে গিয়ে পড়বে। আমাদের বিখ্যাত মেনিদা একবার মেয়ের ওপর রেগে হাঁটাপথে হরিদ্বার চলে গিয়েছিলেন। মাসখানেক বেপাত্তা। ফিরে এলেন ন্যাড়া হয়ে। গয়ায় নিজের নামে নিজেই পিণ্ড উৎসর্গ করে। বললেন, আমি আর বেঁচে নেই, আমাকে কারুর কিছু বলার প্রয়োজন নেই। যার যা খুশি করে যাও। পাড়ায় পেছনে লাগার মানুষের তো অভাব নেই। তারা সস্ত্রীক মেনিদাকে রাস্তায়। দেখলেই জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, দাদা ইনি কি আপনার বিধবা স্ত্রী! বিয়েটা কি বিদ্যাসাগর মশাই দিয়ে গিয়েছিলেন?
মেসোমশাইয়ের গলা ভেসে এল, হরিদা, আজ বেরোবেন না? ছুটি নাকি?
না, ছুটি হবে কেন?
তা হলে সাতসকালে বাথরুমের দেয়াল ভাঙতে বসলেন?
কাজটা অনেকদিন পড়ে আছে। করব করব করে করা হচ্ছে না। খানিকটা এগিয়ে রাখি। রবিবার এসে গেল।
কী করতে চাইছেন?
পুরনো প্লাস্টার ঝরিয়ে ফেলব। শিলে গুঁড়ো করে অ্যাগ্রিগেট বের করব।
সে আবার কী?
আপনারা যাকে বালি বলেন, কনস্ট্রাকশনের ভাষায় তার নাম অ্যাগ্রিগেট।
সেকী মশাই! পুরনো প্লাস্টার গুঁড়ো করে আবার প্লাস্টার করবেন? ধরবে? ঝরে পড়ে যাবে। আমার লাইফে শুনিনি। পণ্ডশ্রম হবে।
ওর বাপ ধরবে। ধরাতে জানলেই ধরবে।
কিছু বালি কিনলেই তো হয়।
সে তো সবাই করে। তাতে আর নতুনত্ব কী আছে! সবসময় নতুন কিছুর অন্বেষণ করুন। সামথিং নিউ। সামথিং নিউ।
ঠাঁই, ঠাস, ধাঁই, ধাস। হাতুড়ির শব্দ উঠল। ঝড়াস ঝড়াস প্লাস্টার খসছে। বাথরুমের বারোটা বেজে গেল। আর তো একপাশে বসে থাকা যায় না। এসব অদ্ভুত কাজের একমাত্র দোসর আমি। এগোতেই হয়। এগিয়ে গিয়ে বলতে হয়, কী করতে হবে বলুন?
দরজার কাছে ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে বললুম, কোনও সাহায্যে লাগতে পারি?
প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, ও, নো নো। গো, অ্যান্ড রাইট ইয়োর লেটার্স। লাভ লেটার্স। সংসারে যুবতীর অভাব নেই। যুবকের কর্তব্য করে যাও। বোতল বোতল কালি আছে। দিস্তে দিস্তে কাগজ আছে। কোকিলের ডাকে সাড়া দাও। কাননে বসন্ত এসেছে, বসন্ত।
ধাই ধাস, ঠাই ঠাস। হাতুড়ির শব্দ শুরু হল। আবার কোণের ঘরে প্রত্যাবর্তন। চেনা মানুষ অচেনা হয়ে গেলে, নিকট দূর হয়ে গেলে বড় দুঃখ হয়। বেশ জোরে মনের মতো কয়েক চরণ কবিতা আবৃত্তি করলে কী হয়। বেশ জুতসই কয়েক লাইন:
Among the windings
of the violins
And the ariettes
of cracked cornets
Inside my brain a
dull tom-tom begins
Absurdly hammering
a prelude of its own
Capricious monotone
That is at least one
definite false note.
রাস্তায় হইহই উঠেছে। ভাল্লুক টাল্লুক বেরোলে এরকম হতে পারে। সাতসকালে ভাল্লুক আসবে কোথা থেকে। চিৎকার, চেঁচামেচি। বারান্দার দিকে কনক দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে সরে গেল। বয়েই গেল। তুমি আজ আছ কাল নেই। তোমার ভালবাসা, ঘৃণা কোনও কিছুরই পরোয়া করি না।
