মাতুল বললেন, মামলা যখন খারিজ হয়ে গেছে তখন আবার গান ধরা যেতে পারে?
পিতা বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ফলস অ্যালিগেশন। নাও ধরো।
ভদ্রলোক বললেন, আজ্ঞে, আমি মামলা করতে আসিনি। আপনার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগও নেই। তবে আজকাল ভাবভালবাসার যুগ পড়েছে তো, তাই ভাবলুম জবা যদি এখানে এসে থাকে। এত বড় বাড়ি, শুনেছিলুম একটিও মেয়েমানুষ নেই, উঠতি বয়েসের মেয়ে, উঠতি বয়েসের ছেলে, ঝড়বাদল হচ্ছে। বলা তো যায় না, কী থেকে কী হয়ে যায়। যদি একবার হয়ে যায়।
মাতামহ জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়ে যায়?
আজ্ঞে এই জোড়কলম আর কী।
মাতামহ বললেন, হরিশঙ্কর, অশ্লীল কথা বলছে, অনুমতি দাও। জুতোজাড়া এখনও প্রায় নতুন আছে। পিতা বললেন, দাঁড়ান দাঁড়ান, অ্যাকশন তো আমিও নিতে পারি; তার আগে অভিযোক্তাকে আমার কিছু প্রশ্ন আছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, শপথ করো, সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিব না, যাহা সত্য তাহাই বলিব।
প্রশ্ন: জবা কে?
একটি মেয়ে।
কোথায় থাকে?
যেদিকে চন্দ্রমল্লিকার টব, সেই ছাদের দিকের লাগোয়া বাড়িতে।
আই সি, যে বাড়ির মেয়েরা অন্তর্বাস পরে পুরুষদের সামনে বুক ফুলিয়ে বেড়ায়, আপনি সেই বাড়ির নিনকম-পুপ। আজ্ঞে, আপনি আসতে পারেন। ফুল ছুঁড়েছে? সে তো নরম জিনিস। ইট ছোঁড়া উচিত ছিল। থান ইট, আধলা ইট।
ভদ্রলোক বললেন, শুনেছি আপনি রাগী মানুষ। রাগী হলেও পরোপকারী, দয়ালু, শিক্ষিত, আদর্শবান। বিপদে পড়ে এসেছিলুম আপনার কাছে। আমার দাদা পাঞ্জাবে বড় চাকরি করতেন, বউদিরা সেখানেই ছিলেন, তাই বাঙালির হালচালের সঙ্গে মেলে না।
প্রতাপ রায় প্রশ্ন করলেন, বউদিরা মানে?
আজ্ঞে দুই বিবাহ।
অ্যাঁ বলেন কী, দু’দুটো বউ।
বলেন কেন, আর সামলাতে পারছি না।
প্রতাপ রায় কাবাবের গন্ধ পেয়েছেন। সাগ্রহে বললেন, বসুন, বসুন।
ভদ্রলোক এতক্ষণ কদমতলায় কেষ্টঠাকুরের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। কার্পেটের একপাশে বসলেন। সাবান আর পাউডারের বোদা গন্ধ বেরোচ্ছে গা থেকে। মাথার চুলে ফুলেল তেল। প্রতাপ রায় জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে সামলাতে হচ্ছে কেন?
আজ বছর পাঁচেক হল, দাদা নিরুদ্দেশ। মনে হয় বেঁচে নেই। আত্মহত্যা করেছেন।
মেসোমশাই টাস টাস করে টুসকি মেরে কনক আর মুকুকে দরজার সামনে থেকে ওপাশে সরে যেতে বললেন। খারাপ খারাপ কথা হচ্ছে, মেয়ে বখে যাবে। মাতামহ বলে উঠলেন, বলেন কী, এক ঢিলে দু’পাখি। দু-দুটো বউ বিধবা!
বউদিরা অবশ্য বিধবার সাজপোশাক পরেন না। মাছ, মাংস, ডিম সবই চলে। দাদা মারা গেছেন সে প্রমাণ তো নেই। যা হবে সেই বারো বছর পরে।
পিতা প্রশ্ন করলেন, আপনার কী করা হয়?
পোস্তার বাজারে মশলার পাইকার।
মাতামহ অমনি বলে উঠলেন, ও, ব্যাটা গন্ধবেনে।
মাতুল ক্ষমা চাইলেন, কিছু মনে করবেন না, ব্যাটা বলাটা ওনার মুদ্রাদোষ।
প্রতাপ রায় বললেন, আপনার কি মনে হচ্ছে জবা পালিয়েছে?
মাতামহ বললেন, অমন বাপের মেয়ে পালাবেই। দ্রৌপদীর মতো পঞ্চস্বামী গ্রহণ না করে থামবে না। তারপর বস্ত্রহরণ। পিতা বললেন, বড় অসংলগ্ন কথা হচ্ছে। জবা পালাক ক্ষতি নেই। প্রেমের তিন পর্ব। প্রথম পর্বে বুদ্ধিবৈকল্য। কাঁচে কাঞ্চন ভ্রম। দ্বিতীয় পর্বে দ্বিত্ব। তৃতীয় পর্বে। যথাস্থানে দ্বিরাগমন ও খেল খতম। সবই হল অপসৃষ্টির উত্তাপ। যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায় ততই ভাল। আপনি তার খোঁজে এখানে এলেন কেন?
আপনার ছেলের সঙ্গে ছাতে-ছাতে একটু কথা চালাচালি হত তো। তা ছাড়া এই চিঠিটা হঠাৎ হাতে এসে গেল।
চিঠি? সভাসদরা সমস্বরে বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
আজ্ঞে হ্যাঁ চিঠি। মনে হয় আপনার ছেলের লেখা।
মেসোমশাই বললেন, মনে থাকে যেন হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট কল করা হবে।
আমি তো মামলা করতে আসিনি। জবার সন্ধানে এসেছি।
পিতা বললেন, ঠিক আছে, আগে হস্তাক্ষর মেলানো হোক, তারপর কী লিখেছে দেখা যাবে। কনক!
পিতার ডাকে কনক দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
এর যে-কোনও একটা হাতের লেখা নিয়ে এসো তো।
কনক একটু ইতস্তত করে সরে গেল। আমি যেন বন্দি আসামি। সাক্ষ্য, প্রমাণ সব একে একে হাজির করা হবে। আমার তাতে কোনও হাত থাকবে না। একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছি না, জবাকে এক-আধটা ফুল এ ছাত থেকে ও ছাতে পাচার করেছি ঠিকই কিন্তু চিঠি তো আমি লিখিনি। চিঠি লিখব কেন? আমি তো জানি যত দানাই ছড়াই জবা তো তেমন পায়রা নয় যে উড়ে আসবে। ওর দানা আলাদা। মটরদানা, কাঁকনিদানা, কোনও দানাতেই ও পাখি বশ মানবে না। মাতুল কানে কানে ফিসফিস করে বললেন, কী কাণ্ড বাধিয়েছিস। ব্যাটা ওমর খৈয়ামের চেলা।
বেশ লজ্জা লজ্জা করছে। ভয় তেমন লাগছে না। কী আর হবে? পিতা যদি বাড়ি থেকে লাথি মেরে বের করে দেন, লোটাকম্বল নিয়ে সরে পড়ব। কোথায় সরব জানি না। তবে এত বড় পৃথিবী, কোথাও কি একটা ডেরা জুটবে না।
কনক খুঁজে খুঁজে আমার ডায়েরিটা নিয়ে এসেছে। মরেছে। ওতে যেসব মনের কথা লেখা আছে, সেসব পড়লে সশ্রম কারাদণ্ডের পরিবর্তে জজসাহেব ফাঁসির হুকুম দেবেন। অনেক আধ্যাত্মিক চিন্তাও আছে। বরাতে কোন পাতাটা বেরিয়ে পড়বে কে জানে! জয় ঠাকুর।
ডায়েরিটা হাতে নিয়ে পিতা মাঝামাঝি একটা জায়গা খুলে আলোর সামনে মেলে ধরলেন। নীরব, নিথর, নিস্পন্দ প্রদীপ শিখা। কোন পাতাটা খুলেছেন। হে ভগবান, যে- পাতায় মায়া আছে,
